তাহলে এটা কি বুদ্ধিমতী রানীর বিষের ওষুধ হিসাবে বিষ প্রয়োগ করা? এক সুন্দরীর প্রভাব কাটাতে অন্য এক রূপসীকে পাশে এনে দেয়া। বিষস্য বিষৌষধি?
হরদয়ালের মুখে একটা হাসি যেন দেখা দিলো। যেন সে ডায়েরিতে মন্তব্য করবে-কিন্তু রানী, খুব হুঁশিয়ার হয়েই এই বিষ প্রয়োগ করা উচিত হবে।
এসবে তার পদচ্যুতির কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। বিদেশী প্রভাবেই কি রানীর আপত্তি? বিদেশী প্রভাব কি আলোর ডোমগুলিতে, পর্দাগুলিতে, আসবাবপত্রের অজুহাতে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে না রাজবাড়িতে?
রানীর চরিত্রই যেন হরদয়ালের সম্মুখে। আজ সেটাই সবচাইতে মূল্যবান এমন অনুভব করলো সে হাসিহাসি মুখে, যেন সে একজন লেখক যে নিজেই একটা চরিত্র সৃষ্টি করে। তখন তো লেখক অন্য সবকিছু ভুলেও যায়, নিজের জীবনে ক্ষতি কিছু থাকে তাও।
অন্যদিকে ওটাও কি বিদেশী প্রভাব দূরে রাখা? কাল রাতের সেই মুন্সেফি কোর্ট দূরে রাখার অসহায় ইচ্ছাটা ভাবো। কলকাতায় হাইকোর্ট বসবে। এবং দেশের সব আদালত তার অধীনস্থ হবে। হয়তো শেষ পর্যন্ত কোম্পানীর আদালতগুলি উঠে যাবে। ছোটো-ছোটো আদালত স্থাপিত হবে হাইকোর্টের এক্তিয়ারে। রানী চান না তেমন কোনো আদালত গ্রামে স্থাপিত হয়।
মুন্সেফি কোর্ট আসাটা হরদয়াল নিজেও সমর্থন করে। সে এ-ধরনের শাসন বিস্তারে শুভ দেখতে পায় বৈকি।
কিন্তু রানী কী চাইছেন? তিনি কি কল্পনাতেও নিজের আদালত স্থাপনের কথা চিন্তা করেন? করদ রাজ্য বেহার রাজ্যের আদালতের কথা বলছিলেন না? অন্য কেউ বললে এ সম্বন্ধে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে না হরদয়াল। কিন্তু রানীর লাবণ্য যত কোমল মস্তিষ্ক তেমনই তীক্ষ্ণধার নয় কি? কিন্তু তুমি চিঠি লেখো আর না-ই লেখো, ডায়েরিতে চিন্তাগুলোকে বসাও কিংবা না-ই বসাও রাত হয়ে যায়।
রাত হলো বৈকি। ইতিমধ্যে ভৃত্য একবার পর্দার ওপারে এসেছিলো। দশটা বাজে ঘড়িতে। লাইব্রেরীর এটা একটা কৌতুক যে রাতের বয়স কত হলো তা এখানে বোঝা যায় না যেন।
বন্ধু তাকে বলেছে কলকাতায় গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে। কলকাতায় কী হয় জানি না, এখানে আমাদের কিন্তু অনেকের বয়স হয়েছে। বয়স হলে তার অতীত থাকে না। অতীতকে কি বিসর্জন দেওয়া যায় সবসময়ে, কিংবা সবটুকু অতীতকে?
ভৃত্য এসে এবার বললো– টেবল পাতা হয়েছে।
হরদয়াল উঠলো।
লাইব্রেরি থেকে খাবার ঘরে যেতে একটা সরু প্যাসেজ পার হতে হয়। তার একটা জানলা রাজবাড়ির দিকে। চলতে চলতে কানে এলো, মনে হবে যেন জানলার ওপারেই বাজছে। তা সম্ভব নয়। কারণ এটা পিয়ানো এবং রাজকুমার বাজাচ্ছেন। তাহলে বরং এটাই প্রমাণ হয় রাজকুমারের ঘর–যেখানে তিনি পিয়ানো বাজান-তা দেওয়ানকুঠির এই দিকেই।
একটু দাঁড়ালো হরদয়াল। ইতিপূর্বেও দু-একবার বাজনা কানে এসেছে তার। রাজকুমার যে বাজান তা সে ভালোভাবেই জানে। প্রতিবারেই কলকাতায় তাকে স্বরলিপি খোঁজ করতে হয়। বাঃ, ভারি সুন্দর তো! বাজনাটার বৈশিষ্ট্যই যেন জানলার কাছে নিয়ে গেলো তাকে। গম্ভীর মধুর কিছু, যেন কিছু বিষণ্ণ। যেন মানুষ যখন চাঞ্চল্যের বাইরে যায় সেই বয়সের সুর। কিন্তু তা হয় নাকি? হরদয়ালের মনে পড়লো এই গ্রামে যারা চল্লিশ হচ্ছে তাদের কথা; সে নিজে, বাগচী, রানীমা। কিন্তু এই গম্ভীর মধুর ক্লান্ত সুর কি প্রাণ থেকেই উঠে আসে না? পছন্দ-অপছন্দে মানুষের স্বরূপ ধরা পড়ে। এই সুর অন্তরে অনুভব করার মতো গম্ভীর হয়েছে নাকি রাজকুমার ইতিমধ্যে?
