আসল কথা, হরদয়াল ভাবলো, তাহলে কি এই যে জীবনের স্রোত তাকে পাশ কাটিয়ে তার লাইব্রেরি-ঘরের বাইরে দিয়ে বয়ে চলে গেলো? সে ভাবলো, দেওয়ানকুঠি রাজবাড়ির এত কাছে যে রাজকুমারের পিয়ানো ঘরে বসে শুনতে পারো, তাই বলে রাজবাড়ির অন্দরে কী ঘটছে তা কি জানতে পারো যদি রানী না-জানান? এটাই বোধ হয় সেই ব্যাপার যে রানী এবং তার সংসার এবং যারা সেই সংসারের হিসাব রেখে চলে তার মধ্যে একটা অদৃশ্য। পর্দা আছে বলে অনুভূত হয়। সেজন্য ওপারের সবই বিস্ময়ের আর কৌতূহলের। কী বলবে? রানীর মতোই? নাকি একটা হীরার মতো? আলো দেখে মনে হয় ভিতরটা ছুঁতে পারা যায়, কিন্তু কে কবে হীরার ভিতরে ঢুকেছে?
প্রমাণ তো আছেই। মনে হয় রাজবাড়ির সঙ্গে বাইরের যে যোগাযোগ তাকাছারির মধ্যে দিয়ে চলে। কিন্তু ইদানীং রানীর মুখে মরেলগঞ্জের সংবাদ শুনে মনে হয় না যে তার নিজের লোক আছে সেসব খবর রাখতে? ইদানীং বা কেন? দেওয়ান হিসাবে তুমি জানতে সাহবাদ পরগনায় ছ-আনি তরফ আছে যাকে কায়েতবাড়ি বলে; জানতে, সেখানে এক কুমার আছে; জানতে, নামে তা ছ-আনি তরফ হলেও রাজার সম্পত্তি ভাগ হয়নি; জানতে, এক ট্রাস্ট ডিডের বলে রানীই সব সম্পত্তির ট্রাস্টি। জানতে, বছরের শেষে সম্পত্তির লাভ থেকে যে কোম্পানির কাগজ নিয়মিত কেনা হয় তা যেমন রাজকুমারের নামে তেমন সেই কায়েতবাড়ির ছেলেটির নামেও। জানতে, চার-পাঁচ বছর আগে থেকে সেই কুমার কলকাতায়। কিন্তু জানে না সেই কায়েতবাড়ির সঙ্গে এই রাজবাড়ির ঠিক সম্পর্কটা কী। রানী বলেননি। কর্মচারীরা, গ্রামের লোকেরা কি জানে, আন্দাজ করে? কিন্তু দেওয়ান না জানতে চাইলে কে নিজে তা বলতে চাইবে? সেই ট্রাস্টি-ডিড সে কখনো দেখেনি। এটা এখানকার নিয়ম রানী কাকে কী করতে বলেছে তা নিয়ে আলোচনা হবে না।
তাহলেও, হরদয়ালের অনুভব হল, আগে হলে বাগচীর এইসব আসরের কথা সে জানতো এই ঘটনাটা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয় সে দেওয়ান নয় আর, আর রাজকুমারের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই।
আসল কৌতুকটা অন্যত্র। রানী কী চাইছেন? সেক্রেটারি না টিউটর? নাকি বয়স্য চাইছেন যে বাগচীর মতো স্থিতধী এবং সৎচরিত্র, মদ খায় কিন্তু মদ্যপ নয়। সে নিজে এসেছিল রাজকুমারের সেই পাঁচ বছর বয়সে টিউটর হয়ে। টিউটর এবং রাজকুমারের দিনমানের সঙ্গী। তারপর ক্রমশ বদলে গেল। রাজকুমার তখন তেরো-চোদ্দো হবে। ক্রমশ পিয়েত্রো বুজরুক তার দিনের বেশির ভাগ নিতে লাগলো। সে নিজে অবশ্য তখন কাছারিতে বহাল। বুজরুক মাঝে-মাঝেই আসতো রাজকুমারকে নিয়ে যেতে। সেসব কি রানীর ইচ্ছাতে? এখন পিয়েত্রো বুজরুক নেই। সে জন্যই কিনতুনতর সঙ্গী হিসাবে বাগচী? তাহলে কিন্তু অবাক হতে হয়। ভাবলো হরদয়াল, সবটার পিছনেই কি পরিকল্পনা ছিল রানীর? কলকাতার শিক্ষা দিতে তাকে নিযুক্ত করে পরে পিয়েত্রো বুজরুক উপযুক্ততর মনে হয়েছিলো? আর এখন পিয়েত্রো বুজরুকের কাল চলে গিয়েছে বলে বাগচী?
