কীবল বললো, বলা বাহুল্য ডিসেন্টার এবং এভানজেলিস্টদের জনপ্রিয়তার কারণ যতখানি ধর্ম সম্বন্ধে তাদের ঐকান্তিকতা ঠিক ততখানিই তাদের সমাজসেবার আগ্রহ। উইলবারফোর্স এবং বাক্সটন যাঁরা ক্রীতদাসপ্রথা লোপ করার ব্যাপারে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা মনেপ্রাণে এভানজেলিস্ট ছিলেন সন্দেহ নেই। বাগচী বললো–বেন্থামের সেই কথাটাও মনে রাখতে হবে। তোমার নিশ্চয় মনে পড়বে কেট, তিনি বলেছিলেন সমাজের অন্যায় দূর করলে যদি সেন্ট বলে বিদ্রূপ করা হয় তবে তিনি সেন্ট অথবা এভানজেলিস্ট হতে আপত্তি করবেন না।
কীবল বললো–অন্যদিকে কেউ-কেউ এখনই মনে করে, ডিসেন্টারদের প্রাদুর্ভাব যে শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। শিল্পবিপ্লবে কিছু কিছু শ্বেতকায় ক্রীতদাস তৈরি হয়েছিলো। ডিসেন্টারদের সকলকেই অল্পবিস্তর তাদের উন্নতির চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছে। এককথায় হাই চার্চ-এর তারা যেমন রাজা, লর্ড, বিশপ এবং ধনী জমিদার ও ব্যবসায়ীদের পক্ষে, লো চার্চ-এর ওরা তেমন মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত যারাই আকাশের তলে মাথা তুলতে চাইছিলো তাদের প্রতিভূ ছিলো–এরকম মোটামুটি বলা যায়।
কিন্তু কেট এলো। সে ইতিমধ্যে লাঞ্চের ফ্রায়েড রাইসের জল বসিয়ে এসেছে উনুনে।
বাগচীকে বললো–তুমি স্নান করবে তো? আমি বসি বরং অতিথির কাছে।
বাগচী উঠলো। অতিথিকে কিছুক্ষণের জন্য মাপ করুন বলে স্নান করতে গেলো সে।
কেট বললো–এখানে আপনার নিশ্চয় অসুবিধা হচ্ছে। আউটল্যান্ডিশ মনে হয় না?
-আউটল্যাভিশ? কীবল বললো–রোম্যান্টিক বরং, কিংবা রোম্যান্টিক বিষয়টাতেই আউটল্যান্ডিশ ভাব থাকে না? কিন্তু আপনি আমাকে মাপ করবেন যদি আমি আপনাদের ছবিগুলোকে ভালো করে দেখি।
-স্বচ্ছন্দে। বলে কেট উঠলো। বললো–আসুন।
ওয়াল-ক্লকের উপরে প্রিন্ট। বেশ খানিকটা সময় নিবিষ্ট হয়ে সেটিকে দেখলো কীবল। বললো–ক্রাইস্ট চার্চ নাকি?
কেট বললো–আগে ছবির তলায় পরিচয় লেখা ছিলো। নতুন করে ফ্রেমে পরানোর সময়ে ঢেকে গিয়েছে। ঠিক বলতে পারি না। এটা বোধহয় একারম্যানের প্রিন্ট, এরকম শুনেছিলাম মনে পড়ছে। হ্যাঁ, ক্রাইস্ট চার্চই হবে।
-কিন্তু এসব প্রিন্ট এখন ইংল্যান্ডেও দুর্লভ।
প্রিন্ট ছবিটা দেখে বিপরীত দিকে দেয়ালের প্রাকৃতিক দৃশ্যের সেই জলরং ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কীবল। একটু উপরে ছবিটা। ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয় স্বদেশের দৃশ্য। চিত্রীও সুনিপুণ। কীবল মুগ্ধ হয়ে গেলো।
দেখতে-দেখতেই সে জিজ্ঞাসা করলো–এটা কি মূল ছবি? তাই যেন মনে হয়। টার্নার নাকি?
