এখনো (সাধনাটা বোধ হয় নেই। কিন্তু নিভৃতিটা আছে। পূর্ণিমা কিংবা তার আগের কয়েকটি রাত্রিতে শালবনে যখন জালিকাটা আলো তখন এই মন্দিরের কাছে, কারো তেমন। চেষ্টা থাকলে, সে নিভৃতিকে খুঁজে পেতে পারে।
অন্য গল্প এই যে, কাছারিতে নানা ধর্মমতের লোক আসে। আরো আগে তো ভিন্ন। ধর্মমতের এমন কেউ কেউ আসতো যাদের মুখ থেকে কথা খসলে দু-চারটে মন্দির চূর্ণ হয়ে প্রমাণ করতে পারতো প্রকৃতপক্ষে সেসব মন্দিরের বিগ্রহরা সবইঠুটো জগন্নাথ, ভক্তকে। রক্ষা করা দূরে থাক আত্মরক্ষাও করতে পারে না। অথচ তখন এমন অবস্থা যে রাজবাড়ির। কর্তাব্যক্তিদের ওঠাবসা কাজকর্ম সবই সেই ক্ষমতাবান ভিন্ন ধর্মমতের মানুষের সঙ্গে। তারা। এলে, কাছারিতে, এমনকী প্রাসাদের কোনো কোনো ঘরেই, ওঠাবসা এমনকী আহার না হোক একত্রে মদ্যপান তো চলতোই। কর্তাব্যক্তিরা তখন শিলোয়ারচুস্ত, চোগা চাপকান পরতেন। সে পোশাক নিয়ে কি রাধামাধবের সামনে দাঁড়ানোও যায়!
গল্প যাই হোক, এই নিভৃতির অর্থ পরিত্যক্তনয় তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। দূর থেকেই মন্দিরের বারান্দায় কাজের লোকদের দেখা গেলো। শীতের ছোটো দিন। হয়তো অন্নভোগের আয়োজন শেষ করে দিয়ে এখনই শীতলের আয়োজন করছে।
শিরোমণি একবার যেমন বলেছিলো, রজোগুণটার প্রকাশ তবু চোখে দেখা যায়। সত্ত্ব যেন ফুলের গন্ধর চাইতেও হাল্কা আর অদৃশ্য, যেন লুকিয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, রাধামাধব বলল মদনমোহন বলল সত্ত্বগুণের উপাসনা। এ নিয়েও এক গল্প আছে। একজন মদনকে পুড়িয়ে ছাই করেছিলেন। অন্যজন মদনকে মোহিত করেছিলেন। মদন পায়ের কাছে লুটিয়ে স্বীকার করেছিলো হার। নারূপে না-গভীরতায় সেই একজনের প্রেমের কাছে প্রেমের রাজা মদন কিছু নয় তা স্বীকার করেছিলো। তারপরে মদন কী করেছিলো? সে সম্বন্ধে এখনো কবিতা লেখা হয়নি।
কিন্তু মানুষ কি পারে–কামের চাইতেও মনোমোহন কোনো অন্তহীন অতল ভালোবাসায় পৌঁছতে, তেমন কোনোরসকে আস্বাদন কতে, আহা, যা পরকীয়া প্রেমের চাইতেও মধুর? চরম সাত্ত্বিকতার সেই চরম মাধুর্য কৌপীনবন্ত কারো ভাগ্যে জুটেছে কিনা জানি না, কিন্তু মানুষের পক্ষে? বিনা দহনে আলোয় ঝলমল করা!
আর তার প্রমাণও আছে। রানী নিজেই জানেন। (তার মুখে হাসির মতো কিছু! তার কি এই কথাগুলোই মনে আসছে)?
