কিন্তু ততক্ষণে হাতি দেখে গ্রামবাসীরা হৈচৈ করে এগিয়ে এলো।
নয়নতারা বললো–আর কখনো মই ছাড়া হাতি বার করার কথা ভেবো না। কী মুশকিল!
রাজু নামলো শুঁড় বেয়ে। মাটিতে দাঁড়িয়ে হেসে বললো–তাহলে ঠাকুরানী তোমার নতুন পত্তনিটাকে পছন্দ হয় কিনা তা দ্যাখো। মাহুতকে বললো– কাছারিতে তহশীলদারনা থাকে অন্য কেউ থাকবে, মোড়লদের বাড়িতে খবর দিও, সাহেবান কাছারির খাস কামরায় দুপুরে থাকবেন। আমরাও কাছারির ঘাটে উঠবো বিকেলে।
পরে একদিন নয়নতারা রাজুর এই উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করেছিলো।
.
কেউ-কেউ বলে,কুমীরের নানা জাত আছে এবং তারা নাকি হিংস্র। তাদের গায়ের চর্ম বর্ম, চোয়ালে বসানো সারি-সারি বল্লমের ফলা, এবং জলের তলায় ডুবো জাহাজের গতিবিধি–এসবই নাকি তার গোপন হিংস্রতার কিছু কিছু প্রমাণ যা গোপন রাখতে পারেনি। কিন্তু কুমীর যে বোকা সে বিষয়েও অনেক গল্প আছে, বাঁদর, শিয়াল কার কাছেই না সে ঠকেছে। সুতরাং মানুষের সঙ্গে যারা সশস্ত্র এবং বন্দুকও আছে যাদের-তারা যখন দলবদ্ধ, তখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে আতঙ্কজনক হলেও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তীব্র ব্যথা যা সমস্ত শিরা-উপশিরা স্নায়ুকে পাগল করে তোলে, লুকোনোর পালানোর চেষ্টা যা শরীরের সব যন্ত্রকে একসঙ্গে পুরোদমে চালাতে চেষ্টা করে, তারপরের সেই বিস্ময় যখন কোনো যন্ত্র চেষ্টা সত্ত্বেও কোনোদিনই যেমন অচল অকেজো দেখা যায়নি তার চাইতেও অকেজো হয়ে যায়, আর নিজের চারপাশেই সেই রংটা দেখা দেয় জলে যা খাদ্যসংগ্রহের সার্থক চেষ্টার লক্ষণ হিসেবেই তার পরিচিত, এবং তখন খাদ্যসংগ্রহ হয়েছে কী না-হয়েছে, শরীরের ভিতরের সেই জ্বালা খাদ্যসংগ্রহের সার্থকতাবোধই কিনা এমন অনুভব করতে করতে রোদ পোহানোর অনুভূতি আর আগ্রহ এসে মিশে যায় সেই অনুভূতিতে, স্থির হয়ে যায় কুমীরটা।
কিন্তু এর বেশি কুমীরের কথা আমরা কী বলতে পারি?
কিন্তু বিল? তা যেন একটা আলাদা জগৎ। কোথাও দু-চার-দশ বিঘা পরিমাণ দাম। দামে কাষা, হোগলা প্রভৃতি ঘাস তো আছেই, আশশেওড়া, আকন্দ, এমনকী বাবলাও জন্মেছে কোথাও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এদিকের অধিবাসীরা দাম কেটে জলের গলিপথ বার করেছে। অন্য কোথাও টলটলে পরিষ্কার জল। সে জলে কোথাও কলমি, কোথাও শাপলা, অন্য কোথাও দশ-বিশ বিঘা পরিমাণ পদ্মবন। দামের উপরে বক, হাড়গিলে, মাছরাঙা; কলমি, শাপলার মাঝে মাঝে পানকৌড়ি আর মাছরাঙা।
রাজু যেখানে দাঁড়িয়েছিলো তার কাছাকাছি পারের সমান্তরাল একটা চর জেগেছে যেন। চরটার ওপারে অন্তত এক ঝাক বুনো হাঁস।
বিলমহলে রাজুদের কাছারি আছে বটে। গ্রামের লোকেরা বললো, তা প্রায় একক্রোশের পথ হবে। কিন্তু কুমীরের আজ্ঞ সামনের বাঁকটা থেকেই দেখা যাবে।
