কিন্তু দ্যাখো, এই লোকটিকে এনেছে নরেশ, অনুরূপভাবে নরেশকে এনেছিলো সে নিজে। গত সনের সেই মেরামতির জন্য। নরেশের কাজের সুখ্যাতি হয়েছে।
সকালে গৌরী ও নায়েবমশায় চলে গেলে হরদয়াল ব্রেকফাস্টে বসেছিলো। আর তখন সে নরেশ সম্বন্ধে চিন্তা করেছিলো।
হরদয়াল তাদের মতো নয় যারা ব্রেকফাস্ট না করে পৃথিবীর মুখ দেখে না। এ কি তার আহার-বিলাসের ফল? অথবা কোনো ব্যাপারেই তাড়াতাড়ি করে কী হয়–এরকম এক মনোভাব থেকে ব্রেকফাস্টের ব্যাপারে ঢিলেমি? ওদিকে কিন্তু টেবল দেখলে মনে হবে ভৃত্য বাবুর্চির সংসারের পরে তার ব্রেকফাস্টের ব্যাপারটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
একটা জানলার পাল্লা খোলা। খানিকটা রোদ টেবিলে এবং সেখান থেকে রূপোলি প্লেট চামচের গায়ে মাখামাখি করছে। পাশের জানলার কাঁচ থেকে রঙীন আলো মেঝের উপরে একটা রঙীন আয়তক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছে। রোদে পিঠ রেখে হরদয়াল ব্রেকফাস্টে বসেছিলো।
সে বাদামযুক্ত হালুয়া দিয়ে ব্রেকফাস্ট শুরু করে ভাবতে শুরু করলো। কী যেন? ও, সে নরেশের কথা ভাবছিলো। ভদ্রলোকের নাম নরেশ পান। তিন মাসের কড়ারে আনা হয়েছিল। মিলিটারি কনট্রাক্টরের এক ফার্মে এবংকখনো কখনো ফোর্ট উইলিয়ামে সরকারি এঞ্জিনীয়ারের অধীনে কাজ করতো। এ কাজটা তোনরেশের কুলকার্য নয়। চাষবাস করতো। তারপর একসময়ে সে কী করে বা এইসব কাজে যুক্ত হয় এখন বিষয়ে কিছু লেখাপড়া না করেও সে প্রায় ওস্তাদ শ্রেণীর একজন হয়ে উঠেছে। লেখাপড়া নয়ই-বা বলছো কী করে, কাগজকলমে নকশা, এস্টিমেট প্রভৃতি করতে শিখেছে। রাস্তাঘাটের কাজে যদি সুরেন, বাড়িঘরের কাজে তবে নরেশ। কোথাকার বীজ কোথায় উড়ে এসে পড়ে গাছ হয় দ্যাখো। এটাও কিন্তু কৌতুকের–তুমি বলতে পারো নরেশ আছে বলেই মেরামতের কাজের বাইরে নতুন কাজ হচ্ছে, কিংবা নতুন কাজ করানো হবে বলেই তাকে রাখা হচ্ছে।
আগে প্রতি বছরেই রাজবাড়ির রং মেরামত ইত্যাদির কাজ হতো। গ্রামের গহরজান মিস্ত্রির পরিবারের পুরুষরা কাজ করতো। কখনো মুর্শিদাবাদ থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন কাজের খোঁজে এলে যেন তাদের সুবিধার জন্যই কাজ করা হতো। আজ থেকে তো মনে হচ্ছে নরেশ ও সুরেন পাকাপাকি থেকে যাচ্ছে। হয়তো কথাটা পূর্তবিভাগনা হয়ে বাস্তুবিভাগ হলে মানাতো। একটা বিভাগ যখন হয় তখন ধরে নিতে হবে অন্তত বেশ কিছুদিনের জন্য তা হলো।
এবং তার ভারটা আজ থেকে এসে গেলো যেন তার নিজের দপ্তরে। আজ থেকেই। ওটাকে হুকুমই বলতে হয়। যদি তার চারিদিকে খুবনরম কিছু থেকে থাকে তবে তানায়েবের কথা বলার কায়দা। হরদয়ালের ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলা করে গেলো। অথচ তুমি কায়দাটাকে ধরতে পারো না। কিন্তু এতদিন?
