হরদয়াল নিজের অর্ধসমাপ্ত চিঠিটাকেও উপরে তুলো আবার। মেট্রোপলিটানে অধ্যাপকের পদপ্রাপ্তির জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলো সে বন্ধুকে। স্কুল ভালো চলেছে। নিয়োগী কিছু পাগলাটে বটে, বোধহয় কার্পণ্য দোষ আছে যার জন্য তিনি গর্ববোধ করেন, কিন্তু পড়ান ভালোই। নিয়োগের পরে আর আলাপ হয়নি। সে জানতে চেয়েছিলো এই চার বছরে নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় জনসমাজে কী কী পরিবর্তন সূচনা করেছে।
নিজের কথা সে কিছু লেখেনি। কেন সে গ্রামে থাকে অর্থাৎ দ্রুত ধাবমান কলকাতা শহরের আধুনিক সমাজের বাইরে, কী তাকে গ্রামে আকৃষ্ট করে–এসব কিছু জানায়নি সে। সে কি লিখবে গ্রামের সৌন্দর্য অথবা শান্তির কথা?
বন্ধুর চিঠিটা সযত্নে রেখে দিলো হরদয়াল। চিঠি লেখা এখন অন্তত হবে না।
কয়েকটি সত্যভাষণহলো,কয়টি মিথ্যাভাষণ হলো, ডায়েরি তার হিসাবনা-হয়েও অন্য রকমের কিছু হতে পারে। হরদয়াল চিন্তা করলো আমরা কি নিজের স্বরূপ নিজের কাছে। প্রকাশ করি ডায়েরিতে? আত্মজীবনী হতে পারে? যাতে কোনো পোজ থাকে না। হরদয়াল ভাবলো পোজ শব্দটার বাংলা কী হবে?
দেয়ালঘড়িতে মৃদু গম্ভীর শব্দ হলো। রাত হয়েছে তাহলে। আত্মজীবনীতে নিশ্চয়ই পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধেও সংবাদ থাকে। কারণ মন তো নিরালম্ব নয়।
হরদয়াল উঠলো। আবার আলমারি থেকে নতুন একটা কাঁচের গ্লাস নিয়ে এলো। একবার ব্যবহার করা গ্লাসে আবার মদ নিলে কি স্বাদে তারতম্য হয়?
ডায়েরিতে অন্যের সম্বন্ধেও মন্তব্য থাকে। আত্মজীবনীতেও অন্যের জীবনী এসে পড়ে। এই গ্রামে যদি কারো জীবনের কথা লেখা যায় তিনি নিশ্চয়ই রানী? তাই নয়? অন্যদিকে বন্ধু ভাবছে এখনো সে দেওয়ান। না সে আর দেওয়ান নয় এ কথাও বন্ধুকে জানায়নি কেন? এত বড়ো একটা সংবাদ সে দিতে পারলো না কেন? এটা কি একটা পোজ নয়? এই পোজ থেকে মুক্তি ডায়েরি লেখার যুক্তি হতে পারে?
হরদয়ালের চোখের কাছে কি বেদনার চিহ্নের মতো কিছু দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে গেলো। হ্যাঁ, সে আর দেওয়ান নয়। আজই কি তা আবার প্রমাণ হলো না? তার একসময়ের অধস্তন নায়েবমশায় এখন অনায়াসে সে কী কাজ করবে তার নির্দেশ দিতে পারেন। এটা কি নিদারুণ লজ্জার বিষয় বলেই ডায়েরিতে স্থান পায়নি?
