সে হনহন করে চলতে চলতে বললো–আলো দেখানোর কি বলা?
একটা গাছের কাছে এসে তার খেয়াল হলো। একজন বরকন্দাজকে সে বললো–ওঠো এই গাছে। গাছে গাছে আলো রাখা যাক।
যে কথা সেই কাজ। তা দেখে বলা বললো–মন্দ না। আধকোশ জুড়ে গাছে গাছে বেড় দিলে কোনো-না-কোনো আলো দেখবে হাতি আর সেদিকে কেটে উঠবে। তাছাড়া, ধরো, সেই বেড়ের কেউ-না-কেউ হাতির ঘণ্টা শুনবে।
ঘাসবনের মধ্যে ডুবে ডুবে মানুষ কয়েকটি রাস্তার অসমান লেশমাত্র ধরে ছুটে চললো। ঘাসেই হাত-পা কাটছে, কাঁটায় কী হচ্ছে বলা বেশি।
অবশেষে বলাও এক গাছে চড়লো আলো নিয়ে। রূপচাঁদ একা ছুটলো তখন। আর কিছুক্ষণ ছুটেই তার মনে পড়লো সে একা। এই মানুষ-ডোবা ঘাসবনে সে এমন একা যে মনে হয় দু-দশ ক্রোশে দ্বিতীয় প্রাণী নেই। আর এই তো পুরনো নদীর খাত, আর পার, আর চরা, আর এখানে কি সেই আদিকাল থেকে লাখ মানুষ দাহ হয়নি! নিজের ঘামেই পিরহান ভিজে, ঘাসবনের ওম সত্ত্বেও তার শীত লেগে গেলো। পায়ের তলায় একটা শক্ত ঢেলা লাগতেই মড়ার মাথার খুলি এই বিশ্বাস হলো। সে আতঙ্কে চিৎকার করে দৌড়লো।
.
রাজু বললো–আচ্ছা বাঁদর তো, গছে কেন?
গলাটা রাজকুমারেরই বটে। রূপচাঁদ দেখলো হাতিটা গাছের নিচেই দাঁড়িয়েছে। মাহুত বললো–ওখান থেকেই নামো, রূপুদা হাতির পিঠে।
রূপচাঁদ বললো–তা যদি ঝুপ করে পড়ি, তোমার হাতি ভয় পাবে না তো?
মাহুতের হাতে লণ্ঠন ধরিয়ে দিয়ে রূপচাঁদ ডাল দুলিয়ে ঝুল খেয়ে নামতে গিয়ে পলক ডালটা ভেঙে থেবড়ে পড়লো। মাহুত অন্য হাত বাড়িয়ে না-ধরলে নিচেই পড়তো।
রাজু বললো–একেবারে বাঁদর।
রূপচাঁদ হেসে বললো–হনুমান, হুজুর। হাতি কিন্তুক ছুটে চলুক। আলোর বেড় বরাবর।
হরদয়াল ভাবলো : রানী বলেছিলেন, নয়ন সঙ্গে থাকাতেই ভাবনা। তারপর বললেন কলকাতা যাওয়ার আর রাজকুমারের বিয়ের কথা। এগুলি কি রানীর মনে পরস্পর সংবদ্ধ? বলা যায় এখন তেমন সময় যখন রানী আশংকায় সম্ভব-অসম্ভব সব অমঙ্গলকে যাচাই করে দেখছেন।
ঠিক এমন সময়েই দেউড়িতে এবং তারপরে বারমহলে হরদয়ালের চিন্তাকে ছিন্ন করে কলরব শোনা গেল, এবং তার মধ্যে হাতির ঘণ্টাও।
আগে হরদয়াল এবং পিছনে রানী বারমহলের দরজার দিকে এগোলেন।
হরদয়াল দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো, রানী কিছু পিছনে দালানের একটা দেয়ালগিরির নিচে।
তখন হাতি থেকে নেমেছে রাজু। আলোতে বোঝা গেলো তার স্যুটের এখানে-ওখানে কাদা শুকিয়ে আছে।
নয়নতারার কথা জিজ্ঞাসা করা কি উচিত হবে? ভাবলো হরদয়াল।
ততক্ষণে রাজচন্দ্র এগিয়ে গিয়েছে। রূপচাঁদ তার শিকারের সরঞ্জাম নামাচ্ছে। রাজু রানীর কাছাকাছি যেতেই তিনি বললেন–এ কী রে? এত কাদা?
