রাজু বললো–একজন বরং বন্দুকটাকে একটু মুছে রাখো, জল লেগেছে।
রাজু ঘড়ি বার করলো। পাঁচটা পার হয়ে গিয়েছে। স্নান হেমন্তের সন্ধ্যা ছটাতেই গাঢ় হবে বটে। ঘড়িটার গায়ে জল। রুমাল দিয়ে রাজু মুছলো।
শালতির সেই লোকটি বললো–এখন হুজুর, শালতির দু মাথাতেই লগি মারা হবে, দুলবে শালতি, আপনার কি অসুবিধা হবে হুজুর?
রাজু বললো–একটার চামড়া কী আমাকে পৌঁছে দিতে পারো তোমরা?
রাজু হেসে বললো–অত তাড়াতাড়ি দরকার নেই।
শালতি চলতে শুরু করলো, শালতির আগেপিছে ডোঙা। একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে গড়িয়ে-গড়িয়ে ছুটছে সেগুলো। ডোঙায় দুজন, শালতিতে চারজন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে লগি মারছে। একটা শব্দমাত্র করে চারটে লগি পড়ছে জলে। বাচ্ খেলার মতো চলছে শালতি। কী যেন একটা বিড়বিড় করছে লগিওয়ালারা, মন্ত্র যেন। হঠাৎ একসঙ্গে গানটা একটা চিৎকারে ফুটে উঠলো, প্রথমে শালতিতে, পরমুহূর্তে ভোঙা দুটিতেই।
জল কালো, শালতির দুপাশের দাম অথবা চরের আগাছার ঝোপঝাড় বরং কালচে খয়েরি। আকাশ ধোঁয়াটে আর নিচু। শীত শীত লাগছে ভিজে স্যুটে রাজুর।
কাছারির ঘাটে পৌঁছতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, তা হলোও না। অন্ধকারে পথ হারানোর ভয় রইলো না, কারণ সন্ধ্যার আগেই কাছারির সামনে বড়ো বড়ো মশাল জ্বালানো হয়েছিলো, উপরন্তু কাছারির বজরাই আলো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলো রাজকুমারকে বিকেলের আলোয় ফিরতে না-দেখে।
পারে উঠলো রাজু। জনতার আগ্রহই সীমা ভেঙে এগিয়ে গেলো, আধো অন্ধকারে পায়ের উপরে পা ফেলার জায়গা রইলো না। তখন হঠাৎ একজন মানুষ কোথা থেকে দুই বাহু ছড়িয়ে দিলো। তার দুই ছড়ানো হাতের তেলোর মধ্যে ব্যবধানটা গজচারেক হবে। দুই তেলো দিয়ে সে ভিড়কে চাপ দিয়ে পিছু হঠতে লাগলো যেন দাম কেটে নৌকোর পথ করছে। যেন সে এক অপরিচিত ইঙ্গিতে রাজুকে এগিয়ে যেতেও বলছে। তার হাঁড়ির মতো মাথা, প্রচণ্ড চৌকো চোয়ালের উপরে থাবা-থাবা মেদমাংস বসানো মুখমণ্ডল, উপরের এবং নিচের ঠোঁট-ঢাকা সিন্ধুসিংহের মতো গোঁফ সত্ত্বেও মনে হলো লোকটি নাচছে যেন। অন্তত ভিড় ঠেলতে ঠেলতে তার কাঁধ দুটো এবং বাহুর উপরিভাগ ওঠানামা করছে, মাথাটা ডাইনে বাঁয়ে ফিরছে দুখানাও ঠিক সোজা পড়ছেনা। লোকটির গায়ে কাঁধকাটা পিরহান, কোমরে উড়নি জাতীয় কিছু জড়ানো, ধুতির ঝুল ছোটো তাই কেঁচা হাঁটুর কাছে দুলছে।
লোকটি পিছিয়ে পিছিয়ে যেখানে থামলো সেটা একটা গাছের তলা।
মশালে মশালে গলা সোনা রং। মাটিতে একটা সরু কাজ করা চাটাই বিছানো, তার উপরে একখানা চেয়ারের মতো উঁচু জলচৌকি।
কথা বলতে গেলে বোধহয় গোঁফ তুলে ধরতে হয়, তেমন করে গোঁফ পাকিয়ে লোকটি বললো– বসতে আজ্ঞা হোক, রাজকুমার।