ঘটনার কথা মনে আছে তার। সেদিন তখন অনেক রাত হয়েছে। হরদয়াল তার নিজের শয্যায় একখানা বই পড়ছিলো। পদশব্দে এবং বোধ করি সুগন্ধেও সে বই থেকে চোখ সরিয়েছিলো। রানী স্বয়ং, একা! রাজকুমারের বিবাহের সম্বন্ধ নিয়ে কলকাতার এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। তিনি ফিরে যাওয়ার পরে রানীর নিজের আত্মীয়স্থানীয় এক মহিলা কিছু লিখেছিলো চিঠিতে যাতে রানী অপমানিত বোধ করেছিলেন। হয়তো কেটের মতো বিদেশিনী সুন্দরীর সাহচর্যে রাজকুমার ভ্রষ্টচরিত্র এরকম ইঙ্গিত ছিলো। কারণ রানী বাগচীমাস্টার এবং তার স্ত্রী কেটের গ্রামে থাকা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। হরদয়াল বলেছিলো তারা নিরপরাধ। সে বলেছিলো এর জন্য রাজকুমারের বিবাহ বন্ধ হতে পারে না। সে এই পাত্রীর সঙ্গেই বিবাহ ঘটিয়ে দেবে। রানী তাকে সেই রাতেই বরখাস্ত করেছিলেন। হরদয়াল শুধু বলতে পেরেছিলো আমার স্কুল? রানীতাকে সাধারণ প্রজাদের একজন হয়ে সে-বিষয়ে আবেদন করতে বলেছিলেন। অথচ সে গ্রাম ছেড়ে যায়নি।
ডায়েরিতে (তা যদি আত্মজীবনীও হয়) অন্যের চরিত্রও ফুটে ওঠে। হরদয়ালের মনশ্চক্ষে রানী যেন ফুটে উঠলেন। কেন এই পদচ্যুতি তা কি সে বুঝতে পেরেছে? রানীকে শেষ যেদিন দেখেছে সে তখন যেমন তাকে দেখিয়েছিলো তেমনটাই যেন হরদয়াল দেখতে পেলো। রানীর মতো এমন চরিত্রই-বা কার এই গ্রামে?
হরদয়ালের মনের কি এটা পলায়ন-প্রবৃত্তি? পদচ্যুতির মতো কঠিন শাস্তি, যা অপমানজনকও বটে তা থেকে সরে আসার চেষ্টা? কিংবা এটা কি এমন যে, যে-রানী সেই। শাস্তির উৎস হরদয়ালের মন তার সম্মুখে গিয়ে এখনো বিষয়টাকে বুঝতে চেষ্টা করছে?
বাগচীমাস্টার এ গ্রামে থাকায় রানীর আপত্তি শুধু সেটুকুই ছিলো নিশ্চয় যেটুকুমাত্র তাদের জীবনযাত্রার প্রভাব রাজবাড়িতে প্রবেশ করে। নতুবা তার প্রজারা কে কী ধর্ম আচরণ করে তার জন্য তাঁর চিন্তার কিছু নেই। অর্থাৎ রাজকুমারের উপরে কেটের প্রভাব পড়ছে। কেট বিদেশিনী এবং সুন্দরী। হ্যাঁ, তরুণ মনে প্রভাব রাখতে পারে এমন সৌন্দর্যই বটে তার। রাজকুমারের তরুণ মনকে রূপসীর প্রভাব মুক্ত রাখাই কি রানীর চেষ্টা? রাজকুমার কেটকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলো এই জেনেই কি রানীর ক্রোধ? যার ফলে সে আর দেওয়ান নয়?
এদিকে দ্যাখো, কাল রাতে আবার অন্য ভাবনাও উপস্থিত ছিলো। দুবার অন্তত, যদিও হয়তো তা দুই রকমের সুরে, তিনি বলেছিলেন নয়নতারা রাজকুমারের সঙ্গে থাকাতেই ভাবনা। অথচ রানীর প্রশ্রয় ছাড়াই কি নয়নতারা রাজকুমারের সঙ্গী হতে পারতো?
রানীর মুখ কী রকম দেখিয়েছিলো সেই প্রতীক্ষার সময়ে যখন দুবার বলেছিলেন নয়নকে নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা? সেই আয়ত চোখ দুটির কোলে কি হাসি ছিলো? অথবা কি রানীর গালে কিছু টোল খেয়েছিলো? একটা আলোর মতোই রানীর মুখটা যেন স্মৃতিতে ধরা দিচ্ছে।
কেন এই প্রশ্রয় নয়নতারাকে তা ভাবতে গেলে কোনো হেতু কি খুঁজে পাওয়া যায়? রানী যা কিছু করেন তার অনেকটা রাজনৈতিক কৌশল–এরকম একটা প্রত্যয় আছে। কেটের চাইতেও নয়নতারা কি বেশি সুন্দরীনয়? হয়তো রূপ দুটি দুরকম, কিন্তু তুমি বলতে পারো না নয়নতারার চাইতে বেশি আকর্ষণীয়া কেউ হতে পারে।
