চিঠিটা যত্ন করে খামে পুরলো সে আবার। একটা প্রশান্ত তৃপ্তি যেন অনুভব করলো হরদয়াল। তাই বলে সে তো ডাকঘরে খোঁজ নিতে যেতে পারে না। বই-এর প্যাকেট পৌঁছনোর একঘণ্টার মধ্যেই তার হাতে নিশ্চয় আসবে। বাঁ হাতটা উঁচু করে তার উপরে গাল রেখে সানন্দ দৃষ্টিতে বই-এর শেলফগুলোর দিকে চাইলো সে।
কিন্তু আজ সকালেও চিঠি লেখা হয়নি। অর্ধসমাপ্ত চিঠিটাকে সরিয়ে রাখতে হয়েছিলো, কারণ বাগচী নিজে এসেছিলো স্কুলের বিষয়ে আলাপ করতে। একটা সমস্যাই যেন। তাও এক চিঠি নিয়ে। চিঠিটা পেয়ে বাগচী বারদুয়েক পড়েছে, যাকে বলে তার উপরে ঘুমিয়েছে। কিন্তু এখনো কর্তব্যটাকে সে স্পষ্ট দেখতে পায়নি। এদিককার বিদ্যালয়-পরিদর্শক এতদিনে যেন এই বিদ্যালয়ের সংবাদ পেয়েছেন। এবং তিনি বিদ্যালয়টিকে পরিদর্শন করতে বাসনা করেছেন। এটা তাঁর সরকারী কর্তব্যও বটে। তিনি বস্তুত লিখেছেন :ইহা আমার কর্তব্য বলিয়া বোধ করি যে যত শীঘ্র সম্ভব আপনার বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়।
বাগচী বলেছিলো উনি এসে পড়তে পারেন, তার আগেই জবাব যাওয়া দরকার। নতুবা লাঞ্চের পরে আসতাম।
হরদয়াল চিঠিখানা আদ্যোপান্ত পড়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো, বাগচীর মত কী? এতে কি স্কুলের লাভক্ষতি কিছু আছে?
বাগচী বলেছিলো, কারো কারো মতে, যেমন নিয়োগীমশায়,এ সুযোগ ছাড়া উচিত হবে । স্কুল সরকারের নজরে পড়লে তার মর্যাদা বাড়ে।
-তা কি শিক্ষক অথবা পাঠক্রম নির্বাচন, অথবা সরকারী গেজেটে আসা এবং আর্থিক আনুকুল্য?
–নিয়োগী বলেন সবই হতে পারে। সব স্কুলই তাই চায়।
-এখনই শেষ কথা বলা কঠিন। যে সুবিধা দেয় তার পক্ষে নিজের মত চাপাতে চাওয়াও অসম্ভব নয়।
নিয়োগী বলেন, শিক্ষার ব্যাপারে যাঁরা কর্ণধার শিক্ষা সম্বন্ধে তাদের মতামতের নিশ্চয়ই মূল্য আছে। এবং এই শিক্ষাধারাই ইংরেজ জাতকে মহৎকরেছে, আমাদের দেশের কুসংস্কার দূর হচ্ছে।
-ঠিক তাই। হেসে বলেছিলো হরদয়াল। –এর একটাও আপনার নিজের মত নয়। আপনি হয়তো বৃহত্তর মঙ্গল চিন্তা করে নিজের মতকে কুণ্ঠিত করে রাখছেন। কিন্তু আমি জানি ঠিক এখন আপনি যা ভাবছেন তা ভাষাশিক্ষাকে অন্তত তার ব্যাকরণ ও বানানকে কম মূল্য দিতে যা কলকাতায় গ্রাহ্য হবে না। নিষেধ করে দিন।
বাগচী চলে গেলেও চিঠিটায় আর হাত দেওয়া হয়নি। এখন আবার সন্ধ্যা পার হচ্ছে। ছুতোর মিস্ত্রি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সে লাইব্রেরির এই আরামকেদারায় এসে বসেছে। এখন কি সে ডায়েরি লিখবে? দু-তিন দিন তা হয় না। কিংবা বন্ধুর চিঠি দুটির উত্তর?
