তখন বাগচী বলেছিলো, কীবলের মুখে ইংল্যান্ডের কথা শুনেই তারা দেওয়ানসাহেবের কাছ থেকে টাইমস চেয়ে এনেছে। কাগজগুলো পুরনোই। তখন আবার বাষ্পীয় জাহাজ চললে কাগজও তাড়াতাড়ি আসবে, এবং তা কী অলৌকিক ব্যাপার তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো। কফির সঙ্গে পিয়ানোর কথা উঠেছিলো। কীবল বলেছিলো, এমন দামী জিনিস নিছক খেয়ালের কথা। তখন কীবল ধর্মাচরণ এবং পিয়ানো বাজনা সম্বন্ধে এই গল্পটা বলেছিলো :
গল্পটা কার্ডিন্যাল নিউম্যানের প্রিয় শিষ্য ডব্লু. জি. ওয়ার্ড সম্বন্ধে। তাঁকে কীবল শেষবার দেখেছিলো অক্সফোর্ডের পথেই। বছর পঁয়তাল্লিশের একজন ইংরেজ ভদ্রলোক, কিন্তু ঘটনার সময়ে ওয়ার্ড যুবক। তখন ধর্মের ব্যাপারে ঝাঁজালো-ধারালো যুক্তি তৈরি এবং সঙ্গীতচর্চা এই দুইয়েতেই সমান প্রবল অনুরাগ তার। কখনো তিনি ইউক্যারিস্টের গুহ্যতত্ত্ব সম্বন্ধে পাণ্ডিত্যপূর্ণ রহস্যময়তার আঁধি তুলছেন, কখনো মোজার্টের কোনো ফিগারোর স্বরলহর ছড়িয়ে দিচ্ছেন কূজনের মতো। এই দুইয়ের কোনটিতে তার অন্তর সায় দিচ্ছে সে বিষয়ে তাঁর ধর্মগুরু ডক্টর পুসেরও দ্বিধা ছিলো। একদিন ওয়ার্ড শুকনো মুখে ডক্টর পুসের কাছে উপস্থিত হলেন। স্বীকার করলেন লেনটেনের সময়ে সঙ্গীতের মতো হালকা ব্যাপারে জড়িয়ে না-পড়ার যে প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন তা রাখতে গিয়ে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে। এ বিষয়ে ডক্টর পুসে কি কিছু উপায় বাতলাতে পারেন?
ডক্টর স্থির করলেন, একটু-আধটু পবিত্র ধাঁচের বাজনা তেমন ক্ষতি করে না বোধ হয়। কৃতজ্ঞ ওয়ার্ড এক বন্ধুর ঘরে বাজনার আসর পাতলেন। শুরু হলো হেন্ডেলের গম্ভীর সঙ্গীত দিয়ে। চেরুবিনির ধর্মীয় স্বরলহরী তারপরে; ম্যাজিক ফুটের স্বর্গস্পর্শী স্বরগ্রাম এসে গেলো। কিন্তু হায় মোজার্টে অনেক বিপদ। কেউ হয়তো পাতাটা উল্টে দিয়েছিলো। আর সেইখানেই ছিলো পাপাজেনো-পাপাজেনার সেই দ্বৈতসঙ্গীত। রক্তমাংসের মানুষ আর কত সয়! সঙ্গীতের পর সঙ্গীত, স্বরগ্রাম হালকা ও দ্রুততর ক্রমে। যখন শেষ হলো মনে হলো। তখন দেয়ালের গায়ে কে মৃদু কিন্তু বারংবার টোকা দিয়ে চলেছে। হঠাৎ বন্ধুদের খেয়াল হলো, সর্বনাশ! পাশের ঘরটাতেই ডক্টর পুসে থাকেন বটে।
গল্পটা বলে কীবল, গল্পটা শুনে কেট ও বাগচী হেসে উঠলো। হাসতে-হাসতে সে বললো, না-না, আমি এমন পাদ্রী নই যে পিয়ানোতে আপত্তি থাকবে।
গল্পের মধ্যেই কফি শেষ হয়েছিলো। কেট উঠে দাঁড়ালো। কফির কাপ-প্লেট ট্রেতে কুড়িয়ে নিতে নিতে বললো– সে–আমাদের ঝি-চাকর নেই। লাঞ্চ কিছু বাকি আছে তৈরি করতে। আপনারা গল্প করুন। আমিও মাঝে-মাঝে আসবো।
কেট চলে গেলে বাগচী জিজ্ঞাসা করলো–মিস্টার ওয়ার্ড কি রোমান ক্যাথলিক?
