এখনো কাদম্বিনী তার টিকলো নাকে তেমন সরু করে তিলক কাটে। কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করে। কায়েতবাড়িতেও তার মহলটাই আলাদা। আসল ব্যাপারটা এই যে মানুষের পক্ষে সেই প্রেমোত্তর প্রেমের সাধনা খুবই কঠিন। কিন্তু তাহলেও প্রত্যয়টাও মিথ্যা নয়। সুগন্ধির ঝাঁপি যদি ঠাসা ভরতি না হয় তবে সুগন্ধি বস্তুগুলোর উপরে যে অন্তরীক্ষ, সেই আঁপিতে তা অদৃশ্য সুগন্ধে ম-ম করে। যেমন রাজবাড়ির পিছনে এই শালবাগান। হয়তো বাদশাহী ফারমানের যে রাজা পাটনা অযোধ্যা হয়ে দিল্লী তক্ যাতায়াত করতো তার মনে মধ্যেও কোথাও এমন একটা অসাধারণের প্রতি আকাঙ্ক্ষা ছিলো যা সার্থক হলে রূপ সনাতনের বৈরাগ্য হয়।
রানীর মুখ অন্তর্লীন হাসিতে উজ্জ্বল দেখালো। পায়ের তলায় শুকনোশালপাতা বিছানো পথ।
নয়নতারা বললো–বনমর্মর বলে নাকি একে?
নয়নতারার দুষ্টুমিতে আবার হাসলেন রানী।
এটাও কিন্তু কম কৌতুকের নয় যে রানী আজ খিড়কির দীঘিতে স্নানে চলেছেন। স্নানের জন্যই তো দীঘি এবং সেখানকার বাঁধানো ঘাট এমনকী পুরনারীদের জন্য স্নানের ঘর আছে, জলের উপরে-তা সত্ত্বেও। এবং এখানে চলতে গিয়ে এ পুরনো কথাগুলো যেন তার মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। ঠিক ভাবছেন এমন নয়, যেন মনে ঢুকতে দিচ্ছেন। কৌতুকটা এই যে এভাবে এ পথে স্নানে এসেই কি এমন হলো, অথবা মনে আসছিলো বলেই তিনি এ পথে এসেছে আজ?
রানী সংবাদ পেয়েছেন কাদম্বিনীপুত্র, অন্য কথায় কায়েতবাড়ির ছেলে, রাজবাড়িতে আসছে। রাজুর জন্মের পর এই প্রথম। রাজুর মনে কি ধাক্কা লাগবে? যখন তাদের সাক্ষাৎ হবে?
পরে না হয় ভবিষ্যতের কথা ভাববেন, কিন্তু অতীত? অতীত আর ভবিষ্যতে এই তফাত যে অতীত নিজের মনেরই এক অংশ যেন।
কাদম্বিনীকে এরপরে অন্যত্র থাকতে হয়। গম্ভীর খাদের গলা ছিলো রাজার।
-তা তো বটেই। (কী বা বুদ্ধি তখন সেই সপ্তদশী রানীর!)–আপনি কি বাগানবাড়ির মতো কিছু ভাবছেন?
–সে রকম কিছু। যদি বলো কলকেতার দিকে যেমন হচ্ছে তেমন একটা দূরে শাহাবাদ পরগনায়।
তাই হোক। কিন্তু তা রাজবাড়িই হোক। নতুবা কাদম্বিনী ছোটো হয়ে যায় না? আর সে ছোটো হলে আমারও সম্মান থাকে না।
তাই হয়েছিলো। শাবাদ পরগনার আয়েও একটা রাজবাড়ি চলে বৈকি। আর সেখানে কায়েতের মেয়ে কাদম্বিনী একা নয়, যেন এটা নীচ কিছু নয় এরকম বোঝতে, এ বাড়ির অনেক আশ্রিত সে বাড়ির আশ্রয়ে গিয়েছিলো, অথবা তাদের তেমন রাখা হয়েছিলো। আর আশ্রিত মানুষরা যদিও তারা রাজার আত্মীয় এবং কায়েতও নয়, কাদম্বিনীর সম্বন্ধে উন্নাসিক হবে এমন হয় না।
শাবাদ পরগনার কাছারি অবশ্য অন্যান্য পরগনার কাছারির মতোই নায়েব-ই রিয়াসতের অধীন। আর আয় ব্যয়ের শেষ হিসাব সুমারনবিশ দেখে থাকে।
রাণি বললেন, আচ্ছা, নয়নতারা, তুমি কি কখনো কায়েতবাড়ি গ্রামে গিয়েছে? নাম শুনেছো নিশ্চয়?
