কথাটা ন্যায়নীতি নিয়ে। ন্যায়নীতির কথায় অবশ্যই কিছু কিন্তু আছে! এ বিষয়ে নায়েব মশাই ও হরদয়ালের আলাপই উদাহরণ হতে পারে। হরদয়াল বলেছিলো, দেখছি জমিটা মূলে ফরাসডাঙার, দখলদার কৃষক শামসুদ্দিন। নায়েব বলেছিলো, তাহলেও প্রমাণ হয় না জমিটাতে মনোহরের স্বত্ব অর্শাচ্ছে। হরদয়াল বলেছিলো, জমিটা হয়তো মনোহরের কাছে দায়বদ্ধ। নায়েব বলেছিলো, জমি দায়বদ্ধ হতে পারে, তাতে কিন্তু তার উপরে স্থায়ী রাস্তা করার অধিকার মনোহরের জন্মায় না। হরদয়াল হেসে বলেছিলো, তা বটে, কিন্তু আমরাই বা কোন পক্ষ? জমিটা ফরাসডাঙার যে বলবে তা কি প্রমাণসাপেক্ষ নয়? যদি অন্যরকম প্রমাণ হয় তা কি সত্য হয় না? সত্য কী? যা এভিডেন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী তোমার বক্তব্যকে প্রমাণ করে। এটা কি হরদয়াল আর নায়েবমশায়ের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য হরদয়ালের মন কি এখনো রাজনীতিতে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে? শেষ পর্যন্ত রাজনীতির দাবি তাকেও মানতে হয়, কিন্তু কিছুটা তা কি নিজের মনের সঙ্গে বিবাদ করে? অন্যদিকে নায়েবমশায় যেন ন্যায়-অন্যায় বিচারের অসারত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ।
নায়েবমশায়ের এই মনোভাবকে অথবা মাঝপথে মনোভাব বদলানো তাদের একটা বিশেষ আধুনিকতা বলেই মনে হয়েছিলো। মানুষ এখন থেকে ক্রোধ, হিংসা ঈর্ষা, থেকে সরে যাওয়ার এক নতুন পথ পাবে। এতদিন তো হাতাহাতি, দাঁতের বদলে দাঁত, নাকের বদলে নাক নেওয়া ছিলো। এখন যেন সেসব থেকে দূরে থাকা হবে কৌশল। যে মামলায় জিতলো সে তো শান্ত হলোই, যে হারলো সে-ও ভাবলো, কী আর করা যাবে বলো, এবার থামো। যদি বলা হয় এ ধরনের শান্তিতে প্রকৃত কিছু লাভ নেই, তাহলে অপরপক্ষ বলবে যা নিয়ে বিবাদ তারইবা প্রকৃত মূল্য কী? কিছুদিন পরে বিবাদের উভয়ংক্ষিই বুঝতে পারে যা নিয়ে এত উত্তেজনা, কলহ, তা সবই নিতান্ত মূল্যহীন। এ যেন এক খেলার আইন মেনে চলা। জুয়ার খেলাতেও আইন আছে, যদিও সে আইনে টেবলের মালিকের লাভ হয় শেষ পর্যন্ত।
যাকে অন্যায় বলে মনে হয় তার প্রতিকারের জন্য মানুষের যুদ্ধ করার দিকে ঝোঁক। আছে। এবং এই আধুনিক প্রথায় সে-ঝোঁকটারও তৃপ্তি হয়ে থাকে। সূচনায় চিনতে কিছু অসুবিধা হচ্ছে বটে। দলিল দস্তাবেজ, কমিশন আর মিশন, গাউন-পরা শিক্ষিত উকিল ব্যারিস্টারের ছুটোছুটি আদালতে, গাউন ছাড়াই তাদের ছুটোছুটি সেনেটে আর মাঠে-পরবর্তী একশো বছরের সেসব বাকযুদ্ধের সূচনা পাবে এতেই! আর এও যে এক রকমের যুদ্ধ তা নাকি রানীমাই উল্লেখ করেছিলেন। অন্তত তার কথাতেই যুদ্ধ শব্দটার উল্লেখ ছিলো।
.
০২.
