রানীমা বয়স্ক কর্মচারীর এই কমবয়সী আনন্দ দেখে হাসলেন, বললেন–বেশ তো, তোমরা যা ভালো বোঝে। নায়েব উঠে দাঁড়ালো। বললো–ফেলিসিটার লিখেছে তার নৌকোয় কায়েতবাড়ির কুমার আসছেন। রানী একটু ভাবলেন। বললেন এক মুহূর্তেই, তাহলে দুপুরের পর থেকেই হাওদা রাখতে হয় বোধ হয় কুতঘাটে।
নায়েব চলে গেলে রানী নিজের ঘরের দিকে ফিরতে ফিরতে ভাবলেন। তার কল্পনায় বিশেষ আলোকোজ্জ্বল রাজবাড়িটা ধরা দিলো। অন্যান্যবার কিছু কম আলো থাকে না, এবার তা বিশেষ হবে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলার নিজের ঘরের দিকে চলতে চিন্তা করলেন, এসবই কেমনভাবে ঘটতে থাকে না? ডানকানই আর তার সেই তশীলদারের কথা ভাবে? চন্দ্রকান্ত বোধ হয় নাম ছিলো। কিন্তু রোহিণী নামে সেই স্ত্রীলোকটি? রাজকুমার হয়তো বয়সের ধর্মে ভুলে যেতে পারে। তার মনে হলো, আচ্ছা, রাজুকে কি উদাস দেখায়? নাকি ছেলেরা বড়ো হলে তেমন মনে হয়?
অলিন্দ দিয়ে চলতে চলতে সেই দুপুরের বসার ঘরের দরজার মুখোমুখি অলিন্দ যেখানে ঝুলবারান্দায় বেড়েছে তার কাছে দাঁড়ালেন। নয়নতারা তখনও বই-এর সামনে দরজার পাশেই। মুখটা নিচু কিন্তু তার কোণে যেন কৌতুক।
পায়ের শব্দে নয়নতারা মুখ তুললে রানী বললেন, কী করছোনয়ন? বইটা কি ভালো নয়, নাকি টীকায় সন্দেহ আছে?
নয়নতারা বললো–কত বড়ো পণ্ডিতের লেখা; সন্দেহ কোথায়?
–মুখের চেহারায় রানী হাসলেন।
নয়নতারা অবাক হলো। অসময়ের এই কালীপূজা যা রানীমার জন্মোৎসবের অঙ্গ সে বিষয়ে তার তো কিছু সন্দেহ আছেই। তাই কি ধরা পড়েছে তার মুখে? সে হেসে বললো, আমার ভ্রূর গঠনে কিছু দোষ আছে, রানীমা।
–হুঁ। তুমি তো কম নও।
নয়নতারার মুখটা একটু বিবর্ণ হলো। কথাটা সুপ্রয়োগ হয়নি।
কিন্তু রানী হাসতে হাসতে বললেন, এবার কিন্তু তুমি দুষ্টু হয়ে ফিরেছে। রানীকে তেমন মানছে না। কিন্তু যেন চেঞ্জো থেকে ফিরে আরো ভালো দেখায় তোমাকে।
কথার আড়ালে সরে রানীমা ভাবলেন, ছেলেরা বড়ো হলে….কিন্তু কালীপূজার ব্যাপারটাকে নানাভাবেই প্রশ্ন করা যায়। রাজবাড়ির জন্মদিনের উৎসবগুলোতে সাধারণত গৃহদেবতা রাধাগোবিন্দর পূজা হয়। ছেলেরা বড়ো হলে তাদের মনের এক শরিক হতে পারে যে মা নয়। হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগলো মনে। নয়নতারা কি জানে? রাজু কি তাকে বলেছে? এসব কত দিনে তামাদি হয়?
