মাহুতরা সাধারণত কথা বলে না। কিন্তু গজা সম্বন্ধে বোধহয় না বলে থাকা সহজ নয়। সে বললো–হুঁজুর গজাও নয়, মণ্ডলও নয়। ওর বাপঠাকুর্দা ছিলো মেজা। সেই মিলিয়ে নাম নিয়েছে গজা। তা কাঁধে মাপও গজ হবে।
রাজু দেখলো দেশলাই তামাক ভেজেনি।
অন্ধকার বেশ ঘন হচ্ছে ক্রমশ। ঘাসবনে হাতিও হাওদার তলায় অস্পষ্ট। পাইপেতামাক ভরে দেশলাই জ্বাললো রাজু। আর তখন তার নজরে পড়লো সেই আলোয় নয়নতারার কপালে মস্ত একটা গোল সিঁদুরের টিপ।
রাজু হেসে বললো–সে কী?
এতক্ষণে নয়নতারারও খেয়াল হলো।
রাজু বললো–গ্রামের মেয়েরা তাহলে দুয়ে-দুয়ে চার করে সাজিয়ে দিয়েছে?
নয়নতারা বললো–ছি ছি, উৎকণ্ঠায় কিছু কী মনে ছিলো! রুমালটা দিন।
নয়নতারা আবার বললো–কই দাও রুমালটা।
কপাল মুছতে মুছতে নয়নতারা বললো–আমি তখন জলের বুকে নৌকো খুঁজছি, ওরা এলো সাজাতে।
–তা বটে, রাজু হেসে বললো–কী করেই-বা বলো আমি কেউই নই।
ব্যাপারটা ঠিক তাই-ই নয় কি? কিন্তু এবার থামো৷ এমন ঘন অন্ধকারে এই বনে হাতি কি পথ খুঁজে পাবে? আমার ভয় করছে। এর চাইতে কাছারিতে রাত কাটালেও হত। সে ঠোঁট টিপে হাসলো।
.
০৮.
পেটাঘড়ির শব্দে রাত তখন আটটা, রূপচাঁদ হাই তুলো। রাজচন্দ্রর ঘরের সামনে আর একবার ঘুরপাক খেলো। রানীর ঘরের দরজায় উসখুশ করলো। তারপর সেই দরজার সামনেই খুকখুক করে কাশলো। শীতের রাত, রাত আটটা, মাঝরাত যেন।
ভিতরে তখন আরব্য রজনীর গল্প চলেছে। রানী হাসছিলেন মৃদুমৃদু আরব্য অভিজাত মহিলাদের আত্যন্তিক কাফ্রী ক্রীতদাস-প্রীতির কথায়। অবশ্য, তাঁর হাসি দেখে তার খোশমেজাজ কিংবা বিরক্তি বোঝা গেলে তো রাজবাড়িতে অনেক কিছুই সহজ হতো।
কাশির শব্দ শুনে রানী বললেন–রূপচাঁদ নাকি, এসো।
রূপচাঁদ এ ঘরে কদাচিৎ চোখ তোলে। মেঝের নকশায় চোখ রেখেই সে জানালো রাজকুমার বিলমহলে গিয়েছেন, তখনো ফেরেননি।
রানীর মুখে উদ্বেগ দেখা দেবে যেন। কিন্তু বললেন তিনি-তাই নাকি? হয়তো কোনো কারণে দেরি হচ্ছে।
রূপচাঁদ সরে যেতে ফিরলো। তখন রানী আবার বললেন–নয়নতারার খোঁজ নিয়ে তো একবার।
রূপচাঁদ চলে গেলো।
গল্প আবার শুরু হলো।
কিন্তু নতুন গল্পটার মাঝখানে রানী বললেন–সব দেশের গল্প এক নয়। তাই মনে হচ্ছে না? মন্দ নয়, মানদা, তুমি গল্প বলতে ভালোই শিখেছো। অন্য শ্রোতাদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন–তোমরা কি আরো শুনবে এখন? তাহলে বাটা থেকে পান নাও।
শ্রোতারা বাটা থেকে পান নিয়ে উঠে পড়লো।
যে গল্প বলছিলো তাকে রানী বললেন–আবার তোমাকে খবর দেবো, মানু।
সকলে চলে গেলে রানী উঠলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু ভাবলেন। দরজা থেকে একটু দূরে একজন ঝি দরজার দিকে চোখ রেখে বসে সুপারি কুচোচ্ছিলো। তার দিকে দু-পা এগিয়ে রানী বললেন–মোক্ষ, হরদয়ালকে এখনই একটু আসতে বলে এসো।
রানী ঘর থেকে বেরুলেন।
.