ভিজে জামাকাপড়ে বসবে কিনা এই দ্বিধা করতে লাগলো রাজু। কিন্তু ততক্ষণে সেই বড়ো মাপের লোকটি আর-এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। সে বললো–জোকার দাও।
যারা ভিড় করছে তারা সবাই পুরুষ। অপটু, অনভ্যস্ত, পুরুষালি গলায় হুলুধ্বনির নকল করে দুএকজন ডুকরে উঠতেই হাসির গররা পড়ে গেলো।
লোকটি বললো–চপ! সে এদিক-ওদিক চাইলো, ভিড়ে কাউকে খুঁজে পেয়ে বললো–ও বামুন, ইদিকে, ইদিকে।
শুটকো কালো চেহারার, কিংবা শুটকো না, বলে, হাড়েমাসে দড়া পাকানো একজন প্রৌঢ় এগিয়ে এসে বললো–তোমার আর সুখের পিরবার নেই মণ্ডল। নাও, ধরো।
সে নিজের মুখের কাছে হাতের তেলো রেখে আ বাবা ইয়া বলে ফুকরে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সেই মেদের পাহাড়ও।
রাজুর বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠলো। সেই শুটকো বামুনের গোট শরীরটাই একটা শিঙা হলে তবেই তেমন ফুকরে ওঠা সম্ভব।
এই প্রাথমিক কর্তব্য সমাপ্ত হলে মেদমাংসের সেই বালিআড়ি (বালিআড়ি বলাই ভালো, পাহাড় স্থির কঠিন, এক্ষেত্রে পাহাড়ের গা যেন সবসময় সচল, খসে খসে পড়ছে উপরের স্তর হাসি হয়ে হয়ে), সে ট্যাক থেকে হলদে কিছু একটা বার করলো। ডান হাত স্পর্শ করে এগিয়ে ধরলো রাজুর সামনে; গোটা শরীর কোমরের কাছে ভঁজ করে ঝুঁকে দাঁড়ালো। বললো–নেকনজর দিতে আজ্ঞা হোক, রাজকুমার। দৃশ্যটা হেসে ওঠার মতো। কিন্তু ডান হাতের তর্জনী দিয়ে মোহরটাকে ছুঁতে হলো রাজুকে।
রাজুর শীতশীত লাগছিলোই, এখন উত্তেজনার বদলে অস্বস্তি। কারণ সেই কাদাজল হাঁটুর উপর পর্যন্ত পৌঁছেছে। হাতির খোঁজে সে এদিক-ওদিক চাইলো। নিজের অস্বস্তির কথা প্রকাশ করা যায় না। সে বললো–আমার সঙ্গে সদরে দেখা করো, মণ্ডল।
লোকটি এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বললো–হুঁজুরের এই কোলের ছেলের নাম গজা। ওরে হাতি আন। হাতি আন। ভিজে পোশাকে হুজুরের খারাপ লাগছে।
চার মণ ওজনের সেই গজা কোলের ছেলেই বটে।
কিন্তু ততক্ষণে তহশীলদার নিজে পৌঁছতে পেরেছে। ঘণ্টার শব্দও হলো। তাহলে হাতি এবার নড়ছে। বোধহয় হাতিও এতক্ষণ কোণঠাসা হয়েছিলো।
হাতি বসলো। তহশীলদারের লোকরা আলো এগিয়ে আনলো। শালতির লোকেরা শিকারের সরঞ্জাম তুলে দিলো। রাজু হাতির কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মাহুতের ইশারায় শুড় নামালো হাতি। রাজু শুড়ের উপরে দাঁড়াতেই শুড় উঁচু করলো। রাজু হাওদায় বসতেই হাতি চলতে শুরু করলো।
নয়নতারা বললো–একেবারে ভিজেছো তো অবেলায়?
রাজু হাসলো। বললো–পাইপ ধরাতে পারলে হতো।
সেই চামড়ার পাউচ বার করতে করতে নয়নতারাকে জিজ্ঞাসা করলো সে কোলের ছেলে গজা মণ্ডলকে দেখেছে কিনা?
