আজ ভোগের আয়োজন কী হয়েছে, শীতলের আয়োজন কীকী হবে এসবই আলাপে এলো কারণ এসবই তো সেই একজনের যিনি রাজার রাজা। আজ শীতল-প্ৰসাদ কার বাড়িতে যাবে তা আলোচনার পর যখন জানা গেলো, আজ তা লিস্টি অনুযায়ী শিরোমণিমশায়ের বাড়িতে যাচ্ছে, তখন সেই সূত্রে যেন আলাপটা কেঁপে উঠতে পারলো। এটা একটা প্রথা, শীতলের প্রসাদ গ্রামের ভদ্র গৃহস্থদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। একশো জনের নাম আছে তালিকায়, ঘুরে ঘুরে সেই তালিকা অনুযায়ী বাড়িতে যায় প্রসাদ। গ্রামের একশত ভদ্র পরিবার বলা বাহুল্য তারা কিছু পরিমাণে অর্থবান, এবং এমন যে অনাহূত ভাবে রাজবাড়ির মন্দিরে প্রসাদ পেতে আসবে না।
শিরোমণির নামের সূত্রেই একজন বললো–অনেকদিনকথকতা হয় না। সামনে পূর্ণিমা। বললে হয় শিরোমণিকে।
রানী বললেন–কেউ কেউ বলে শিরোমণির কথকতা কাঠকাঠ।
সংস্কৃত বেশি থাকে। কিন্তু অমন ব্যাখ্যাও সহজে কেউ দিতে পারে না। গতবারে মানভঞ্জনের ব্যাখ্যা যা করেছিলো তা এখনো যেন কানে লেগে আছে। আমরা কি জানতাম যিনি তাঁর হাদিনী শক্তি, যিনি প্রায় অভেদ তার থেকে, তারও এমন অভিমান উচিত নয় যে তিনিই ঈশ্বরকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসেন, ঈশ্বর তারই একমাত্র। ঈশ্বর চন্দ্রাকেও কৃপা করবেন। সেজন্য মান করা শোভা পায় না। আমি সবচেয়ে বড় ঈশ্বরভক্ত এটাও তো সাধনার বিঘ্ন।
হেসে রানী বললেন–তোমার ব্যাখ্যাও কম যায় না, সুরধুনি। বেশ তত, শিরোমণির বাড়িতে যে যাবে শীতল নিয়ে তাকেই বলে দিও শিরোমণিকে কথকতার নিমন্ত্রণ দিতে।
আমার তো মনে হয় বিরুদ্ধপক্ষীয় নেতা হওয়া মানুষের স্বভাবেই থাকে। সেই আসরেও একজন ছিলো। ক্ষণকালের আসর, রানী এখনই উঠবেন স্নানে, কিন্তু মনের মধ্যে বিরোধপ্রবণতা নিজেকে নিয়েই একশো।
তেমন একজন বললেনয়ননাকি এবার ফিরেই শিরোমণিদের ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ দিয়েছিলে?
–শিরোমণিদের নয়, শুধু তাকেই। নয়নতারার মুখটা যেন একটু লাল হলো।
–তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, আর তারপর বলতে পারোনি কাউকে আর?
যেন নয়নতারাকে প্রত্যাখ্যান করায় শিরোমণির রাজবাড়িতেও অনাদৃত হওয়া উচিত। আর একজন বললো–আমাদের রাজবাড়িতে তো ব্রাহ্মণ কর্মচারীর অভাব নেই।
অপরা বললো–তারা অন্তত বাধ্য হয়েই আসতো।
নয়নতারা মুখ নামিয়ে নিজের পায়ের দিকে চেয়ে রইলো।
কিন্তু রটালো কে এই প্রত্যাখ্যান? এই শেষ প্রশ্নটাই বা কে করলো? তা কি রানীর দৃষ্টি?
রানী যখন কথা বললেন, তার গলাটা গম্ভীর শোনালো। তাকেও কথা বলতে সময় নিতে হয়েছে। বললেন তিনি–তোমার কি ব্রাহ্মণভোজনের দিন পার হয়ে গিয়েছে? ওরা যেমন। বলছিলো তাও করতে পারো, নয়ন।
নয়নতারা রানীর দিকে চাইলো। তার চোখের পাতা দুটো কি কপলো? সে ধীরে ধীরে বললো–তাতে কি শিরোমণিকে অপমান করা হবে না?