অন্যান্য দিনের মতো কাছারিতে কাজ হচ্ছে। নিঃশব্দেই বলা যায়। অর্থাৎ নায়েবমশায়ের খাসকামরার দিকে যত এগোবে ততই নিঃশব্দ। নতুবা এ-ঘরে ও-ঘরে চাপা গলার আলাপ, এমনকী তামাক টানার মৃদু শব্দ নিশ্চয় আছে।
কিছুক্ষণ আগে জমানবিশ মহেন্দ্র বেরিয়েছে নায়েবের কামরা থেকে, এখন আবার। সুমারনবিশ সুরেন্দ্রর ডাক পড়লো। জমানবিশকে চিন্তাকুল মুখে বেরোতে দেখা গিয়েছে।
তাকে সে অবস্থায় যে দেখেছে সে সদর-আমিন সোনাউল্লা। সোনাউল্লা চট করে সামনে যে-দরজাটা পেলো তা দিয়েই ঢুকে পড়লো। সে ঘরটা ল-মোেহরার গৌরীর।
সোনাউল্লা বললো–গতিক ভালো দেখি না।
–শুনছি তাই। বললো– গৌরী। –আসলটা জানেন কিছু?
-আরে আমি ভাই লেঠেলদের সদ্দার। কাগজপত্রের খোঁজ কী রাখি?
যেখানেই জমি নিয়ে বিবাদ সেখানেই আমিনের ডাক পড়ে। জমি মাপজোখের জন্য সঙ্গে লোকলস্কর থাকে এবং যেহেতু বিবাদ সঙ্গে দুচারজন পাইকবরকন্দাজও। এ থেকেই সোনাউল্লা কাজী, যে প্রায় মুনসেফ-ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ করে, নিজেই লেঠেলদের সদ্দার–কথাটা নিজের সম্বন্ধে তৈরি করেছে।
সে হেসে বললো–আমিও ভাবছি আলি বলে বেরিয়ে পড়ি। বিলমহলের মাপজোখ শেষ করে ফেলি। ওদিকে এ ওর জমিতে কামড় দিচ্ছে।
–আপনার কি মনে হয় গতিকটা মন্দ কাজ ফেলে রাখার জন্যই?
-শুনছি গত বছরের তুলনায় এই আট মাসের গড় আদায় বেশকিছু কম। পরগনায় পরগনায় নায়েব আহিলকারদের কাছে কড়া চিঠি যাচ্ছে নাকি।
–আপনার ভদ্রপুরের ঝামেলাটা মিটলো? গৌরী জিজ্ঞাসা করলো।
-ওটা আর আমার ঝামেলা নয়। বাঙালি নীলকরের নাম শুনেছো? দত্তবাবুরা নীলকর হতে চাইছে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুররা যেমন হয়েছিলো।
লাভ?
সাতপুরুষে ব্যবসাদার ওরা। তেজারতী বন্ধকী তো ছিলোই, এখন দাদন ব্যবসা। শুনছি আগে তাঁতীদের মহাজন ছিলো। এখন তাঁতী কই? নীলছাড়া আর ব্যবসা কোথায়? একটা তুলোর ক্ষেত দ্যাখো?
কারখানাও করবে?
–আপাতত মরেলগঞ্জের সঙ্গে বন্দোবস্ত। কিন্তু তোমার ঘরে মুসলমানী হুঁকো যদি না রাখো, আমার আসাই বন্ধ করতে হবে।
-রাখবো। গৌরী বললো–শামসুদ্দিনের দরুন সেই রাস্তা কাটার জমিটা আপনি মেপেছিলেন নাকি?
কবে! না এবার উঠি। চক্ ইসমাইলের দিকে যাবো। ভদ্রপুরের কানুনগোকেও চিঠি দিতে হবে। আরে গৌরী, এবার রানীমার জন্মোৎসবের খাওয়াদাওয়ার ইনচার্জো কে? গতবার মুসলমান জোতদাররা কলাপাতায় খেতে বিরক্ত হয়েছিলো।
উঠেছিলো বটে কথাটা। দেখতে সুন্দর হয়নি। মনে হয় সুরেনবাবুই ভার নেবেন। টেবল-চেয়ার কাঁচের বাসন হলেই হয়।
.
নায়েবের খাসকামরায় সুমারনবিশ সুরেন্দ্র দেখলো নায়েব তখনো জমার বই দেখছেন। পাশে গত সনের জমার চুম্বক-নথিনাকি রেভেনিউ অ্যাবস্ট্রাক্ট বলে। আঙুলের ডগায় ডগায় হিসাব হচ্ছে।
