সিঁড়িতে এমন সময়ে পায়ের শব্দ হলো।
রানী জিজ্ঞাসা করলেন–কে, মোক্ষ, হরদয়ালকে খবর দিয়েছো?
ছাদের যে-প্রান্তে সিঁড়ি সেখান থেকে হরদয়াল জানালো, সে এসেছে, নিচে অপেক্ষা করছিলো, তাই দেরি।
রানী বললেন–হরদয়াল, রাজকুমার বিলমহলে গিয়েছিলেন, হয়তো শিকারে। এখনো ফেরেননি।
হরদয়াল বললো–সে কী কথা, একা নাকি?
রানী জানালেন-সঙ্গে নয়নঠাকরুন থাকতে পারে। তাও ভাবনার বিষয়।
হরদয়ালের নীরবতা তার চিন্তারই চিহ্ন। সে বললো– অবশেষে-হাতিতে গিয়েছেন?
–পিয়েত্রোর হাতিতেই বলে অনুমান। কিন্তু পথে একটা বড়ো বন আছে শুনেছি।
–তা আছে। তবে পিয়েত্রোর হাতি, বনের পথ চিনবে ভরসা করি।
–কিন্তু অন্ধকার রাত হলো।
–তা হচ্ছে।
রানী একটু থেমে বললেন আবার–আজ গ্রামে কীবল এসেছিলো?
-হ্যাঁ, চার-পাঁচ ঘণ্টা ছিলো, বাগচীমাস্টারের বাড়িতে লাঞ্চ করেছে।
–একে কি দরকারী খবর মনে করো হরদয়াল?
–এখন পর্যন্ত তেমন মনে করার কোনো যুক্তি দেখছি না।
কথাটা রানীর মনঃপূত হলো। খানিকটা চুপ করে থেকে আবার বললেন–আচ্ছা, হরদয়াল, ডানকান একটা সুরকির রাস্তা করেছিলো, সে রাস্তার খানিকটা কেটে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থানে এক রায়তের জমির ধান বিলমহলের লোকেরা কেটে তা আবার সেই রায়তের ঘরেই এমন করে রেখেছে যে রায়তের নিজেরই আর জায়গা হয়নি। রাস্তাটা কি তোমাদের রাজকুমারের জমি উপর দিয়ে হচ্ছিলো?
-সন্দেহ আছে, কিন্তু নয় তাও বলতে পারি না এখন আর। পিয়েত্রোর দরুন ফরাসডাঙাও হতে পারে।
রানীমা বললেন–হঠাৎ রাস্তাটাকে কেটে উড়িয়ে দেওয়ার কী দরকার হলো?
হরদয়াল একটু ভেবে বললো–সাধারণত বড়ো রকমের নালিশ না-হলে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীকে রাজবাড়ি থেকে প্রশ্ন করা হয় না। এক্ষেত্রে কেউ বোধ হয় নালিশ করেনি। কিন্তু, রানী, রাজকুমারের বিলম্বের কথা বলতে বলতে এসব সংবাদ আলোচনা করার কোনো যুক্তি দেখি না।
নিজের অমূলক আশঙ্কায় রানী কি হাসলেন? অন্ধকারে তা বোঝা গেলো না।
-চলো, হরদয়াল, নিচে বসি।
রানী ছাদের ঝরোকা-ঝিলিমিলির কাছে থেকে সরে এলেন। তার শাড়ি দুধে-গরদের বলেই হয়তো একেবারে অদৃশ্য নয়, তার হাতের বালার পাথর কিছু কিছু নিজের পরিচয় সেই অস্পষ্টতায় দিলেও অযুক্তির হয় না, কিন্তু কোনো কোনো দেহবর্ণও কি অন্ধকারে ঈষৎ আভাসিত হয়?
একটা সুঘ্রাণ পেলো হরদয়াল, যা বিহ্বল কিন্তু মৃদু, এখন যেন বিষণ্ণ। তাড়াতাড়ি দু পা পিছিয়ে গেলো সে সিঁড়ির মুখ থেকে। রানী সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন। হরদয়াল ধীরে ধীরে অনুসরণ করলো।
নিচের বসবার ঘরে চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে রানী বললেন–নায়েব অবশ্যই দৃষ্টি রাখছেন, মামলা হয়ই যদি কোম্পানীর আদালতে। আচ্ছা, হরদয়াল, কলকেতায় এবারই কি হাইকোর্ট হবে? বসো।
প্রসঙ্গান্তরে কি যাচ্ছে কথা? কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই যেন রাজকুমারের সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা থেকে, ডানকানের সঙ্গে বিরোধ, বিরোধের হেতু হিসাবে নতুন ম্যাকাডাম রাস্তাটা কেটে দেওয়া, তার ফলে সম্ভাব্য মামলা, তা থেকে কলকাতার হাইকোর্ট।
হরদয়াল সঙ্গে সঙ্গে বললো–চেষ্টা তাই।
-তোমার কি মনে হয় তা সবদিক দিয়েই ভালো? মুন্সেফি আদালতও নাকি হবে?
