তখন রাজু আবার ঘড়ি বার করে দেখলো। চারটে বাজতে চলেছে। অনুমান হয় দিগন্তর বিস্তার ছোটো হয়ে আসছে। জলে লগির যে-ছায়া পড়েছে তা থেকে বোঝা যায় সূর্য ইতিমধ্যে পশ্চিমে নেমে পড়েছে। ঠিক এমন সময়ে লগিওয়ালাদের একজন চাপা গলায় ইশারা করলো। অন্য লগিওয়ালারা ইশারা বুঝে উল্টোদিকে লগি বসালো। সামান্য একটা আঁকি দিয়ে শালতি থামলো। হাতের ইশারায় ইশারায় জানাজানি হয়ে গেলো। শালতির দিকে মুখ করে একটা আর তার পেটের দিকে মুখ করে আর-একটা।
শালতির গলুই-এর কাছে খানিকটা পাটাতন, তার উপরেই বসেছিলো রাজু। তার উপরেই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসলো সে। দুটো তো আর সম্ভবনয়। যেটিকে আড়াআড়ি পাওয়া গেলো সেটির সামনের পা আর ঘাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় লক্ষ্য করে একবার, গুলি খেয়ে সেটা লাফিয়ে উঠেই চলতে শুরু করতে না করতে পা ও পেটের মাঝামাঝি নিশানা পেয়ে আর একবার গুলি করলো রাজু। অন্য কুমীরটি ভয় পেয়ে শালতির দিকেই ছুটতে শুরু করলো। তার সুচলো মাথা ওপাশের ডোঙার হাত আট-দশের মধ্যে এসে পড়লো। ভোঙার লোকেরা চিৎকার করে উঠলো। কুমীরের মুশকিল হলো, কিংবা তার দুর্ভাগ্য। যেখান থেকে সে জলে নামতে ছুটছে সেখানে জল এক কোমরের বেশি নয়। আর একটু ঘুরে হাত-দশেক দূর দিয়ে গেলে সে গভীর জলই পেতো। ডোঙার মানুষরা তখন মরিয়া, কুমীর উপরে এসে পড়লে জলে পড়বে মানুষ; আর জলে কেউ কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করে না। টেটা আর বল্লমের (সবগুলোতেই দড়িবাঁধা) খোঁচায় কুমীরকে রুখতে চেষ্টা করলো তারা। কুমীর ছুটে আসছিলো, তার ভারি শরীরের ওজনের সঙ্গে সেই গতি গুণ হচ্ছে। একটা ধারালো টেটা বিধতে তার শরীরের চাপেই সেটা তার মর্মে পৌঁছলো। মুহূর্তে দিক বদলালো সে, টেটার রশিতে টান পড়লো, আর সেই টানে ডোঙা কুমীরের ডাঙ্গায় উঠে পড়লো। রাখো রাখো, গেলো-গেলো করতে করতে অন্য ডোঙাটা লগি ঠেলে শালতিকে ধাক্কা দিয়ে প্রথম ভোঙাটাকে সাহায্য করতে এগোলো। সে ডোঙা থেকেও টেটা ছোঁড়া হলো দু-তিনটি। দৈবাৎ তার একটি মানুষকে না-বিধে কুমীরকেই বিধলো। দু-দড়ির টান পড়লো কুমীরের উপরে।
চরের উপরে আড়াআড়ি দুটো নালা। অল্প জল বলেই মনে হয়। সেই নালার দিকে ততক্ষণে চলছে গুলি-খাওয়া প্রথম কুমীরটা। শালতি থেকে বেশ খানিকটা দূরে গিয়েছে। সেটা লেজ আছড়াচ্ছে। রাগে, কিংবা একটা পা ভেঙেছে বলেই, চলতে গিয়ে লেজের অমন ব্যবহার হচ্ছে।
