পেত্রোর পাল্লায় পড়ে, যে করে হোক, ইংরেজ গোবরার শত্রু। তা থেকেই সেদিন ইংরেজদের উপরে রাগ হয়েছিলো। তা থেকে সড়ক কাটা। আশ্চর্য কথা দেখছি। কিন্তু এ কি উচিত তোমার রাগে মনিবকে মামলা-হামলায় জড়ানো?
গিন্নি বললো, তামুক খেয়ে কি এখনই কাছারিতে যাবে? তাহলে জলপান
-আমি বলি কী–এখন কিছুদিন দইয়ের শরবৎ দিও।
–এই শীতে দইপানা?
–পিত্তটা বিশেষ কুপিত মনে হচ্ছে না? খামকো রাগ হয়ে যায়।
–তাহলে ওষুধ করতে হয়। বলো কী!
কী লাভ বলো? নায়েব হেসে উঠলো। তামাকের ধোঁয়াটাও গলায় লাগলো। হাসি ও কাশির মধ্যে বললো– তো, একবেলায় খোঁয়াড়সমেত সায়েবটাকে ছাই করা যায়। সবকটাকে, বন্দুকে ঠেকে না, গ্রামসমেতই যদি বলো। তাতে কিন্তু পিত্তই কুপিত হয়। রাস্তা কেটে কী বা হয় বুড়োবয়সে পিত্ত কুপিত হওয়া ছাড়া?
কাছারিতে ফিরে নায়েব ল-মোহরারকে ডাকলো। সে এলে বললো, একটা কথা ঠিক রেখো। মামলায় লম্বা লম্বা তারিখ নেবে। ঢিলে দিতে থাকো, উকিলকে টাকা ঢেলে দিক ডানকান। এদিকে শামসুদ্দিনকে ফিরিয়ে আনেনা, জমিতে চাষ দিক। না আসে, অন্য কাউকে বসাবে জমিতে। গ্রামে কি শামসুদ্দিনের অভাব পড়েছে? তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখো, খেলো খেলো এগোও। জেবন কেটে যাক ওই সড়কে। স্বত্বটা দেখে নিক।
গৌরী গেলে নায়েব হেসে তামাকেই মন দিলো আবার। তার নায়েবি মাথায় তখন খেয়াল–স্বত্বের কিন্তু দুই পক্ষ, এক স্বামীত্ব করে, অন্যে বলে তারই হক। ফিরিঙ্গি পেত্রোর ফরাসডাঙায় স্বামীত্বই বা কে করে? …ওদিকে দ্যাখো, গিন্নি যেমন বললো, রাজকুমার নাকি কী কাণ্ড!নায়েব তার ফরাস আর দেয়াল বরাবর সাজানো কুর্সির মাঝখানে ধোঁয়ায় ভরা ফাঁকটাকে দেখছিলো। ধোঁয়া, খালি পাক খাওয়া ধোঁয়া। আরে কাণ্ড! সে একেবারে স্তম্ভিত! দোলডগর, লোকলস্কর, খানাপিনায় চেপে গিয়েছে ব্যাপারটা। দখল বলে দখল? শোবার ঘরে বাঁশগাড়ি। হাওয়াঘরে শিব-গাড়া! রানীর বিচক্ষণতায় সে দিশেহারা হয়ে গেলো।
০৬. রানীমার জন্মোৎসব
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
০১.