-হ্যাঁ, সদরে যেতে পড়ে। সেখানে এক জমিদারবাড়ি আছে, যারা নাকি কায়স্থ।
–সেখানে একজন কুমার আছে যার বয়স রাজুর কাছাকাছি, জানো?
–শুনিনি তো।
–সে আমাদের রাজবাড়িতে আসবে লিখেছে।
–আমাদের রাজকুমারের সঙ্গে পরিচয় বুঝি?
না। রাজু কবে কায়েতবাড়ি গেলো? তাছাড়া সেই কায়েত-কুমার তো পাঁচ-ছ বছর বয়স থেকেই বেশির ভাগ কলকাতায়।
রানী আলাপটাকে অন্য দিকে নিলেন। বললেন–তোমার সঙ্গে হৈমীর আলাপ হলো নয়ন? মেয়েটি ভালো নয়! বেশ সুন্দরী, কি বলল?
নয়নতারা বললে–বেশ কম বলা হয়।
রানী হাসলেন। বললেন–ভাগ্যে মেমসাহেব বলোনি। রাজুর একরকম মামাতো বোন, ওদের শাখাটার রং ওরকমই। কিন্তু দুঃখের ছায়া পড়লো রানীর মুখে। বললেন, তুমি ওর কথা জিজ্ঞাসা করছিলে না? কিন্তু কী কপাল! তোমাদের বয়স হবে, এর মধ্যে দুবার কপাল পুড়িয়েছে। জানো, ওর বাবা পাটনায় কমিসেরিয়টে ছিলেন। বালবিধবা মেয়েকে সব আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। পাটনার কুঠির পার্টিতে যেতো। সেখানে শেষ পর্যন্ত এক ইংরেজ না কী আইরিশ ক্যাপটেনের সঙ্গে প্রণয় পরিণয় হয়। কিন্তু দুমাস পরেই দানাপুরের কাছে কানোয়ার সিংকে রুখতে গিয়ে আর ফিরলো না।
নয়নতারা কী বলবে খুঁজে পেলো না। অবশেষে এই সাদা প্রশ্নটা করলো, উনি কি খৃস্টান?
রানী বললেন–বিবাহটা চার্চে হয়ে থাকবে। কিন্তু তাই বলে কি ধর্ম বদলেছে? মনে হয় না। জিজ্ঞাসা করিনি। ওর বাবা অনেক সাহস করেছিলো, কিন্তু এখন ফিরিয়ে নিতে সাহস পাচ্ছে না। দোষ দেওয়া যায় না, তার ছোটো বাড়িতে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায়।
দূর থেকে যাদের দেখা গিয়েছিলো মন্দিরের বারান্দায় এখন তারা স্পষ্ট। তারা সকলেই ব্যস্ত। তারা কেউ ক্ষীরছানায় মিষ্টি গড়ছে, কেউ লুচির ময়দা নিয়ে ব্যস্ত। তারাও রানীকে দেখেছে। আজ কেউ কাজে ফাঁকি দিচ্ছে না, সুতরাং কর্মরত অবস্থায় রানীর দৃষ্টিতে পড়তে পেরে তারা বরং খুশি হলো।
রানী ওদের থেকে কিছু দূরে বারান্দায় বসলেন। রানীর পা নিচের সিঁড়িতে। রানীজুতো পরেন না, পায়ে আলতাও দেন না। তিনি তেমন করে সিঁড়িতে পা রেখে বসেছেন বলে জানা গেলো, পায়ে গুফের নিচে সরু পাটিহারের মতো পায়জোর। ঘুণ্টি নেই, তাই নিঃশব্দ; অযত্নে রূপোটা কি কিছু ম্লান?
এখন কি রানী এখানে গল্প করবেন? যেহেতু প্রাচীনাগণ পরিচারিকা শ্রেণীর নয়, বরং দূরের হলেও আত্মীয়াই, এখানে গল্প চলতে পারে।