ডাঙার লোকরা গেলো-গেলো রাখো রাখো করছে, রাজু একবার সেদিকে চেয়ে দেখলো। শালতিকে চরের উপরের নালায় নিতে বললো। পরিস্থিতিটা বুঝতে চেষ্টা করলো। একমুহূর্তে কীই-বা বোঝা যায়! মাথার উপরে বন্দুক আর টোটার বেল্ট এক হাতে উঁচু করে ধরে সে জলে লাফিয়ে পড়লো। ওদিকেও কুমীরের টানে ডোঙা জলে ধাক্কা মারছে।
কী করবে তা শালতির লোকরা বুঝে উঠতে পারলো না। জল এখানে খুব বেশি না থাকার কথা, তাহলেও এক কোমর জল কেন হাঁটুজলেও কি মানুষ কুমীরের সমকক্ষ? কিন্তু রাজকুমার তো, কী বিপদ! শালতির একজন চিন্তা করে জলে নামলো। অন্য আর-একজন তাকে দেখে জলে লাফিয়ে পড়লো। ততক্ষণে রাজু জল ঠেলে, জল ছিটিয়ে চরের মাঝামাঝি গিয়ে পৌঁছেছে। তার ভিজে স্যুট থেকে জল গড়াচ্ছে।
রাজু একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা দেখলো, বন্দুকে দুটো গুলি পুরে সে আবার ছুটলো হাঁটুজল ভেঙে। জল ছিটোছে পায়ে-গায়ে। জলে গতি আটকাচ্ছে। কুমীরের সঙ্গে কি ছুটে পারা যাবে! ওদিকে ডুবো ঝোপঝাড়। কুমীর সেদিকে গেলে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, কিংবা চরের ওদিকে জল পায় যদি। চর অসমান, উঁচুনিচু, গাড়াগর্তও আছে।
না, কুমীরটা তেমন ছুটতে পারছেনা। চাকাভাঙা গাড়ির মতো অবস্থা তার। একটা ঢালু দেখে সে বোধ হয় আশা করলো সেদিকে জল আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একটা গাড়া। নিচে নেমে গিয়ে জল না পেয়ে কুমীরটা দিক বদলে কিংবা ভুল করে বরং রাজুর দিকে এগিয়ে এলো, কিংবা পাশ কাটাতে গিয়ে দূরত্বটা কমিয়ে আনলো। হাঁটু গেড়ে রাজু কাদামাটিতে বসে পড়লো। একমুহূর্ত তাক করে রাজু গুলি করলো। এবার কুমীরের গতিটা থেমে গেলো।
অন্য কুমীরটাকে নিয়ে ভোঙার লোকেরা বিপদেই পড়েছিলো। দুটো টেটার, তা অবশ্য কুমীর যত টানছে ততই তার নাড়িতে টান দিচ্ছে, দড়ি ধরা বটে কিন্তু তাতে তার লেজের আছড়ানো কমছেনা, চলাও বন্ধ করেনি সে। একজন সাহস করে বল্লম মারলো পাশ থেকে, কিন্তু যেন ঠিকরে এলো কুমীরের কাটার খোলা থেকে। তখন আর-একজন বরং তার মুখের দিকে এগিয়ে গিয়ে পেটের কাছাকাছি আর একটা টেটা বিধিয়ে দিতে পারলো। টেটাটার দড়িবাধা ডগাটা মাটি আর কুমীরের শরীরের চাপে পাটকাটির মতো ভেঙে গেলো, কিন্তু সেই চাপেই তার ধারালো ফলাটা কুমীরের শরীরের মধ্যে এক হাত পরিমাণ বসে গেলো।
তখন পশ্চিমের আকাশ লালচে হয়ে উঠেছে। শালতিটাকে চরের কোণে ভেড়ানো হয়েছে। রাজু শালতিটাতে বসে দেখলো, বাদামীবাদামী সেই আলোয় দুটো ভোঙার মতো দুটো কুমীর এখন স্থির হয়ে আছে।
শালতির একজন বললো–পা ঝুলিয়ে বসুন, হুজুর, জুতোর কাদা ধুয়ে দিই।
আর-একজন বললো–এখন হুজুর, আমাদের খুব তাড়াতাড়ি যেতে হবে। অন্ধকার হলে চরে-চরে গোলকধাঁধায় পড়বে।