রাজু হেসে বললো–বাহ্, কুমীর তো কাদাতেই থাকে।
রানী যেন একটু চমকালেন। তার মুখ কিছু বিবর্ণ হলো। কিন্তু তখনই বললেন–আচ্ছা হরদয়াল।
বিচক্ষণ হরদয়াল তখন নিজের কুঠির দিকে চলতে শুরু করলো।
রাজুকে বললেন রানী–তুই জামাকাপড় ছাড়, রাজু, আমার ঘরে তোর খাবার দেব।
রানী আর দাঁড়ালেন না। রূপচাঁদকে নিয়ে রাজু নিজের মহলের দিকে এগিয়ে গেলো।
বাইরের জামাজোড়া ছেড়ে হরদয়াল বালাপোশ নিলো। ঘড়ি না-দেখলেও বলা যায় এখন অনেকটা রাত হয়েছে। কী করবে সে এখন? রানী ডেকে পাঠানোর আগে সে চিন্তা করছিলো। তার কলকাতার বন্ধু চিঠি লিখেছে। তা থেকেই চিন্তাটা। এখনো কি সে-চিন্তাই করবে। রাজকুমারের বিয়ের কথাই যেন। সে একবার চারদিকের বইয়ের আলমারিগুলোর দিকে চাইলো। রাত্রির একটা এই কৌতুক যে এই লাইব্রেরি-ঘরে সময় যেন মন্থরগতিতে চলে।
কখন কোন সূত্রে কোন চিন্তা আসবে বলা যায় না। হরদয়াল যেন একটা মৃদু সুবাস পেলো। তাকে নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করা যায় না, উৎসটাও বোঝা যায় না। নিশ্চয়ই স্মৃতি।
হরদয়ালের হঠাৎ মনে হলো এই লাইব্রেরির অধিকাংশ বই রানীর উপহার। অর্থাৎ বই সে-ই কিনেছে বটে, টাকাটা দিয়েছে স্টেট, রানীর ইচ্ছা। আজ সকালেই সে একবার নিজেকে বলছিলো, আর কত? এমন হচ্ছে দুএকখানা পড়া না-হয়েই শেফে উঠছে।
বালাপোশটাকে বাহুর উপরে গুটিয়ে আলমারি থেকে সে একখানা বই টেনে নিলো।
কিন্তু সবসময়ে ইচ্ছা পূর্ণ হয় না। বইটা খুলবার আগেই চাকর এলো, পিছন পিছন বাবুর্চি। বাবুর্চি-চাকরের সংসার তার। চাকর জিজ্ঞাসা করলো গড়গড়া দেবে কিনা। বাবুর্চি জানালো নদীর ধার থেকে ভালো রুই পাওয়া গিয়েছে। ভাজা হয়েছে।
সামনের দেয়ালঘড়িতে রাত এগারোটার কাছে এসেছে। হরদয়াল হেসে মাথা নাড়লো। বাবুর্চি টেবিল গোছতে গেলো। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এমন দেরির কথা ভাবাও যায় না।
হরদয়াল লক্ষ্য করলো, চাকর তার পাশেপাশে চলতে চলতে হাসছে। সে যেন কিছু বলতে চায়।
-কিছু বলবে?
বাবুর্চি বলছিলো, হুজুর।
কী?
নতুন মাস্টারমশাই নিউগিবাবু নাকি বাবুর্চিকে জিজ্ঞাসা করেছেন সে কী জাত?
–তাতে হাসির কী হলো?
–ওই মগটাকে নাকি ধর্ম সম্বন্ধে অনেক কিছু বলেছেন।
–আচ্ছা?
বাবুর্চি বলছিলো সে নাকি প্রকৃতপক্ষে মুসলমানই ছিলো, যদিও নমাজ পড়ে না। জিজ্ঞাসা করছিলো এতদিন পরে নমাজ পড়লে আপনি রাগ করেন কিনা।
হরদয়াল হো-হো করে হেসে উঠলো খাবার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে।
০৪. হরদয়াল
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
