এরকম কিছু বিশ্বাস করতে পারলে তো ভগবান ছ-দিনে বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করে একদিন বিশ্রাম করেছিলেন তা-ও বিশ্বাস করা যায়। অথচ সে মনপ্রাণ দিয়ে আজও এ তথ্যে বিশ্বাস আনতে পারলো না। রবিবারেই সে কি প্রার্থনা করে?
তার মুখের গাম্ভীর্য কমে গিয়ে একটা স্বপ্নময় দুঃখাতার ছাপ পড়লো। লুকনো চিন্তাটা আত্মপ্রকাশ করলো। ডানকান তার স্ত্রীর সম্বন্ধে চূড়ান্ত কুৎসা রটিয়েছে, তাকেও প্রতি সুযোগে অপমান করেছে, সেজন্যই কি ডানকানকে এরা বিদ্রূপ করায় সে হাসছিলো?
কিন্তু চোখ তুলতেই যোগাযোগটা ঘটে গেলো। ঘোড়ার পিঠে কীবলকে দেখতে পেলো বাগচী, গলির মুখে বড়োরাস্তাটা পার হয়ে যাচ্ছে তার ঘোড়া। কীবল কি প্রকৃত ইভান্জেলিস্ট, যেমন ডানকান বলেছিলো?
.
০৬.
চন্দ্রকান্ত এণ্ড্রুজ বাগচী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানে ইংরেজ ঠোঁটটেপা জাত, গায়ে পড়ে আলাপ করে না, অন্য কেউ তেমন করে তাও চায় না। তা সত্ত্বেও কীবলের সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ দেখা দিলো তার মনে, নিছক ভদ্রতার চাইতে বরং বেশি গভীর সে আগ্রহ কি কারণ তার? মনের বিচিত্র গতি বলা হবে? কিংবা চরণের রসিকতায় উল্লেখ করা লাস্ট জাজমেন্ট ও ড্যামনেশন, ধর্ম সম্বন্ধে নিজের বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, কিংবা কীবল এই নামটা কি তার আগ্রহের মূলে ছিলো? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হয়েছিলো তার মধ্যে কীবল নামে প্রধান একজন ছিলেন বটে। এবং অক্সফোর্ডের সে আন্দোলন নিয়ে সে এবং তার শ্বশুর ফাদার এজ একসময়ে বহু আলোচনা করেছে। কখনো কখনো আবেগের সঙ্গে।
পনিকে দ্রুত চালানোর চেষ্টা করলো বাগচী। সে তার রাশি রাশি বালামচিসহ ঘাড় এবং মাথা এমনভাবে নাড়লো যেন তখনই ধাপে ছুটবে। অথচ সে অসহায়। হায় আদরপুষ্টতা!
কিন্তু কীবলও তাকে দেখতে পেয়েছিলো। ক্রিমিয়াখ্যাত লাইট বিগ্রেডের সওয়ারের কায়দাতেই যেন রাশ টেনে ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে আনলো সে।
হেলো ফাদার, গুডমর্নিং! এই বলে সে হাসলো। সুন্দর এবং স্বাস্থ্যবান তার দন্তপংক্তি এখনো। গুডমর্নিং বলতে গিয়ে কি সময়ের কথা মনে পড়লো বাগচীর? তারপরেই সেও হাসিমুখে বললো–গুডমর্নিং মিস্টার কীবল, কিন্তু আমাকে ফাদার বলা বৃথা। আমি একজন ভিলেজ স্কুলমাস্টারমাত্র। এদিকে যখন এসেছেনই আসুন আমার কুটিরে, অতি নিকটেই। যদি আপনার আপত্তি না থাকে লাঞ্চের সময়টাকে আমরা এগিয়ে নেবো।
ইংল্যান্ডে অনুশীলিত কীবলের মনের ইংরেজি অভ্যাস অস্ফুটস্বরে একবার চিন্তা করলো, ইটনট ডান্ (এপ্রকার প্রথা না হয়)। কিন্তু পরক্ষণেই তার কী মনে হলো, আফটার অল দি ওনলি ইংলিশ গ্যার্ল দিশ সাইড ক্যালক্যাটা? (কলকাতার বাইরে ইংরেজদুহিতা আর কে? )। প্রকৃতপক্ষে তিনিই তো সম্ভাব্য হোস্টেস এক্ষেত্রে।
সে বললো–কিন্তু মিসেসের উপরে নির্যাতন হবে না? আচ্ছা, বরং এক কাপ কফি।
