কেন, তার কী দরকার ছিলো? কেট জিজ্ঞাসা করলো।
–রোম্যান ক্যাথলিকদের পক্ষে শিক্ষা, কালচার এবং ধর্মে অনুরাগ থাকলেও সেই মতবাদ যে চট করে ইংল্যান্ডে বেড়ে উঠবে তা মনে হয় না। ভেবে দেখুন ১৮৫০-এ পোপ কয়েকজন রোম্যান ক্যাথলিক বিশপের এক্তিয়ার ঘোষণা করার সঙ্গে-সঙ্গে পোপের আক্রমণবলে যে আন্দোলন তৈরি হয়েছিলো তা এখনো থিতিয়ে যায়নি। ইংল্যান্ডে রোম্যান ক্যাথলিকদের সহ্য করা হচ্ছে, কিন্তু পোপের প্রভাব রাজনীতির দিকে এগিয়েছে মনে করা মাত্র ইংল্যান্ডে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে। তাই স্বাভাবিক নয়? এবং এই কারণেই অ্যাংলো ক্যাথলিক হয়েছেন কেউ-কেউ। দেশপ্রেমের তত টান একটা আছে। (কীবল এই জায়গায় একটু হাসলো)।
বাগচী বললো–হ্যাঁ, তা বটে। এরকমও শুনেছি।
সে কৌতুক বোধ করলো। যেন মনে মনে বললো, স্বাজাত্যবোধ এবং বিদেশীধর্ম, যতই বলো ধর্ম জাতি দিয়ে বিভাজ্য নয়। আসলে কিন্তু ধর্ম জাতীয়তার সীমা লঙঘন করলেই মুশকিল।
তখন আলাপের থেকে লাঞ্চের সুস্বাদ তাদের আকর্ষণ করলো।
পরবর্তীকালে কীবল অনুভব করেছে সেদিনকার লাঞ্চটা ভালোই হয়েছিলো, যার অন্য বিশেষণটা হয়তো ইনফর্মালও হতে পারে। আলাপটা, কি লাঞ্চের আগে কি লাঞ্চের সময়ে, বেশ উত্তেজক হয়ে উঠেছিলো। কিংবা তার অন্য নাম ঐকান্তিক!
লাঞ্চের পরে ইউরোপের সভ্যতার উপরে পেগানদের প্রভাব কিছু আছে কিনা, রেনেশায় তাকতটা খুঁজে পাওয়া যায় এমন আলোচনা হবে বলে মনে হয়েছিলো একসময়ে। তারুণ্যের ফলে কীবলের যেন আলোচনার বাতিকও আছে। কিন্তু এদেশের খাদ্য সুস্বাদু হতে পারে, কেট বলেছিলো, অতি সহজপাচ্যও, কিন্তু তা ভারী আর যেন আয়েশ করতে প্ররোচনা দেয়। লাঞ্চের ওজনটা ভারীই ছিলো, মদের পরিমাণই বরং কম। এবং একটু ঝাল বেশি।
পথে বেরিয়ে, তার ঘোড়া তখন ছুট করছে, কীবলের মনে হলো, সে তার আত্মিক ভগ্নীকে এরপরেই যে চিঠি লিখবে তাতে একারম্যানের প্রিন্ট সম্বন্ধে না-হোক নরউইচ স্কুলের কটম্যানের সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে বলবে।
ঠিক এই সময়েই তার মনে হলো, নাচতে গিয়ে সঙ্গিনীর মাড়িয়ে দেওয়া যেন। না, সে কথা আত্মিক ভগ্নীকে লেখা যায় না বোধহয় সেই কবোষ্ণ অনুভূতির কথা। অথচ এটা অ্যাকসিডেন্ট ছাড়া কিছু নয়। একটা অনুভূতিই মাত্র, যার প্রমাণ নেই। এবং ভদ্রলোকের তা মনে রাখা উচিত নয়। না, উচিত হয় না।
কীবল অন্য মন দিলো, অর্থাৎ লাগাম দিয়ে আঘাত করে ঘোড়াটার গতি বাড়ালো।
বাগচী বললো–এখন কি আমরা বিশ্রাম করবো ডার্লিং?
–যদি কাজের কথা মনে না হয়। কেট হাসলো। চরণদাসের ডিসপেনসারি?