রাজু জানালো কাছারীতে তার কোনো কাজই নেই, এখনই বরংকুমারীর খোঁজে যাওয়া যেতে পারে। গ্রামের লোকেরাও বললো, সেটাই ঠিক হবে। রোদের তাপকমলে কুমীরকেও ডাঙায় পাওয়া যাবে না। তারাই স্থির করলো যত লোক জমেছে সবাই গেলে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙবে, কুমীর তো একচোখ খুলেই ঘুমোয়। সুতরাং শালতি আর তার সঙ্গে দুখানা। ডোঙামাত্র যাবে । রাজুর সামনের যে চরের কথা বলা হয়েছে সেই চর আর এ পারের মধ্যে বিলের জল একটা ছোটোখাটো নদীর মতো। শালতি বা ডোঙার পক্ষে যথেষ্ট গভীরও বটে।
শালতি একটু এগিয়ে যেতে রাজু দেখতে পেলো চর একটাই নয়, আর প্রথমটিই সব চাইতে উল্লেখযোগ্য নয়। কোনো চর পারের সমান্তরাল, কোনোটি বা কোনা কুনি পারের দিকে এগিয়ে এসেছে। যেখানে চরটা বড়ো এবং খালের পরিসর এবং কম সেখানে দু-তিনটি বাঁশ পাশাপাশি বেঁধে সাঁকো করা হয়েছে। এমন একটা সাঁকোর নিচে দিয়ে শালতিটা অনায়াসে গলে গেলো।
এদিকের চরগুলোর বৈশিষ্ট্য আছে। নদীর নয় যে কোথায় বালি আর কোথায় পলি খুঁজতে হবে। যেদিন চর জাগে সেদিনই চাষ দেওয়া যায়, কলাই আর ধান হবেই। যেখানে চরটা বড় সেখানে চাষ হয়েছে। কোনো কোনো চরে দু-চারটি ছোটো ছোটো ঘরও চোখে পড়ছে।
দিনটা পরিষ্কার। অনেক দূর পর্যন্ত খোলা আকাশ চোখে পড়ছে। নীল উঁচু আকাশে কোথাও সাদা তুলো ছড়ানো।
কোথাও জল একেবারে শান্ত কাঁচের ফলকের মতো। অন্য কোথাও, যেখানে জলটা অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে, সেখানে, বিঘৎ পরিমাণ উঁচু ঢেউ উঠছে বাতাস লেগে। কোথাও শালতি দেখে জলের ধারের হাড়গিলে আকাশে উঠলো। কোথাও চাষ থামিয়ে কৃষক জলের ধারে এগিয়ে এলো বালতি-ডোঙার ছোটো বহরটাকে ভালো করে দেখতে। একবার একটা চর ঘুরে যেতে, না বুঝে এক ঝাক বুনো হাঁসের মধ্যে গিয়ে পড়লো শালতি। ডাহুক, হাঁস, করন্ডে সে কি প্রতিবাদ!
রাজুর সঙ্গীরা স্থির করেছিলো কুমীরকে তারা গ্রামের বিপরীত দিক থেকে আক্রমণ করবে। কারণ দেখিয়েছে–তাড়া খেলে গভীর জলের দিকেই ঝুঁকবে সে। যদিবা গ্রামের দিকে যায় সেখানে এক কোমরের চাইতে বেশি জল নেই, ভাল্লা তেঁটায় সেখানে কুমীরকে ঠেকানো যাবে।
আরো আধঘণ্টা শালতি এদিক-ওদিকে চলে একটা বড়ো চরের দু-তিনশো গজের মধ্যে এসে পড়লো। বড়ো চড়টার কাছেভিতে আরো কতগুলি ছোটো ছোটো চর কুমীরের পিঠের মতোই জেগে আছে।
কিন্তু কুমীর তো মাটির তৈরি নয়। আরো একঘণ্টা ধরে এ-চর সে-চরকে বেষ্টন করে ঘোরা হলো। কাদাখোঁচা পাখি আর টিটিভকে নড়তে-চড়তে দেখা গেলো, মাছ ধরার আশায় ডুবিয়ে রাখা ভোঙাকে ভুল বুঝে একবার খুব সন্তর্পণে এগিয়েও গেলো শালতি, কিন্তু কুমীরকে গল্প বলেই মনে হলো।
