-এখনই খোঁজ করা দরকার?
-ভাবছিলাম এখন থেকেই রাজবাড়িতে অভ্যস্ত হোক, রাজুকে চিনুক, সম্ভবপক্ষে ভালোবাসতে শিখুক। আচ্ছা, আজকাল নাকি প্রাইভেট সেক্রেটারি রাখা হয়। সব লাটেদের ছোটো হোক, বো হোক–থাকে একজন।
হরদয়াল হাসিমুখে বললো–সে রকম লোক যদি পাওয়া যায় পরিকল্পনাটা বিশেষ ভালো।
রানী ঈষৎ হেসে বললেন জন্মোৎসবের পর নতুন কিছু করার রেওয়াজ হলো দেখছি। ভেবেছি, আমলাদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে এই পদটার জন্যও বড়জেটে ধরা হোক। কলকাতা থেকে কাউকে আনিয়ে নেবে? আচ্ছা, তোমার বাগচীমাস্টার ভালো ইংরেজি জানেন শুনি, রাজুর সঙ্গে ভাবও।
এবার রাজু ফিরবার পর থেকে প্রায় সন্ধ্যাতেই বোঠোকখানায় বসেন। দুজনে খুব কথা হয়। ইংরেজ রাজাদের গল্প। শিক্ষক তো, গল্প বলতে জানেন। ইতিমধ্যে হৈমীকে দিয়ে বিলেতি পিঠে, কেক না কী, তৈরি করিয়ে নিয়েছিলো। আচ্ছা, পাঞ্চো কী? এ কী বিষয়?
একটু ভেবে ইংরেজি শব্দ দুটোকে ধরলো হরদয়াল, কিন্তু পাঞ্চো যে ইংরেজি পাঞ্চ, ব্রান্ডিতে লেবু-গরমজল-চিনি ইত্যাদির এক বিশেষ মিশ্রণ, একরকমের মদকে যে এ বলে, ইংরেজিতে কেকস্ অ্যান্ড এ বলে যে এক প্রবাদ চালু আছে–এসব কি রানীকে বলা যায়!
কিন্তু রানী হাসলেন, বললেন–আচ্ছা, এই সন্ধ্যাগুলোর জন্য বাগচীকে কি কিছু বেতন দেওয়া উচিত? হরদয়াল ভাবলো, এতক্ষণে কথাটাকে সে ধরতে পেরেছে। বললো, আপনি কি মিস্টার বাগচীকে আপাতত প্রাইভেট সেক্রেটারি নিয়োগের কথা ভাবছেন?
–ভেবে দ্যাখো, ওদিকে তোমারে স্কুলও আছে।
হরদয়াল রানীর মনের গতি বুঝতে তার মুখের দিকে চোখ তুলো আবার, কিন্তু রানী ততক্ষণে আবার সুরেন-নরেশের বিষয়ে ফিরে গেলেন, বললেন–সিংদরজা থেকে পাকা পথটা আপাতত শিবমন্দির পর্যন্ত থাক। বসন্তে তো প্রাণপ্রতিষ্ঠা। তারপর সড়কটা ফরাসডাঙার আড়াআড়ি না-নিয়ে কায়েতবাড়ি থেকেও ওদিকে ফরাসডাঙার সীমা পর্যন্ত আনলে হয়। তুমি কি শুনেছো কায়েতবাড়ির ছেলেটি কালই আসছে এখানে?
হরদয়াল পথের কথায় বললো–আপনার হুকুম হলে তা হবে।
কিন্তু কায়েতবাড়ির কারো আসা যাওয়া সম্বন্ধে সে কী বলবে?