রূপচাঁদ নয়নতারার বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে বুঝতে পারলো সে বাড়িতে নেই। তাহলে জানলায় আলোর আভাস থাকতো। সে যখন ফিরে যাচ্ছে তখন নয়নতারার দাদা ন্যায়রত্নের চতুষ্পঠীর দাওয়ায় প্রথমে একটা প্রদীপ এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কাউকে যেন বসে থাকতে দেখতে পেলো।
কে?
–আমি, বলা।
লোকটি উঠে এলো। বলা এখন আর রূপচাঁদের অপরিচিত নয়।
সে বললো–দিদি কি রাজবাড়িতে?
-আমিও খুঁজছি। বিলমহলে রাজকুমার গিয়েছেন। হয়তো মাসিও সঙ্গে আছেন। এত রাত হয়। অবিশ্যি চোরচোট্টা আর কে এ গ্রামে? তবে কিনা ফরাসডাঙায় এসে উঠতে বড়ো জঙ্গল পার হতে হবে তো!
বলা বললো–এগিয়ে দেখতে হয়, না?
কী যে করি! দরকার হচ্ছে আলোর নিশানা।
রূপচাঁদ রাজবাড়ির দিকে হনহন করে ফিরতে শুরু করলো। পথের উপরে খানিকটা এসেবলার বাড়ি। রোসো, আসি, রূপদাদা বলে সে ভিতরে গিয়ে তার লাঠিটা নিয়ে এলো।
বলা বললো–কিন্তু সে তো ঘাসেরও জঙ্গল। হাতিডোবা ঘাস। মশাল নিতে চারপাশের ঘাসে আগুন ধরে যাবে না? আর সে জঙ্গলে কি মানুষ?
রূপচাঁদ বললো–তাও তো।
সে ভাবতে-ভাবতে চললো।
রাজবাড়ির প্রাচীরের ভিতর দিকে একপাশে বরকন্দাজদের ছোটো ছোটো ঘর।
যে তিনজন বরকন্দাজ মাঝরাতে জাগবার জন্য এখন ঘুমোতে যাচ্ছিলো রূপচাঁদ তাদের আটকালো। সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলো। রাজকুমারকে এগিয়ে আনতে যেতে হবে। তৈরি হও, আসছি।
মশালচিদের ঘরে গিয়ে পাঁচ-সাতটি হারিকেন জ্বালিয়ে আনলো রূপচাঁদ। বলাকে দেখিয়ে পরামর্শ নিলো-কেমন, বলা, এই ভালো নয়?
–আগুনের ভয় থাকলো না।
বরকন্দাজ বন্দুক নিয়ে তৈরি হয়ে আসতেই ছুটতে শুরু করলো রূপচাঁদের দল।
.
রানী খানিকটা ইতস্তত চলে বেড়ালেন তার মহলে। বসবার ঘরে না ফিরে একটু বাঁয়ে চলে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দোতলার ছাদে গিয়ে উঠলেন।
আকাশের অনেক তারা। রাজবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে আলোতে বাড়ির পরিসরটা ঠাহর হয়। প্রাচীর বলে যাকে মনে হচ্ছে তা ছাড়িয়েও গ্রামের মধ্যে এখানে-ওখানে দুচারটি আলোর বিন্দু। গাছপালা বাড়িঘরের আকৃতি ছায়া-ছায়া, কিংবা কালিতে আঁকা ছবিতে কালি পড়ে গেলে তার কোনো কোনো রেখা তা সত্ত্বেও যেমন ফুটে ওঠে। অবশ্যই হালকা গভীর কোনো সিহাই এমন রং নিতে পারে না-নীলের ধার ঘেঁষা কালো একখণ্ড স্ফটিক যেন। স্ফটিক–অর্থাৎ উজ্জ্বলতার একটা ভাব আছে। কিন্তু এখানে এরকম দেখালেও নিচে গাঢ় অন্ধকারই হবে গাছপালার কোলে বাড়িঘরের কোণে। শীতের রাত ইতিমধ্যে বেশ গভীর বাইরে। হঠাৎ তিনি দেখলেন কতগুলি আলোর বিন্দু যেন খুব তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে না, আর তাদের পরস্পরের দূরত্বও সমান থাকছে সারিতে। এ কি রাজকুমারের বিলম্বের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যাপার? বুকের মধ্যে কী যেন জোরে নড়ে উঠলো তার। একটু চঞ্চল হলেন রানী।