কীবল বললো–সম্ভবত। কিন্তু অ্যাংলো ক্যাথলিকদের সঙ্গে বিবাদ আছেবলেও শুনিনি। আমি কিন্তু আপনাকে ঠিক ধরেছি। আপনি কোয়েকার। প্রকৃতপক্ষে আমি আজই চিঠি দিলাম বাড়িতে, তাতে লিখেছি, এখানে একজন প্রকৃত কোয়েকারের সাক্ষাৎ পেয়েছি।
বাগচী কোয়েকার শব্দ শুনে তার তাৎপর্য আবার উপলব্ধি করেই যেন শিউরে উঠলো। ঈশ্বরের সান্নিধ্যের অনুভূতিতে কম্পমান! সে বললো–সর্বনাশ! আপনি করেছেন কী?
-কেন আপনি কোয়েকার নন?
–হয়তো ডিসেন্টার। কেউ কেউ বলে ইউনিট্যারিয়ান।
-আদৌ না। আমি এবার লিখতে পারবো ইউনিট্যারিয়ানদের মধ্যে কোয়েকারের ভাব থাকে। আমি কিন্তু ইংলিশ চার্চেই অর্থাৎ অ্যাংলোক্যাথলিক আছি। যদিও আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে এবং ক্রিমিয়ার কমরেডদের মধ্যে অনেকে বিশেষ করে যারা আইরিশ, রোম্যান ক্যাথলিক ছিলো।
বাগচী হাসিমুখে বললো–ডানকান আপনাকে ইভানজেলিস্ট এবং সেন্ট বলেছিলো।
কীবল হেসে বললো–আমাদের বন্ধু এসব ব্যাপারে পুরনো খবর রাখেন। তিনি অবশ্য ইভানজেলিস্টদের যে একসময়ে সেন্ট বলে ঠাট্টা করা হতো সে খবর রাখেন। কিন্তু এখন সেসব দিন বেশ বদলেছে।
এরপরে যে আলাপ হলো তা ইংল্যান্ডের ধর্ম-আন্দোলন সম্বন্ধে। বাগচী মাঝে-মাঝে প্রশ্ন করে এহংকীবল তার উত্তর দিয়ে যে আলোচনা তৈরি করলো তাকে সংক্ষেপে এরকম বলা যায় : রাষ্ট্রস্বীকৃত সুতরাং বৃত্তিপ্রাপ্ত পুরোহিত সম্প্রদায় যে ক্রমশই জনসাধারণের বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলো, তার প্রমাণ তৎকালীন র্যাডিক্যাল প্রেসের বিদ্রূপ, পরিহাস, ক্যারিকেচার। ১৮৩১-এ রিফর্ম বিলের বিরুদ্ধে হাউস অভ লর্ডসে ধর্মীয় পীয়ররা ভোট দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ধূমায়িত অসন্তোষকেই বরং জ্বালিয়ে তুললেন। সেই বছরের শীতকালে রিফর্মসমর্থক জনতা বিশপদের গাড়িতে ঢিল ছুঁড়ে এবং তাদের প্রাসাদে আগুন দিয়ে শুধু ছেলেমানুষি আনন্দই করেনি, প্রাপ্তবয়স্কের ক্রোধও দেখিয়েছিলো।
ভয়সন্ত্রস্ত চার্চম্যানেরা এবং তাদের উল্লসিত প্রতিপক্ষও স্থির করে নিয়েছিলো, ১৮৩৩ এর পার্লামেন্টের প্রথম কাজই হবে ডিসেন্টারদের স্বীকৃত অভিযোগগুলো দূর করা।
বাগচী বললো–তা বটে। এঁর বাবা এডুজ বলতেন, তখন বরং ধর্মীয় লর্ডদের, যাদের সামাজিক ও সংস্কৃতিক সম্বন্ধ উঁচুতলায় অন্য শ্রেণীর লর্ডদের সঙ্গে, তাদের কুটি উপেক্ষা করেও জনসাধারণের যে কোনো একজনেরই যে বাইবেল থেকে ধর্মপ্রচারের অধিকার আছে তা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছিলো।