রানী ঝিকমিক করে হাসলেন, বললেন, ঝিলটায় এখন জল নেই বললেই চলে, ফরাসডাঙার সীমা পার হতে যা পেরোতে হবে। আগে হাঁস আসতো। ওটাকে বুজিয়োনা। ওর ওপারেই ছিলো ফরাসীদের ডিয়ার পার্ক। এখন একটা হরিণও বোধ হয় নেই। ওটা পিয়েত্রো এক তাসের বাজিতে তোমাদের রাজার কাছে জিতেছিলো। তারও আগে অবশ্য আমার শ্বশুর পিয়েত্রোর বাবাকে বাধ্য করেছিলেন জমিটুকুকে তাঁর কাছে ইস্তফা দিতে।
হরদয়াল কী বলবে খুঁজে পেলোনা। অনেকগুলো কথা হয়েছে, কোনোটাই অকার্যকরী নয়, কিন্তু কোনটা প্রধান? সবগুলো কাজ হলে ভিতরে বাইরে এক পরিবর্তনের ছাপ পড়বে অবশ্যই।
রানী নিজেই বললেন–আচ্ছা, হরদয়াল, তুমি সবদিকে চিন্তা করে জানিও।
রানী নিজের ঘরে গেলেন। সেখানে নয়নতারা তখন অপেক্ষায়। রানী বসলেন। গায়ের চাদরটাকে রাখলেন। কিন্তু প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বললেন, চলো, নয়ন, স্নানে! তুমি কি বাড়ি যাবে ভাবছিলে? আজ দীঘিতে স্নান। ওদিকের ওই আলমারিটা খোলো; ওতেই বোধ হয় নতুন কাপড়। তোমার-আমার জন্য শাড়ি বেছে নাও।
এগুলো প্রাত্যাহিক আলাপের মতোই। যদিও এ কি এক পরীক্ষা–এই শাড়ি বাছার ব্যাপার? সেখানে তো নানা রং নানা ঢং নানা জাতের শাড়ি।
.
০২.
হরদয়াল সিঁড়ি দিয়ে নামলো। এখন তারও কাজের চাপ নেই। রানী কেন ডেকেছিলেন? অন্তত আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে কথা বললেন। বাগচীমশায়কে নিয়োগের কথা বলতে? রানী যেমন চাইছেন বাগচী তেমন একজনই বটে।
ইংরেজি ভাষার দখলে যে কোনো ইংরেজের সমকক্ষ। পরবর্তীকালে স্টেটের দেওয়ান, নায়েব ম্যানেজার যা হয় একটা হবেন। কিন্তু এখন কী কাজ হবে তার? প্রাইভেট সেক্রেটারিদের কী কাজ থাকে? মনিবদের চিঠিপত্র আদানপ্রদান কিংবা দেখাসাক্ষাতের ব্যাপারে মনিব এবং বাইরের জগতের মাঝখানে বাফার? কিন্তু আসল কাজ কি মনিবের চিন্তার প্রতিফলক হওয়া? চিন্তার প্রতিফলক! বেশ কথাটা, আয়না যেমন ব্যক্তির–যেমন–যেমন সে নিজেই বুঝি বা রানীর চিন্তার প্রতিফলক হয়ে পড়ছে। হরদয়াল কিছুটা কৌতুক বোধ করলো। কিন্তু এ তো বোঝাই যাচ্ছে, রানীর সবগুলো প্রস্তাবের মধ্যে যেন সবলতর হয়ে ওঠার ভাব ছিলো। তাহলে কোনো কারণে কি দুর্বল বোধ করছিলেন?
নিজের কুঠির কাছাকাছি এসে কেকস্ অ্যান্ড এল এই বাক্যাংশে যেন আবার শুনতে পেলো। ও দুটোর সমন্বয় তার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। কিন্তু কে আনলো কেক রাজবাড়িতে?
কোন ময়রা মিষ্টান্ন পাঠায়, অন্দরে কোথায় কী মিষ্টান্ন তৈরী তা কাছারিতে জানার কথা নয়। সে জন্য রাজবাড়ির গোমস্তা-সরকার আছে। কিন্তু বিজাতীয় এই কেক যা বাগচী বাড়িরও নয়? কে হৈমী যে বিজাতীয় কেক তৈরী করতে পারে রাজবাড়ির ভিতরে? কে কোন পালকিতে ঢুকে রাজবাড়ির অন্দরে থেকে গিয়েছে তাও তোমার জানার কথা নয়, তাহলেও এটা বিস্ময়ের যে তেমন একজন কী করে কোথা থেকে এই গ্রামেই বা এসেছে? ওটাও দ্যাখো বিস্ময়ের যে, বাগচীমশায় ইদানীং অনেক সন্ধ্যায় রাজকুমারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন। বলবে, বাগচী স্কুলের শিক্ষক, তাকে তুমিই এই গ্রামে এনেছো? হরদয়াল হাসলো। অবশ্য বাগচী তার এমন অধীন থাকতে পারে না যে তিন বছর বাদেও গ্রামের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সে নিজের সম্বন্ধ স্থাপন করবে না। তাহলেও আশ্চর্য লাগে যে সে এ বিষয়েও জানতো না!