রানী হাসলেন। এ হাসির নানা অর্থ করা যায়। একটা অর্থ এই হতে পারে, তোমার বুদ্ধিকে বিশেষ পছন্দ করলাম। কিন্তু যে শুরু করেছিলো আলাপটা তার মুখ ততক্ষণে কালো হয়ে গিয়েছে। বিশ্রী এই শব্দটাই যেন অন্যান্যদের মুখ থেকে বেরুবে। শিরোমণির প্রত্যাখ্যানটা যে রাজু এবং নয়নতারার সম্বন্ধ নিয়ে নানা কল্পনা থেকে ঘটছে তাতে সন্দেহ। নেই। রানীর মনে আলোচনাটাকুৎসিত, এই কথাটাই এলো। যেন কেউ ক্রুদ্ধও করে তুলেছে তাকে। কে সেই ক্রোধের পাত্র? যারা শিরোমণির কথা তুলেছিলো? তারা তো বিবর্ণমুখ, যন্ত্রের মতো হাত চলছে শুধু। অথবা ক্রোধের পাত্র কি শিরোমণি? কিংবা নয়নতারা? ক্রোধের পাত্র খুঁজে না-পেয়ে কি তিনি নিদারুণ রকমে হেরে যাবেন? তার একবার মনে হলো এরকম আকস্মিকভাবে কথাটা উঠে পড়লো কেন? সে জন্যই বিষয়টাকে আয়ত্তে রাখতে পারছে না! অথবা প্রকাশ আকস্মিক হলেও একদিন এ তত আলোচনার বিষয় হতোই। অতীতের সেইসব তো ছেলেমানুষি মোহ ছিলো রাজুর। এখন?
হঠাৎ যেন তার মনে কাদম্বিনী ফিরে এলো। কাদম্বিনী আর নয়নতারার পার্থক্য কি সেকাল আর আধুনিকতায়? কিংবা কাদম্বিনী নিজেকে রাজবাড়ির বাইরের সমাজে কখনো নিয়ে যায়নি যেমন নয়নতারা শিরোমণিকে আহ্বান করতে গিয়ে করেছে? কিংবা কথাটা আধুনিকতাই হয়তো। বাদশাহী ফারমানে যে রাজা তাকে যা মানায় রাজুকে তা মানায় না।
কিন্তু রানী গলা তুলে বললেন–এই দ্যাখো, মনে পড়ে গেলো, নয়ন, তুমি আর রাজু যে সেদিন অত গভীর রাত করে ফিরলে শিকার থেকে সে গল্পই আমার শোনা হয়নি। স্নান করতে করতে শুনবো।
নয়নতারা বললো–তাহলে চলুন, রানীমা, বেলা হচ্ছে।
রানী চলতে শুরু করলেন। তার মুখে ক্লান্তির পাশে স্নিগ্ধতা ফুটবে এবার মনে হলো। কিন্তু তাও কি সহজে! পাশে এখনো নয়নতারা রয়েছে তো! তিনি যেন নিজেকে তিরস্তার করবেন এরকম এক মনোভঙ্গির কাছে গেলেন একবার। যেন বা নিজেকে বলবেন এমন করে সমস্যাটা থেকে দূরে থেকেছে বলেই এমন বিস্ফোরণ হলো তোমার নিজেরই অন্দরমহলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি নিজের ব্যক্তিত্বকে, যেমন অন্য সকলে, শ্রদ্ধা করেন। তাকে হীন করলে কি তিনি কিছু করতে পারবেন আর? নয়নতারা এবং রাজুর ব্যাপারটা ওদেরই নিজস্ব। সেটা কি আদৌ কিছু ব্যাপার? নয়নতারাকে হীন করলে ব্যাপারটা মলিন হয়ে যায়।
তিনি বললেন–নয়ন, তোমার সঙ্গে বিদ্যেসাগরের মত মিলছে না মহাভারতে, শিরোমণির সঙ্গে মিলছে না ব্রাহ্মণভোজনে। আমার মনে পড়ছে আগে এরকম কথা ছিলো গ্রামে তোমার দাদা ন্যায়রত্নের মত মেলে না কারো সঙ্গেই।