রানীর অন্তর চঞ্চল হলো। একটু যেন ঝুঁকে নিচের উঠানটাকে দেখলেন। একটু যেন আবার শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। ভাবছিলেন তো। ঘরের দিকে ফিরে বললেন–দ্যাখো নয়ন, ভুলে গিয়েছি। তুমি কাউকে দিয়ে এখনই একবার হরদয়ালকে আসতে বলে দাও।
রানীর স্বরটা দ্রুত। নয়নতারা তাড়াতাড়ি উঠে ভৃত্যদের খোঁজে গেলো।
রানী চারিদিকে চাইলেন, কিন্তু সেখানেই বা বিষণ্ণতা কোথায়? দিনশেষের বেলা তো নয়, দুপুরের দিকে চলেছে দিন যার উজ্জ্বলতা চকমিলানো দেয়ালগুলোর মধ্যে রোদে কবোষ্ণ জলাশয়ের মতো অগাধ স্থির। তখন কিছু কি উদাস? রানী মনে করতে পারলেন না রাজুর চোখ দুটিকে শেষ কবে ভালো করে দেখেছেন। বরং অনেক পিছিয়ে মনে হলো রাজুর ধাই-দাসী বলছে, এ মা, একেবারে হরিণচোখ, মেয়ে নাকি, রানীমা! এখন রাজু অনেক বেড়েছে। নায়েবমশাই, হরদয়াল দুজনেই দীঘল চেহারার মানুষ, রাজুকে তাদের চাইতে দীঘল দেখায়। হাসি হাসি দেখালো রানীমার মুখ, কিন্তু সে হাসি দেখলে দৃঢ়তার কথাও মনে হতে পারে কারো। আসলে ছেলেরা বড়ো হলে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত হবে। পরিচয়ে সত্য থাকবে। পারো কি আড়াল করতে?
ইতিমধ্যে নয়নতারা ফিরেছিলো। রানী বললেন, শিশুর চোখ দুটি মায়ের চোখের দিকে অপলক চেয়ে থাকে; তার বাইরে কিছু দেখতে চায় না। বড়ো হলে, তুমি দেখবে, তা স্বাভাবিক নয়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী মায়ের মুখের চাইতে বিচিত্র, তাই নয় কি নয়ন?
নয়নতারা প্রস্তুত ছিলো না। সে কথাটা ভালো করে বুঝে উত্তর দেবার আগেই অলিন্দর। শেষ প্রান্তে পায়ের শব্দ হলো।
হরদয়ালই এসেছে। নয়নতারা অন্যত্র গেলো।
কিন্তু তখন কি আলোচনার সময়? বরং স্নানাহারের উদ্যোগ করতে হয়। রানীকী নির্দেশ দেবেন যা জরুরি? তিনি অলিন্দেই দাঁড়িয়ে রইলেন, সুতরাং হরদয়ালকেও সেখানে দাঁড়াতে হলো। রানী যেন গায়ে রোদ লাগাচ্ছেন, যেন বা কথা বলার জন্যই কথা বলা, থেমে থেমে কথা বলছেন। রানী বললেন, হরদয়াল, কলকাতার বাড়ি সম্বন্ধে আর কিছু ভেবেছো?
আহিরিটোলার বাড়িটা কেনা যায়, আর কালীঘাটের দক্ষিণে গিয়ে হেস্টিংয়ের বাড়ি ছাড়িয়ে সেই জমিটা দেখতে বলেন
-উৎসবের পরেই তাহলে কলকাতায় যাও। এদিকে নরেনের তৈরি বাড়ির সামনে বসানোর গাড়িবারান্দার নক্সা কি দেখলে? সব ইংরেজি বাড়িতেই নাকি তা থাকে। ভালো হবে? খৃস্টমাসে এবার রাজুর কলকাতায় যাওয়ার কথা কী ভাবলে?
নক্সাটা আর-একটু দেখে আপনাকে জানাবো। খৃস্টমাসের জন্য আপাতত আহিরিটোলার বাড়িটা ভাড়া নেওয়া যায়।
রানী দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। হরদয়াল চিন্তা করলো, এসব কথা কি এমন জরুরি? এ কি রানীর মনের কোনো চঞ্চলতাকে ঢাকার চেষ্টা? কিছু কি ঘটেছে? কথা শুনতে সে মুখ তুলেছিলো, নিজে থেকেই মুখ নামালো।
রানী বললেন–আচ্ছা, হরদয়াল, তুমি কি ভেবেছো আমাদের নায়েবমশাই বুড়ো হয়েছেন, হয়তো চার-পাঁচ বছরে বিশ্রাম নিতে চাইবেন। তার জায়গায় তখন কাজের মানুষই লাগবে। আমাদের ধরন বোঝে, তাকে ভালো লাগে এমন একজন দরকার হবে না? (রানী এই জায়গায় হাসলেন)। তাছাড়া এমন দুএকটা গোপন ব্যাপার থাকে যা গোপন রেখে চলতে হয়। আজকালকার ব্যাপার তো, নতুন লোককে ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে।