রানীমার জন্মোৎসব নিশ্চয়ই বড়ো ঘটনা। তখন সেই রঙিন মেঘে সকলের আকাশই ঢাকা। কিন্তু উল্লেখযোগ্য আর কিছুই কী নেই? সেটাও তো রানীমারই উৎসব–শিবমন্দিরের বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়নি, সেটা হবে তো। জন্মোৎসবের দিনবিশেক আগে রানীমা নয়নতারাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। নয়নতারা রাজবাড়ি আসতে গিয়ে নতুন জোগাড় করা একখানা পুঁথি এনেছিলো।
এটা কৌতূহলের ব্যাপার। নয়নতারার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে রানীমার কি এত বই পড়ায় ঝোঁক ছিলো? অথবা নয়নতারাই কি মহাভারত ও অন্যান্য পুঁথিতে এত মনোনিবেশ করতে অভ্যস্ত ছিলো? পাঠকের মনে পড়বে, রানী যখন নয়নতারাকে রাজবাড়িতে ডেকেছিলেন, তখন অন্য উদ্দেশ্য ছিলো। এখন সে রাজবাড়িতে এলে বারানসী অক্ষরে লেখা মহাভারতের কোনো-না-কোনো পর্ব তার হাতে থাকে। ব্যাকরণ ভাষ্য টীকা সহকারে তা পাঠ হয়। এ থেকে কি কোনো সাধারণ সূত্রে পৌঁছনো যায়? –মানুষ কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে যে-কাজ আরম্ভ করে, একসময়ে উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে সেই কাজটাই নতুন উদ্দেশ্য সৃষ্টি করতে পারে।
নয়নতারা আসতেই রানীমা বলেছিলেন, তোমাকে একদিন শিবমন্দিরটা দেখতে যেতে হয়। শিবচতুর্দশীর আগে শেষ হওয়া দরকার। তাছাড়া সেই রাতে মেয়েরা কোথায় থাকবে, কোথায় স্নান করবে? পড়ো দেখি কী এনেছে আজ।
কিন্তু পড়া শুরু করার আগেই রানী হাসলেন। বললেন–হা,নয়ন, সেদিন বেনেরা ইচ্ছা তৈরি করে বলে খুব বলে খুব ঠকালে। কিন্তু আর-একরকম ইচ্ছাও কি নেই? এমনকী হতে পারে যাকে আমরা বুদ্ধির সাহায্যে ক্ষুধা নাম দিয়েছি, সেটাও আসলে একটা প্রবল ইচ্ছা? সেটা আছে বলেই বুদ্ধি তার নাম দিয়েছে।
-আপনি কি বলবেন তা বুদ্ধির চাইতে পুরনো?
বাহ্, যে-শিশুর কথা ফোটেনি তারও ক্ষুধা আছে, যে-প্রাণীর চেতনা নেই বলি, তারও ক্ষুধা আছে। দ্যাখো, ক্ষুধা নামে ওই ইচ্ছাগুলো আমাদের চালাতে থাকে, বুদ্ধিনা না করলেও থামা নেই।
–এ তো বড়ো ভয়ঙ্কর কথা যে আমরা বুদ্ধিতে চলি না! নয়নতারা হাসলো।
রানী বললেন–সেদিন হৈমী বাইবেলের গল্প করছিলো। ওদের ভগবান নিষেধ। করেছিলো তা সত্ত্বেও আদম না কে একজন ফল খেলোই। বুদ্ধি চালালে ভগবানের অত কাছের মানুষ কি বোকার মতো সেই ফল খায়, হলোই বা মেয়েমানুষের পরামর্শ? চৌদ্দপুরুষ ধরে অভিশপ্ত হয়?
রানী হাসলেন। নয়নতারা জিজ্ঞাসা করলো–হৈমী বাইবেল পড়ে নাকি?
রানী নয়নতারাকে ভালো করে দেখলেন, ভাবলেন, হয়তো পরে একদিন জানবেনই; তাহলেও এখনই কেন? যেন হালকা কিছু এমনভাবে হেসে বললেন, কিন্তু কপালের প্রান্তে যেন বিষণ্ণতাও। বললেন–তো, তোমার এই ইচ্ছা যার নাম ক্ষুধা সে কি বেনেদের চাইতে পুরনো নয়? অন্যদিকে গাছেরও আত্মপুষ্টির ফুল ফুটানোর ক্ষুধা থাকে। সে কি জানে ফলে তার কী লাভ?
আলাপটা এগোতে পারলো না। নায়েব উৎসবের ব্যাপারে দেখা করতে চাইছে জেনে রানী উঠে গেলেন। নায়েব নিবেদন করলো : শিশাওয়াল ফেলিসিটার কাল বিকেলের দিকে এসে পৌঁছবে আশা করা যাচ্ছে। আজ চিঠি পেলাম। নায়েব হাসলো। বললো– আবার, লিখেছে আলো দিয়ে সম্পূর্ণ রাজবাড়ি সাজানোর ভার এবার সে নিতে চায়। সেই ব্যবস্থা করে আসছে। আমরা কি অপেক্ষা করবো?
