কিন্তু পরের দিনই হরদয়াল চিন্তা করার অবসর পেয়েছিলো।
এখন সন্ধ্যা হচ্ছে। হরদয়ালের কুঠির বারান্দায় কাঠের মিস্ত্রি তার সরু র্যাদাটা তুলে মাথায় ঘষে নিলো একবার। তাতে নাকি র্যাদা আরো তেলালো হয়। দুবার ঘষে ফুঁ দিয়ে র্যাদায় ওঠা গুঁড়ো কাঠ ঝেড়ে ফেলো মিস্ত্রি। আর তখন সুগন্ধটা পাওয়া গেলো কাঠের। আসবাবটা এমন কিছু মূল্যবান নয়, একটা বুকশেলফ। কিন্তু যত্ন দেখে মনে হচ্ছে তা হাতির দাঁতের।
সকালেও হরদয়ালের কুঠির বারান্দায় ছুতোর মিস্ত্রি কাজ করছিলো। রোদটা তখন সরে গিয়েছে, ওমটা আছে। চেয়ারে হরদয়াল। তার বাঁদিকে আলবোলা। আলবোলার সম্মুখে তেপায়ার উপরে কাগজপত্র যা লমোহরার গৌরী রেখে গিয়েছে।
সকালে গৌরী এসেছিলো মামলার কাগজপত্র দিতেই। মুখে বলেছিলো মামলাটা মরেলগঞ্জের মনোহর সিং-এর বিরুদ্ধে। ট্রেসপাস। মনোহর তার এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে রাস্তা তৈরি করছিলো। এটাকে বলা যায় সাধারণ দপ্তর থেকে আইন দপ্তরে ফাঁইল আসা। হরদয়াল বলেছিলো, মামলাটার কী দরকার হলো? আচ্ছা, রেখে যাও।
কিন্তু গৌরীর আসল বক্তব্য ছিলো যেন এবারে রানীমার জন্মতিথি উৎসবে কাছারির কর্মচারীরা এবং তাদের বন্ধুবান্ধব মিলে একটা নাটক করতে চায়। নায়েবমশায়কে অনুরোধ করেছে। এটা তো যাত্রা নয়,নাটক–আধুনিক ব্যাপার। কাজেই হরদয়াল নিজে একটু সমর্থন না করলে নায়েবমশায় রাজী হবেন না। হরদয়াল হাসিমুখে তাকে আশ্বাস দিয়েছিলো।
এখন হরদয়ালের গায়ে মটকার গলাবন্ধ কোট। চুনুট করা ধুতির কালো পাড়, তালতলার চটির উপরে। সে বৈকালিক ভ্রমণ শেষ করে ফিরেছে। তার চাকর জুতো নিয়ে চটি দিয়ে গিয়েছে। আলবোলা নিয়ে ফিরবে।
রানীমার জন্মতিথি? গৌরী চলে গেলে হরদয়াল চিন্তা করেছিলো। এবার কি একটু আগে? তা অসম্ভব নয়, তিথি অনুসারে চলে; কখনো এগোয় কখনো পিছিয়ে যায়।
কিন্তু গৌরীর পরেই সকালেই হরদয়াল সদর-নায়েবকে দেখেছিলো। কাছারির থেকে যে রাস্তাটা তার কুঠি দিকে তার উপরে সদরনায়েবকে দেখে সে ভৃত্যকে ডেকে চেয়ার দিতে বলেছিলো। এমন নয় যে নায়েব মাঝে-মাঝেই হরদয়ালের কুঠিতে আসেন, সুতরাং নায়েবের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে হরদয়ালের কৌতূহল হয়েছিলো।
হরদয়ালকে অবাক করে নায়েবমশায়ও নাটকের কথাই তুলেছিলেন। খুব মুশকিল তার। নাটক কারে কয়? ছোকরারা খেপে উঠেছে। হরদয়াল হেসে ফেলেছিলো। আমাদের দেশে যাত্রা, অন্য দেশে নাটক হয়। এতে আর মুশকিল কী এই বলেছিলো সে হেসে। কলকাতায় হচ্ছে।
–ও বাবা, না করে থামছে না দেখছি। কিন্তু সে তো শুনি অনেক খরচ। মঞ্চ না কী একটা করবে। নরেশও এর মধ্যে আছে। নায়েব বলেছিলো।
হরদয়াল বলেছিলো–তা, দিন না মঞ্জুরি।
নায়েব উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ বললেন–ভালো কথা, নরেশের কথায় মনে হলো, ও তো দেখছি ক্রমে এ কাজে ও কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কাজ শেষ হবে কবে? ওদিকে সুরেনও। আমার তো মনে হয় ওদের বাবদে একটা পৃথক হিসাব বই খোলা দরকার। আজ গেট করে তো কাল সড়ক, সড়ক ছাড়ে তো রাজবাড়ি। তা করতে আবার এক খাবোল অন্য সড়ক।
–তা মন্দ কী? নতুন কাজ পুরনো কাজ মিলে তো পরিমাণ কম নয়।
নায়েব হাসলো-মাঝে-মাঝে মনে করি একটা আলাদা বিভাগ তৈরি করে দিই। নরেশ কাজ করবে। হিসাবের জন্যও না-হয় একজনকে দেওয়া গেল। কিন্তু তারা যে ঠিকঠাক কাজ করছে তা অন্তত মাসে একবার দেখা দরকার। মাপজোখের উপরে মাপজোখ আর কি। কিন্তু দেখে কে? আমি কি সিএফটি বুঝি? যতদিন অন্য ব্যবস্থা না-হচ্ছে আপনার পক্ষে কি একটু দেখা সম্ভব হয়?