তখন ব্রেকফাস্টের টেবলের পাশে দাঁড়িয়ে তার ভৃত্য, দরজার কাছে বাবুর্চি।
হরদয়ালের হাতে চামচটা দুললো। যেন সে মিষ্টিটা পছন্দ করছে। কিন্তু চামচটা রেখে সে বরং কফির পাত্রটা টেনে নিলো।
এটা কি অস্বীকার করা যায়, ভাবতে গিয়েও গলা সাফ করতে হলো, নায়েবই কিছুদিন আগে তার অধস্তন কর্মচারী ছিলো।
তাই তো, আজ যেন, আজই প্রথম যেন, প্রমাণ হয়ে গেলো নরেশের এই ব্যাপারটায়–যে নায়েব একসময়ে শুধুমাত্র নায়েবই ছিলেন, এবং তখন হরদয়াল ছিলো দেওয়ান।
ব্রেকফাস্টের কফিটা শেষ করে যে-জানলায় রৌদ্র আসছিলো তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। যেন দিনটার কী রং তা দেখলে বিস্ময়টা কাটবে। নিশ্চিতই আকাশে মেঘ নেই কিংবা ঝড়ো হাওয়াও বইছেনা যে দিনটাকে গতকাল যা ছিলো তা থেকে ভিন্ন দেখাবে।
সে এ সময়ে, ব্রেকফাস্টের পরেই কাজ করে। জানলাটা থেকে সরে এসেছিলো সে। লাইব্রেরিতেই তো। সে লাইব্রেরিতে ঢুকেছিলো। ফাঁইলটা দিয়ে গিয়েছে গৌরী যাতে নায়েবের মন্তব্য আছে মামলা সম্বন্ধে। পাশের দরজা দিয়ে ভৃত্য গড়গড়া নিয়ে ঢুকে চেয়ারের পাশে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখেও গেলো। তখন বেলা দশটা হবে।
সম্মুখে ডেস্কের দিকে চেয়েছিলো সে। সমতল অংশটার উপরে অনেককিছুই তো। একটা সুদৃশ্য ট্রের উপরে সকালের আসা ডাক তখন। চরণদাস নিজেই দিয়ে গিয়েছে। আর তখনই সে ম্যানিলা রং-এর খামটাকে এবং তার উপরের ঠিকানার হরফগুলোকে লক্ষ্য করেছিলো।
এখন এই সন্ধ্যায় সে তো আবার লাইব্রেরির সেই ডেস্কের সামনে। উজ্জ্বল টেবল ল্যাম্পের আলোয় একটু দ্বিধা করে সেই চিঠিখানাই হাতে নিলো। চিঠিখানা তার বন্ধুর। খুলবার আগেই সে ভাবলো কোনো কোনো কাজে কেমন করে যেন বাধা পড়ে যায়। বন্ধুর আগের চিঠিটার জবাব এখনো দেওয়া হয়নি। কাল রাত্রিতে একবার সে ভাবতে বসেছিলো এ বিষয়ে। কিন্তু রানী ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
চিঠিখানা খুললো সে। পুরো নোটশীট, কিন্তু বন্ধুর চিঠি সাধারণত যত বড় হয় তেমন নয়। হরদয়াল পড়লো। বন্ধু লিখেছে : তার আগের চিঠির (যার জবাব সে পায়নি) অনুসৃতিতে সে সানন্দে জানাচ্ছে পৃথক প্যাকেটে শেকসপীয়র পাঠানো যায়। এক সিভিলিআন প্রমোশন-প্রাপ্ত ও অন্যত্র স্থাপিত হওয়ায় ফার্নিচার ইত্যাদিসহ হস্তান্তর করে। সুতরাং মরোক্কো বাঁধাই হলেও রিবে মালিকের নাম ঘষে তোলা। পৌঁছনো মাত্র প্রাপ্তিসংবাদ দেবে। পুনশ্চ বলে সে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়-মহলে খোঁজখবরে জানতে পারা গেলো ডান্নামে (লক্ষ্য করবে ওটা ডা) এক কবি ছিলো বটে। কিন্তু ইংরেজি ভার্সে লিখিত হলেই কবিতা হয় এমন নয়। মিলটনের পরে তো বার্নস, ব্লেক, মধ্যে আর কবি কে? লন্ডনের পাবলিশার্স ও স্টেশনার্সদের ঠিকানা পাঠালাম। ১৮৫৮ ও ১৮৫৯ প্রকাশিত দশখানি বই তোমার টাইমসের সাপ্লায়ার রোজার গুনের কাছে আছে।