কাদম্বিনী খুবই ভালো গাইতে পারতো। বৃন্দাবনের সেই মন্দির ছাপিয়ে, শুধু বৃন্দাবনের পথেই নয়, তার যশ তখনকার খাস দিল্লীর দিকে চলেছিলো। পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগেকার দিল্লী। দিল্লীতে তখনো বাদশা। সুতরাং আমীর উজীর মনসবদার। উপরন্তু কাদম্বিনী তার শ্যামবর্ণ সত্ত্বেও টিকলো নাকে, টানা চোখে, শরীরের গঠনে, সুন্দরী ছিলো অসামান্যই, তার সেই পঁচিশ বছর বয়সে। ফলে কাদম্বিনী বৃন্দাবন থেকে কাশী এসেছিলো, বাঈজী না হয়ে মাথা কামিয়ে গৈরিক পরে সেই কায়স্থের বিধবা নিজের চারিদিকে এক কঠিন ছদ্মবেশ তৈরী করেছিলো। কিন্তু একসময়ে সে রানীর সহচরী হয়েছিলো। এবং ক্রমশ সেই ছদ্মবেশ থেকে বেরিয়ে এসেছিলো একনতুন সৌন্দর্যের ভিমিত পূর্ণতা নিয়ে। তখন অবশ্য রানীরানীহননি, কাদম্বিনীর পঁচিশ, রানীর বারো হবে। পরে কাদম্বিনী এই রাজবাড়িতেও এসেছিলো, রানীর সহচরীরূপেই। দাসী বা পরিচারিকা নিশ্চয়ই নয়, বরং সঙ্গিনী, যেন বা নতুন পরিস্থিতিতে মন্ত্ৰিণী। আর তার প্রমাণ তার বেশভূষাতেও ধরা পড়তো। সে আপত্তি করলেও রানী সোনার কাজ করা বেনারসী পরলে তাকে রূপোর কাজকরা বেনারসী পরতে হত, নিদেন ঢাকাই জামদানি।
সেই কাদম্বিনী এখানে গান করতো। সেই বৃন্দাবনের গানই। বৈষ্ণব মহাজনদের পদাবলি। রানীর ধারণা তা প্রাণহীন ছিল না। কারণ কাদম্বিনী বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের জ্ঞানে যে কোনো পণ্ডিতের সমকক্ষ ছিলো। এই গান এবং এই জ্ঞানই রাজাকে আকর্ষণ করেছিল। নতুবা এটা বলার বিষয়ই হয় না। রানীরা ছাড়াও অন্তঃপুরে সবসময়েই সুন্দরী স্ত্রীলোক থাকে। তাদের কেউ কেউ রাজশয্যায় কখনো স্থান পেলে দর্পিতাই হয়; ধর্ম গেলো এবং ভক্ষিতও হলাম এরকম মনে করে না।
কাদম্বিনী একদিন চোখের জলে ডুবে রানীকে বলেছিলো, আমি এখন কী করি বলো? সব শুনে রানী বলেছিলেন, তুমি আমার চাইতে বয়সে বড়ো, ধর্ম-অধর্ম বেশি বোঝা। তুমি যা হতে চলেছে সে সম্বন্ধেও আমি বা কী জানি?
রানী ভাবলেন। একটা কৌতুক বোধ সেই ভাবনার খুব কাছে থাকায় তার ঠোঁটদুটিতেহাসি জড়ানো। আসলে সূর্যও কি পারে বিনা দহনে শুধু আলো দিতে! আর আমরা মানুষেরা তো সূর্যেরই সৃষ্টি।
কাদম্বিনী বলেছিলো–আমি কায়স্থ, আমি বিধবা, আমি রাজার বিবাহিতা স্ত্রী নই। সেদিন রানীর মুখ লজ্জায়, ব্যথায় লাল হয়ে উঠেছিলো হয়তো। (এখন তা রানীর মনে পড়ে না। সেই তো প্রথম জানা গেলো নিঃসন্তান রাজার সন্তান হতে চলেছে। সপ্তদশী রানী তখন নিজের শরীরের অবস্থাকে কিছু সন্দেহ করছে মাত্র, আর এদিকে কাদম্বিনী নিজের অভ্যন্তরে সত্তাটাকেই উপলব্ধি করছে)। রানী বলেছিলেন, এ নিয়ে তুমি খুব লজ্জিত বা অপমানিত বোধ করছো এরকম অন্তত রাজার কানে ওঠা ভালো হবেনা। বিবাহিত না হলেও রাজবাড়িতে থাকাই তোমার পক্ষে ভালো হবে। সামান্য কিছু মাসোয়ারা নিয়ে অন্য কোথাও থাকলে কোথায় নেমে যাও তা বুঝে দ্যাখো। গান্ধর্ব মতটাকে যখন মেনেছে তার উপরে বিশ্বাস রাখো।