হরদয়াল উঠে পাশের ঘরে গেলো। প্রভিশনের আলমারি খুলে মদের বোতল এবং গ্লাস নিয়ে লাইব্রেরিতে ফিরলো। গ্লাসটা লম্বা, সরু, গায়ে কাঁচের মধ্যে সাদা রঙে একটা লতার মটিফ। হরদয়াল নিজের অজ্ঞাতেই যেন হাসলো ডেস্কের উপরে বোতল আর গ্লাস পাশাপাশি রেখে।
ডায়েরির মরোক্কো বাঁধাই মলাটের উপরে লিখবার প্যাড। প্যাড আর ডায়েরির মাঝখানে সেই অর্ধসমাপ্ত চিঠিটাকে পাওয়া গেলো যা সে বন্ধুকে লিখতে শুরু করেছিলো কাল।
হরদয়াল বোতল থেকে তার লম্বা গ্লাসটাকে ভরে নিলো। এবার বন্ধুর আগের চিঠিটাকেও বার করলো। হ্যাঁ, সেই চিঠিতেই বন্ধু জানিয়েছিলো সে গত একমাস মদ্য স্পর্শ করেনি। আশা প্রকাশ করেছিলো হরদয়ালও ইচ্ছামাত্র সেরকম পারবে। একেবারে নতুন নয় সংবাদ। হরদয়াল তার কলকাতার অভিজ্ঞতা থেকে জানে সেখানে মদ্যপান নিবারণ নিয়ে কথা উঠেছে বটে।
হরদয়াল চিঠিটা হাতে ধরেই গ্লাসটাকে ঠোঁটে তুলো। দ্যাখো কাণ্ড, এই বলবে যেন সে, ইচ্ছামাত্রই কি সব কাজ হয়? কিন্তু বন্ধুর চিঠির এটা জবাবনয়, বরং ডায়েরিতে লিখবার মতো কিছু।
ডায়েরি কেন লেখা হয়? এর সহজ উত্তর আছে। ডায়েরিতে দিনে কতবার মিথ্যাভাষণ হলো, কতবার লোভ থেকে ত্রাণ পাওয়া গেলো, কতবার বা ঈশ্বরের গুণগান করা হয়েছে তা লেখা থাকে। হয়তোবা একসময়ে চারিত্রিক উন্মেষের সহায়ক হিসাবেই হরদয়াল ডায়েরি রাখতে শুরু করে থাকবে। এখন? ইচ্ছামাত্রই মদ ছাড়বে এমন চারিত্রিক দৃঢ়তা কি তার আছে আর। তেমন ইচ্ছাই কি হবে?
একসময়ে কলকাতার সত্যনির্ভর ইংরেজিনবিশ ছাত্রদের মতো সে হয়তো সব অবস্থাতেই সত্য বলতো। সেই যে গল্প আছে যে তেমন একজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো :তুমি মদ খাও–সে বলেছিলো খাই; জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো :অসৎ স্ত্রীলোকের বাড়িতে যাওয়া-আসা করো–সে বলেছিলো, করি।
রানীমার জন্মতিথির উৎসবটাই ধরো। হঠাৎ একটা চালু হয়েছিলো কিছু একটাকে। ঢাকতে। এখন সময়ের হিসাবে দূরে এসে স্পষ্ট করেই বলা যায় সত্যকে গোপন রাখতে। বিপদমুক্তির জন্য রানী কালীপূজা করবেন। বাৎসরিক কালীপূজার কয়েকদিন পরেই। কালীপূজা। সেটা অনভিপ্রেতভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। তাই বলা হলো রানীমার জন্মতিথি। কেউ কি জানে সেটা সত্যিই কারো জন্মতিথি কিনা? সে কি বলতে পারে এটা তা নয়? এ বছরের উৎসবটা এসে পড়েছে। আমলারা সেই সুযোগে নাটক করতে চাইছে।
অন্যমনস্কের মতো গ্লাসটাকে নামিয়ে সে বন্ধুর আগের চিঠিটাকে চোখের সামনে ধরলো। আলোটাকে একটু উসকে দিলো সে।
বন্ধু আগের চিঠিতে তাকে বলেছিলো কলকাতায় যেতে। জানতে চেয়েছিলো হরদয়ালের স্কুল কেমন চলছে। নবনিযুক্ত নিয়োগী মাস্টারমশাই যে লোহার মতো খাঁটি মানুষ এ বিষয়ে আবার আশ্বাস দিয়ে জানতে চেয়েছিলো কেমন সে পড়াচ্ছে। সংবাদ দিয়েছিলো প্রায় দুমাস হয় সে মেট্রোপলিটনে অধ্যাপকের পদপ্রাপ্ত হয়েছে। ঘোষণা করেছিলো সে গত একমাস মদ্য স্পর্শ করেনি এবং আশা প্রকাশ করেছিলো হরদয়াল ইচ্ছামাত্র সেরকম পারবে। চিঠির পরের অনুচ্ছেদে সে বলেছেগ্রামের রাজসরকারের চাকরি যতই ভালো হোক হরদয়ালের মতো মানুষের পক্ষে কলকাতার বাইরে থাকা আর উচিত হয় না। কেননা দ্রুতউন্নতিশীল জীবনের পরাকাষ্ঠা রাজধানীতে, তাই রাজধানীর বাইরে জীবন কি অপচয়মাত্র নয়? বর্তমানে হাইকোর্টের বিষয়ে যেরূপ শোনা যায় তাতে ব্যবহারজীবীদের আশাতিরিক্ত উন্নতির সুযোগ আসছে। হরদয়াল কলকাতায় গেলে সে যে অনায়াসে দুচার হাজার তঙ্কা উপার্জন করবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। মনে হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত, রাজা রামমোহনের পুত্র রামপ্রসাদ এবং আরো অনেকে কোনোনা-কোনোভাবে হাইকোর্ট স্থাপিত হওয়ামাত্র তাতে যুক্ত হবেন। নতুন জীবনে রওয়ানা হওয়ার মতো সঞ্চয় কি এখনো হরদয়ালের হয় নাই?