হরদয়াল নিজের উত্তেজনায় হাসলো। নিজের উপমাকে মনে ফিরিয়ে আনলো। মনে মনে বললো, নিজেই বলছো, হীরার ভিতরে ঢোকা যায় না। কিন্তু রানীমাতা, এটা আপনার হাতড়ে হাতড়ে চলা হতে পারে, যেমন আমরা চলি। নতুবা বলতে হয় পুরুষদের মধ্যে দয়াল, পিয়েত্রো, বাগচী যেমন ক্রমে ক্রমে, স্ত্রীদের মধ্যে তেমন নয়নতারা, কেট, বর্তমানে হৈমী।
.
০৩.
স্নানে চলেছেন রানী, সঙ্গে নয়ন। পিছনে কিছু দাসী কাপড় ইত্যাদি নিয়ে।
অন্দরমহলে চতুষ্কোণ পার হয়ে প্রাচীরের মধ্যেই এই আর-এক মহল। মন্দির, নাটমন্দির, তাদের পিছনে শালবন, শালবনের পাশে দীঘি। বন অর্থে ঝোপঝাড় নয়, আগাছাও নয়। বরং গাছগুলোর তলা যেন নিকানো এমন পরিষ্কার। গাছের ফাঁকে ফাঁকে পথ। সেই বনের সামনে সোনালী গম্বুজওয়ালা লাল নাটমন্দিরসমেত সাদা মন্দির।
এখানে কারো কৌতূহল জাগতে পারে মন্দিরটা ঠিক এখানে এমনভাবে কেন?
মন্দিরের চেহারা নাটমন্দিরের চেহারা দেখে মনে হয় যথেষ্ট যত্ন আছে। কিন্তু এই রাজবাড়িরই যেখানে জাঁকজমকেরানীর জন্মতিথির কালীপূজা হয়, সে তত কাছারির দিকে, সদরে, প্রাসাদের এক অংশে। এই মন্দিরটিকে যেন কেমন লুকানো মনে হয়। শালবনের জন্য এই ধারণাটায় জোর পড়ে। আলো যখন ম্লান তখন হঠাৎ কারো মনে হতে পারে এই মন্দির পরিত্যক্ত।
বিষয়টি আসলে কিন্তু পার্থক্য। কাছারির কাছে সদরের আচার-আয়োজনের সঙ্গে এই মন্দিরের সেগুলির কিছু প্রভেদ দেখা যায়। সেখানে উৎসবের অঙ্গ হিসাবে দশটা ঢাকে কাঠি পড়ে, তেড়ে তেড়ে কাড়ানাকাড়া বাজে, বিদ্যাসুন্দরের পালাগান হয়, এবার তো শোনা যাচ্ছে নাকি ঠিয়াটারই হবে। এখানেও বাজনা বাজে, তা কিন্তু মৃদু বাঁশি আর ঢোল, কদাচিৎ জগঝম্পর একটানা ঝরঝমর। এখানে নাটমন্দিরে কখনো কীর্তন হয়, মুষ্টিমেয় শ্রোতার সামনে কীর্তনীয়া পদাবলীর সঙ্গে আখর জোগায়, কচিৎ কখনো কথকতা।
এই পার্থক্যগুলির কারণ সম্বন্ধে নানা গল্প আছে। এক গল্প বলে : এই বংশের বৃন্দাবনী গুরু, গুরু-পরম্পরায় যিনি নাকি শ্রীজীবের বংশধর, তিনি এখানে প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন। এবং সাধনা করতেন। এবং তাঁর প্রত্যাদেশেই এই রাধামাধব বিগ্রহ। এই শালগাছগুলি তখনকার। যদি দেখতে পাওয়া যায় তার মধ্যে মেহগ্নিও আছে তবে বুঝতে হবে সেগুলিই পরে লাগানো। সাধনার জন্য নিভৃত স্থানই প্রশস্ত।