–আমাকে ভার নিতে বলছেন?
–যদি সম্ভব হয়।
হরদয়ালও উঠে দাঁড়িয়েছিলো।
নায়েব বললেন–আপনি রাজী হলে রানীমার অনুমতি চাইবো।
হরদয়াল কী একটু চিন্তা করলো, বললো–আপনি বললেই হবে। রানীমা পর্যন্ত যেতে হবে কেন?
তারপরে নায়েব মামলার কথায় গিয়েছিলো। কাগজপত্র দেখেছেন নিশ্চয়। ওপক্ষ একেবারে চুপচাপ। যেন রাস্তা কাটার ব্যাপারটা সম্বন্ধে ওদের ভাবনা চিন্তা এখনো শেষ হয়নি।
হরদয়াল তখন বলেছিলো, গৌরী বলছিলো ট্রেসপাসের প্রমাণ গোছাচ্ছে সে।
নায়েব বলেছিলো, প্রমাণ হোক তা নয়, কিংবা সেটা মরেলগঞ্জের লীজভুক্ত জমি এবং লীজে এখানে-ওখানে রাস্তাঘাট তুলবার শর্ত ছিলো নাকি ফৌজদারিতে যেতে চাইছেন না? তাহলে ওরাই এগোবে? হরদয়াল বলেছিলো, দেখি ফাঁইলটা।
তখন আর কথা হয়নি। নায়েবমশাই তিন বিষয়ে বলেছিলেন। কোন উদ্দেশ্যে দেওয়ান কুঠি পর্যন্ত আসা তা কি বোঝা গেলো? তা কি মাঝখানে যা বলেছিলেন? এখন সন্ধ্যা হচ্ছে। মিস্ত্রি কাঠগুলোকে গুছিয়ে তুলো। উঠে দাঁড়ালো, তাতেই যেন সন্ধ্যার সূচনা হলো। কাজটাকে গুটিয়ে তুলতে-তুলতেও মিস্ত্রি তা যেন চোখের সম্মুখে মেলে দেখলো। তা থেকে হরদয়ালের মনে হলো, সৌন্দর্যসৃষ্টি নাকি? পরখ করে দেখছে? লোকটি রোজই কাজ করে, কিন্তু তার মধ্যে টাকা উপার্জনের বাড়তি কি কিছু থাকে?
রাজকুমারের ঘরের আসবাবপত্র করার জন্য লোকটিকে গত বছর আনানো হয়েছে। নরেশ চিনতো। তারপর থেকে কাজের পর কাজ চলেছে। জাতে চীনা। ইতিমধ্যে একটি স্থায়ী ঘরও জুটেছে, রাজবাড়ির মালীদের ঘরের একটি। লোকটি অভ্যাসবশে হয়তো ডিজাইন তুলে যায়, কিন্তু অন্য অনেকে তার মধ্যে সৌন্দর্য আবিষ্কার করে। মৌমাছির মতো নাকি? কয়েকদিন আগে সে এক বই-এ পড়েছিলো–মৌমাছি গান করে না। কর্মব্যস্ততায় সে উড়ে বেড়ায়, তার পাখা কাপে, মানুষ তাতে গুঞ্জরণ আবিষ্কার করে।