–আদৌ নয়-আদৌ নয়, বরং আমরা সম্মানিত জ্ঞান করবো। আসুন তাহলে। বাগচী ডান হাত প্রসারিত করে যেন তার বাংলোকে ইঙ্গিত করলো।
বাগচীর বাংলোর সামনে পৌঁছতেই, আর তাতে মিনিটকয়েক লাগলো, ঘোড়া দুটির ব্যবস্থা করলো সহিসই। তারা যখন বসবার ঘরে ঢুকছে ম্যান্টেলপিসের উপরে বসানো চার্চের আদলে তৈরি ছোটো ক্লকটায় একটা বাজতে কিছু দেরি আছে মাত্র।
ঘড়িটাতেই আগেকীবলৈর চোখ পড়ার একটা কারণ ছিলো। ক্লকের ফিট দুয়েক উপরে হলুদ-সাদা দেয়ালের গায়ে একটা প্রাকৃতিক দৃশ্য। একটা বাড়ির, তার উপরের আকাশের, এবং একজোড়া গাছের ছবি। বাড়িটা অক্সফোর্ডের একটা কলেজের। কীবল যেটায় ছিলো অবশ্যই সেটা নয়। তাহলেও চেনা লাগলো তার। চিত্রকর এবং একজন অ-চিত্রকর ছাত্রের দেখায় পার্থক্য থাকেই। চিত্রকর আকাশের যে রং দেখে অথবা আকাশের যে রং লেগে কলেজবাড়ির এক বিশেষ অংশ ছবিতে আঁকার মতো হয়ে ওঠে তা চিত্রীর চোখেই ধরা পড়ে।
ততক্ষণে বাগচী বসুন-বসুন বলে চেয়ার এগিয়ে দিয়েছে।
এখন শীতকাল হলেও ঘরে অনেক আলো। একটা জানলার কাঁচে রোদও। কীবলের ত্বকে উষ্ণতাটা যেন একটু বেশি তীক্ষ্ণ মনে হলো, আরামদায়কের চাইতে তীক্ষ্ণ এবং হয়তো সেজন্যই বা কিছু উত্তেজক।
সে বললো–আজ দিনটা বেশ উষ্ণ।
–আরামদায়করূপে সে রকম, তাই নয়?
জানলার উপরে বসানো রঙিন কাঁচের স্কাইলাইট দিয়ে আলো আসছে। রঙিীন জ্যামিতিক ছবির মতো মেঝেতে।
বাগচী বললো–আপনি তো ধূমপান করেন না। কফি কিংবা অন্য পানীয় আনাই।
কীবল হাসিমুখে বললো–কফিই ভালো। যুদ্ধে খুব দামী মদ দেয় না, আর তাছাড়া অক্সফোর্ডে কিংবা ইন-এও দামী মদের জোগাড় করা কদাচিৎ সম্ভব।
বাগচী কীবলের কথা বলার সময়ে তার মুখের দিকে চেয়েছিলো। সে অনুভব করলো তার পরিচিত কোনো নীলকরের মুখে এমন সরল কথা সে শোনেনি। বেশ ভালো লাগলো তার। সেদিন লাঞ্চটা ভালোই হয়েছিলো, বেশ আলোকোজ্জ্বল এবং আধুনিক আবহাওয়ায়। বাগচীর বাংলোটা আকারে কিছু ছোটো হলেও ডানকানের বাংলোর সঙ্গে নকশায় একতা বুঝেছিলোকীবল। কিন্তু ডানকানের বসবার ঘর নিশ্চয় এমন গোছানো, আলোক-প্রতিফলিত নয়। মানানসই ছিটের পর্দা, ম্যান্টেলপিসের কিছু উপরে রাখা কটম্যানের আদত ছবি, বেশ বড়ো সেই পিয়ানোটা, সেলফে সাজানো বাগচীর বই, ডেস্কের উপরে রাখা টাইমস কাগজের ফাঁইল, আর সবকিছুতেই জানলা ও স্কাইলাইটের আলো। আর লাঞ্চে কিছু দেরি আছে বলে ঝকঝকে পাত্রে কফি নিয়ে কেট প্রবেশ করলো। সাদা প্রিন্টের স্কার্ট, তার উপরে নীল স্ট্রাইপের জ্যাকেট। তার লালচে চুল, যা বনেট পরলে ঢাকা থাকে, এখন বরং এলো খোঁপায় জড়ানো। অত অজু লাল রেশমি চুল! এ কি ভারতের জলবায়ুর প্রভাব? কীবল স্বীকার করেছিলো, তেমন সুন্দর পরিবেশ সে কল্পনাই করেনি। তার মনের কোথাও ঠোঁটচাপা কেউ সতর্ক করেছিলো–ইটস্ নট ডান। কিন্তু তার মনের অন্য অংশ তাকে উৎসাহিত করে বলেছিলো–এটা গ্রেট ব্রিটেন নয়, এখানে সীমার বাইরে যাওয়ার টান আছে। সে লাঞ্চে রাজি হয়ে টাইমস কাগজকে ইঙ্গিত করে বলেছিলো–লন্ডনের বাইরে এই প্রথম টাইমস দেখলাম। ক্যালকাটাতেওবা কজন রাখে?