–আমাদের গ্রামেও হতে পারে।
-সেটা কী, আচ্ছা হরদয়াল, তুমি ভেবে দ্যাখো, তোমাদের রাজকুমারের এক্তিয়ারের মধ্যে যদি আদালত বসে সেটা কি ভালো? ওরা কী প্রস্তাব করেছে? তোমাদের তো সদর আমিন আছেই।
হরদয়াল বলতে যাচ্ছিলো, আমাদের গ্রামের আয়তন লোকসংখ্যা ও গুরত্বের দিক দিয়ে তেমন হওয়াটাই উচিত হবে। কিন্তু চোখ তুলতেই রানীর আয়ত চোখ দুটিকে সে দেখতে পেলো। কিছু ভাবছেন তিনি।
রানী বললেন–শুনেছি বেহার রাজের নিজের আদালত আছে।
দেউড়ির পেটাঘড়িতে ঘণ্টা পড়লো দশটার। এমন সময়ে মোক্ষদা-ঝি এসে বললো–রূপচাঁদকাকা গেছে বরকন্দাজ নিয়ে।
রানী শুনে বললেন–আচ্ছা, মোক্ষদা।
মোক্ষদা দাঁড়ালো না।
রানী একটু পরেই আবার বললেন–তুমি কি আজকাল তেমন বই পড়ো না? বই কি তেমন আসছে না?
–আসছে।
বইটই আনতে কি তুমি এর মধ্যে কলকাতায় যাবে?
–তেমন স্থির করলে জানাবো আপনাকে।
হরদয়াল কান পেতে শুনলো কোথাও একটা ঘড়ি টিকটিক করছে। একে প্রতীক্ষা ছাড়া আর কী বলা যাবে? কিন্তু এখনই তো একটা নির্দিষ্ট মতও প্রকাশ হলো রানীর।
বললেন রানী আবার–আচ্ছা, রাজকুমারের বিয়ের কথা আর কী ভেবেছো?
রানীর কি মুখ নিচু করলেন? হরদয়ালকে কি বিচলিত দেখা গেলো?
হরদয়াল ভাবলো ইতিপূর্বে রানী দুবার দু-রকম সুরে বলেছেন নয়নতারা সঙ্গে থাকাতেই ভাবনা। যেন ভাবনাটা দুবারে দুজনের জন। কিন্তু এসবই কি প্রতীক্ষাকে অচঞ্চল রাখতে বলা?
সে বললো–আপনি হুকুম করলেই চেষ্টা করব। সেই পাত্রীই, যদি সেইতিপূর্বে পাত্রস্থ না-হয়ে থাকে।
রানী বললেন না।
তার ঠোঁট দুটিতে হাসি হাসি ভাবটাই রইলো, কিন্তু এই এক বর্ণের শব্দটা গোটা একটা বাক্যের মত ভারি শোনালো। কিন্তু প্রসঙ্গান্তরে গেলেন তিনি, বললেন, তোমার তত্ত্ববোধিনী আর সোমপ্রকাশ পত্রিকাগুলো পড়া হয়েছে। নিয়ে যেও। তোমার বইয়ের ঘরে কি একজন দপ্তরি দরকার?
হরদয়াল বললো–দরকার হলে জানাবো।
.
ততক্ষণে রূপচাঁদের দল ফরাসডাঙা পেরিয়ে বনে ঢুকেছে। হাঁপাচ্ছে তারা দৌড়ে এসে। ছুটতে ছুটতেই ভাবছিলো রূপচাঁদ–যে মাহুতই হোক সে চওড়া পথের দিকে আসবে, অন্তত আন্দাজে দিক ঠিক করে। ভয় আর-এক–বিলে গিয়ে না পড়ে। সুতরাং পুরনো নদীর পার ধরে, তারপর নদীর পুরনো শুকনো খাতের ডান পারে যেতে হবে। কিন্তু আলো এনে কি হয়েছে যদি-না হাতির সওয়ার তা দেখতে পায়? বনে ঢুকলে ঘাসবন মানুষের মাথা ছাড়িয়েই উঠবে। আলো দ্যাখে কে?