কেট পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিলো। সে বললো–না, টার্নার নয়, এ জানতাম। এ ছবিটাও আমার বাবার সংগ্রহ। তার কাছে শুনেছিলাম এটা নরউইচ স্কুলের। দস্তখতটাকে দেখুন, কটম্যান মনে হয় না?
ছবিটাকে আর একটু ভালো করে দেখার জন্য পিছিয়ে আসতে গিয়ে ছেলেমানুষি কেলেঙ্কারি ঘটালো কীবল। গায়ে-গায়ে লাগলো কি না-লাগলো, কেটের সেন্টের সৌরভ কীবলকে অন্তরে বিদ্ধ করলো। এ অবস্থায় অনেকক্ষেত্রে পুরুষের চোখে পরিবর্তন দেখা দেয়। কীবল না বুঝে সে রকমভাবে চাইলো। ফলে কেটের মুখও লাল হয়ে উঠলো।
কীবল বললো–আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে দয়া করে ক্ষমা করুন।
মুহূর্তের মধ্যেই হেসে কেট বললো–আসুন, তার চাইতে বরং আপনার যুদ্ধের কথা শুনি।
কীবল বললো–দেখুন মিসেস বাগচী, এমন আশ্চর্য লাগছে আমার এখানে। আমি নিজেই ঠিক পাচ্ছি না ম্যানার্সের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছি কিনা।
হয়তো ক্রিমিয়ার অভিজ্ঞতা কিছুটা আপনাকে নন কনভেনশ্যানাল করেছে। কেট হাসলো মিষ্টি করে।
বাগচী স্নান করে ফিরে এলো। মঞ্চের আগে গৃহকর্ত্রীরও বসে থাকে চলে না বিশেষ যদি সংসারের কাজ নিজে করতে হয়।
বাগচী বললো–এটা কিন্তু খুব মজার ব্যাপার। আমরা যখন ভাবতাম মানুষ ধর্মের কাছে। থেকে সরে যাচ্ছে বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং ইনডাস্ট্রির প্রসারের ফলে, তখনই ধর্মটা আবার সর্বত্র প্রবল হয়ে উঠছে, তাই নয়! নতুন রোমান ক্যাথলিকদের সঙ্গে আমাদের মত না মিলতে পারে, কিন্তু তাদের সে ব্যাপারটায় একটা ঐকান্তিক অনুসন্ধান ধরা পড়ে, কেমন তাই মনে হয় না?
কীবল বললো–ঐকান্তিকতা তো বটেই। নিউম্যান, পুসে, কীবল, ম্যানিং প্রত্যেকেই ধর্মের ব্যাপারে ঐকান্তিকভাবে আগ্রহশীল তাতে সন্দেহ কী?
লাঞ্চে বসেও আবার এই ধর্মের কথাটা উঠে পড়লো।
বাগচী বললো–কি লন্ডনে কি ক্যালকাটার শিক্ষিত মানুষমাত্রেই এখন ধর্ম সম্বন্ধে চিন্তা করে দেখুন। প্রচলিত পদ্ধতি যাচাই করে দেখছে অনেকেই। নতুন পথে অগ্রসর হতে চেষ্টা করছে যেন ঈশ্বরের দিকে। এসব খুবই ভালো, তুমি কী বলল কেট?
কেট বললো–সত্যর কাছে পৌঁছনোর আগ্রহ বলছো?
–আমার তো তাই মনে হয়। মিস্টার কীবল, আমি শুনেছিলাম শিক্ষিত সংস্কৃতিবান যুবকদের নিউম্যান, কীবল প্রভৃতি গুণীব্যক্তিরা বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছেন। আপনার কি মনে হয় রোম্যান ক্যাথলিকদের সংখ্যা ইংল্যান্ডে এখন বিশেষভাবে বাড়বে?
একটু জল খেয়ে নিয়ে কীবল বললো–তা বলা শক্ত কিন্তু। ১৮৪৫-এর পরে অর্থাৎ নিউম্যান রোম্যান ক্যাথলিকে দীক্ষিত হওয়ার পরই অক্সফোর্ড আন্দোলন দুভাগ হয়ে গিয়েছে। পুসে ও কীবলের অ্যাংলো ক্যাথলিক; নিউম্যান-ম্যানিং-এর রোম্যান ক্যাথলিক সম্প্রদায়।