-বেশ লাগছে। সুন্দর লাঞ্চ, সুন্দর আলাপ। কেমন লাগলো কীবলকে? বাগচী লক্ষ্য করলো না, কেটের জতে একটা হালকা ছায়া পড়লো।
সে বললো–অন্যদিকে দ্যাখো কেট, মানুষ আবার তার ঈশ্বরকে ফিরে পাচ্ছে। নিছক অভ্যাসের ব্যাপারের চাইতে বেশি। ইংল্যান্ডের যাঁরা রোম্যান ক্যাথলিক নিদেন অ্যাংলো ক্যাথলিক হচ্ছেন, কলকাতার যাঁরা খৃস্টান ও ব্রাহ্ম হচ্ছেন, তারা সমান পিপাসা নিয়ে চলেছেন–এমন মনে হয় না? মনে হয় না যে, কি লন্ডনে, অক্সফোর্ডে, কি কলকাতায় যেন একই ঈশ্বরের প্রভাবে মানুষ ধর্মের দিকে মুখ ফিরিয়েছে। একটা কথা কিন্তু জিজ্ঞাসা করা হয়নি। বিলেতের ওঁরা ইন্টারশেসনকে মূল্য দেন কিনা।
ইন্টারশেসন বলছো? আমার মনে হয় রোম্যান ক্যাথলিকরা তা মানবে।
বাগচী ভাবলো–আমি এবং আমার ঈশ্বর–আমাদের মধ্যে আমার হয়ে ঈশ্বরকে নিবেদন করার জন্য সত্যি কি অন্য কাউকে দরকার হয়? যাকে ইন্টারশেসন বলা যাবে?
কিন্তু তখন বিশ্রামের সময়, ছুটির দিন। বাগচী পাইপ ধরালো। উল কাটা নিয়ে বসলো কেট।
কয়েকদিন পরে একদিন বাগচী এই প্রশ্ন তুলেছিলো :বিলেতের ইভাঞ্জেলিস্ট আন্দোলন তাদের দেশের সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। সে দেশের মধ্যবিত্তদের সাংস্কৃতিক প্রাধান্য লাভের ইচ্ছা তার পিছনে কাজ করছে। কলকাতায়? এখানে এই দেশে কেউ কি বলবে না, ধর্ম আছে, যথেষ্ট ধর্ম আছে। অন্য কিছু চাই। তখন তার মন কালো থাকায় সে কলকাতার ধর্ম-আন্দোলনটাকে বিলেতিয়ানা বলে অনুভব করেছিলো। বিলেতে যা হচ্ছে এখানে তা হোক এমন বিলেতিয়ানা নিছক নকল। কিন্তু এ ভাবনা পরে।
তখন কেট বললে, উঠছো তো?
বাগচী বললো, দেরি করে ফেলেছি, রোগীটা বসে আছে।
.
০৭.
নয়নতারা বললো–দূরে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারাই কি শিকারের সঙ্গী?
ইতিমধ্যে কখন ঘোমটা উঠেছে খোঁপা ঢেকে। নয়নতারা একটা হাতে ঘোমটার দুপাশ ধরলো, তাতে রগ, কান, চিবুক আর-একটু ঢাকা পড়লো।
হাতি ক্রমশই লোকগুলির দিকে এগোচ্ছে।
নয়নতারা বললো– রাজকুমার, শুনেছি কুমীর শিকার নাকি জলের বুকে করতে হয়। ওই সরু-সরু নৌকোগুলোকেই ব্যবহার করা হবে?
দূরে বিলের বুকে সরু-সরু কয়েকটি নৌকো বটে।
নয়নতারা আবার বললো–জানো, কুমীর ইচ্ছা করলেই কাঠের গুঁড়ি হতে পারে? রাজু বললো–শুনেছি, বাঘও ঝোপঝাড় হতে পারে।
–কিন্তু
কী কিন্তু?
রাজু দেখলো নয়নতারার ঝুঁকে পড়া মুখটায় চাঁদরের ঘের বাঁহাতে চিবুকের উপরে ধরা। ঠোঁট দুটো হাসছে। কিন্তু চোখ দুটি যেন বেশি টানা আর স্নিগ্ধ হয়ে উঠলো। নয়নতারা এই প্রথম রাজুর হাতের উপরে হাত রাখলো যেন স্পর্শেও তেমন স্নিগ্ধ কিছু বলবে। চাপা গলায় বললো–আমি ক্ষত্রিয়া নই, দোহাই রাজু।