০৫. দলিল-দস্তাবেজ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
০১.
ঘটনা কী সে সম্বন্ধে ভিন্ন মত আছে। উপরন্তু যদি কেউ সে সময়ের দলিল-দস্তাবেজ উল্টে পাল্টে দেখে তবে তার হঠাৎ অনুমান হতে পারে তখনই তো এক নতুন জাতের সব ঘটনার সুচনা হচ্ছিলো গ্রামে। একটা উদাহরণ নাও। কাছারিতে তখন রানীমার জন্মোৎসবের কথাই প্রাধান্য পাচ্ছিলোতা ঠিকই, কিন্তু সেই একরকমের যুদ্ধ, যার অন্য নাম আধুনিকতাও বলা যায়, তার কথাও এসে পড়ছিলো।
মূলে সেই রাস্তা কাটার ব্যাপারটাই। সোজা সে কথা? নাক কেটে দেওয়ার চাইতে কম কিছু? তাও কার? ডানকানের? হতে পারে সে স্কচ, একেবারে যোলআনা ইংরেজ নয়, তা হলেও সে কি রাজার দেশের লোক নয়? জ্ঞাতকুটুম্বদের মধ্যে পড়ে না? অথচ মাথা ফাটলো না দু-পাঁচজনের, দু-চারজনের বুকে বল্লম বিধলো না, এক কথায় রক্তে মাটি ভিজলো না। এদিকে নায়েবমশায়ও যেন ব্যাপারটাকে নিজের মনের মধ্যে চেপে রেখেছেন। রাগ (নাকি ক্রোধই বলবে) ছাড়া কী? দারুণ ক্রোধ। নতুবা আলাপ-আলোচনা নেই, কথাবার্তা নেই, শাসানো নেই। লাঞ্চো খেলে তো একই সঙ্গে বসে (না-হয় নায়েব নিজে খাননি) আর সেই লাঞ্চো থেকে উঠে এঁটোমুখেই হুকুম গেলো সড়ক কাটার। এদিকে সব শুমশাম। যেন কিছুই নয়। কিছু না-ঘটাই তো একটা ঘটনা।
কারো কারো মতে এটাই ঘটনা যে ১৮৫৭ শেষবারের মতো ঘটেছে আর ঘটবে না, ঘটনা এটাই যে এখন থেকে নতুনভাবে ঘটবে। এসব লক্ষ্য করেই তারা বলতে পারে :হতে পারে তখনও স্যার বানেশ পীকক কলকাতার হাইকোর্টে জমকালো হয়ে বসেনি। কিন্তু এখানে যেন পরে যা হবে তার সূচনা সেবারই দেখা দিয়েছিলো। একটা বড়ো রকমের পরিবর্তনের সূচনা। তুমি তোমার ধর্মমত, আর্থিক সঙ্গতি এমনকী চামড়ার রং নিরপেক্ষ অন্য সকলের সমান। এ কি আগে কখনো ছিলো? তুমি বিধর্মী হলেই কোণঠাসা, তোমার চামড়ার রং কালো বলেই তোমার কথা মিথ্যা এইনা-এতদিন, পাঁচশ বছর ধরে, হয়ে এসেছে। এখন দ্যাখো সমান হচ্ছে। ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠা হবে। এই সমান কথাটা নিয়ে রসিকতা আছে। ফুটপাথে শুয়ে থাকা ধনী-নিধনের পক্ষে সমান অপরাধ। সত্যমিথ্যা নিয়েও কম গোলযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে সত্য কি তাই নয় যা প্রমাণিত হলো! আর প্রমাণ মানেই হলপ করে বলা কথা।
