তাই করলো সে। রোগীদের বিদায় করে পাইপটা জ্বালালো সে আবার। ভাবলো এটা কি পরধর্মবিদ্বেষ চরণের? তাই কি?
কথাটা তখন মনে পড়লো তার। মূল ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে এমন ভঙ্গিতে সে মনে মনে হেসে বললো–তা, চরণ, তুমি কি হিন্দু পেট্রিয়টের নাম শুনেছো?
-তা শুনেছি, সার ডাকঘরে একখানা নিয়মিত আসে দেওয়ানসাহেবের নামে।
–পড়েছো?
–দেওয়ানসাহেবের কাগজ কি খোলা যায়, সার?
বাগচী অনুমান করেছিলো চরণদাস হয়তো হিন্দু পেট্রিয়ট থেকেই নীলকরের প্রতি একটা গভীর বিদ্বেষ সংগ্রহ করে থাকবে, কারণ বাগচীর ধারণা ছিলো হিন্দু পেট্রিয়টের হরিশ নীলকরদের কঠোর সমালোচক। বিশেষত গত একবছর থেকে।
সে বললো–আচ্ছা, চরণ, তুমি কি কলকাতার নরেশবাবু, সুরেনবাবু এঁদের সঙ্গে আলাপ করোনি? দেখতে কলকাতার শিক্ষিত লোকেরা ক্রিশ্চান ধর্ম নিয়ে বিদ্রূপ করে না। বেশি কথা কী আমাদের নিয়োগীমশায়, তোমার কি মনে হয় না তিনি খৃস্টকে ঈশ্বর মনে করেন?
পথে বেরিয়ে ভাবলো বাগচী : এদিকেও লক্ষ্য করো শেষ বিচার, অনুতাপ এমন সব বিষয় সম্বন্ধে কিছু জানা না থাকলে তেমন বলা যায় না চরণদাস বলেছে। ভেবে দেখতে গেলে এটাকেই বরং বেশি আশ্চর্য মনে হওয়ার কথা। এখানে নীলকর অত্যাচার করে থাকলে হিন্দু পেট্রিয়টের সাহায্য ছাড়াই বিদ্বেষ জন্মানো সম্ভব। হিন্দু পেট্রিয়ট বরং দূরে, এরাই কাছে। কিন্তু ধর্মের তত্ত্ব কোথায় শেখে চরণ? বাগচী অনুমান করার চেষ্টায় স্কুলের নতুন মাস্টারমশাই নিয়োগী খুঁজে পেলো। তার কাছে কি শিখেছেচরণ অনুতাপে পাপমুক্তির তত্ত্ব? আচ্ছা!
কিছু দূর গিয়ে বাগচী এ ব্যাপারটা থেকে অন্যদিকে সরে গেলো। সে অনুভব করলো আজ ছুটির দিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চ আর বিশ্রাম।
মনের এই ঢিলে ভঙ্গীতে প্রিয় কিছু চিন্তা করা ভালো। এই ভাবতে-না-ভাবতে সে অন্য চিন্তায় ঢুকে গেলো। বিষয়টা তার স্কুলের পরীক্ষা সম্বন্ধে। প্রশ্নটা এই : জ্ঞানের বিষয়কে মূল্য দেয়া হবে, না যে-ভাষায় বিষয়টাকে বলা হয়েছে তাকে মূল্য দেয়া হবে? কোনো ছাত্র যদি হীমালয়, জমুনা, গংগা প্রভৃতি বানান লিখেও পর্বত নদীগুলোর যথাযথ পরিচয় দিতে পারে তাহলে কি তা মূল্যহীন? তার মনে হচ্ছে কলকেতার আধুনিক শিক্ষাও ভাষাজ্ঞানের উপরেই জোর দিচ্ছে। সে তার স্কুলের পরীক্ষায় ভাষা ও বানানের উপরে জোর না, দেয় যদি, যদি সে লিখিত পরীক্ষার বদলে মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করে উঁচু শ্রেণীতেও? ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞানের কথা শেখাই কি আসল কথা নয়? আর সাহিত্যই যদি বলল, তাতেই কি বানান আর ব্যাকরণের চাইতে রস বিষয়টা মূল্য পাবে না? শেকপীয়রের ব্যাকরণ আর বানান এখনকার কোনো ছাত্র ব্যবহার করলে সেসব প্রশ্নেই কি জেরোর বেশি পাবে? কিংবা এদেশের কৃষকের ধর্মজ্ঞানের কথা ভাবো। এক অক্ষর পড়তে লিখতে জানে। না। কিন্তু শুনো দেখি তার কথা? মূর্খ বলবে? অথচ কলকাতার ভাষাজ্ঞানের নিরিখে তারা মূখের অধম। অবশ্যই দেওয়ানজীকে জিজ্ঞাসা করে নিতে হবে।
চিন্তার বিষয়টা তার বিশেষ প্রিয়। মনে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু মনের একটা কৌশলও যেন এখানে ধরা পড়ছে। সে ঠিক এখন এ-বিষয়টাকে কেন ভাবছে? অন্য কোনো চিন্তাকে দূরে রাখতে কি? সেই অন্য চিন্তাটা নতুন চিন্তার দুপাশে অন্ধকার ঝোপের মতো থেকে যায় কিন্তু।
খানিকটা যেতে-না-যেতে বাগচীএকা একাই হো-হো করে হেসে উঠলো, দ্যাখো কাণ্ড, শুধু নামে একটা আকার যোগ করেই কেমন তিরস্কার তৈরি করেছে। ডানদিকে কানা। ডানকানা। আর কেমন সে, বিচারের কল্পনাও করেছে কোর্টের মতো।
ওদিকে কিন্তু লজ্জা হলো তার। কেউ দেখে ফেলেনি তো তাকে হাসতে? সে তাড়াতাড়ি হ্যাটটাকে কপালের উপরে টেনে নামালো। মুখটাকেও গম্ভীর করলো।
টকাটক করে চলছে পনি। মাটির কাছাকাছি বাগচীর সুদৃশ্য ও সুদৃশ্যতর সকপরা পা দুখানা দুলছে তালে তালে।
বাগচী হঠাৎ অবাক হয়ে স্বগতোক্তি করলো, আমিই কি শেষ বিচার কিংবা ইটারন্যাল ড্যামনেশন সম্বন্ধে কিছু জানি? ওসব কিন্তু আমার কাছেও ঠিক পরিষ্কার নয়। সেটা সেই ইটারন্যাল ড্যামনেশন কি মিল্টনের জ্বলন্ত গন্ধক ও কালো আগুন, ব্রিমস্টোন অ্যান্ড ব্ল্যাক ফায়ার? নাকি সে এক ঈশ্বরের সম্পর্কহীন অন্ধকারে বায়ুভূত নিরালম্ব অবস্থা? নাকি ছবিতে যেমন?
তার দুখানা ছবিকে মনে পড়লো। সে দুটিই বিশ্ববিখ্যাত। মাইকেল এঞ্জেলো এবং রুবেন্স নামক চিত্রীদ্বয়ের আঁকা দুখানা শেষ বিচারের ছবি। বিশেষ করে মাইকেলএঞ্জেলো। পরমপিতার সিংহাসনের নিচে ক্রাইস্টের ভঙ্গিতেও সেদিন ক্রোধ। ক্রাইস্টের পাশে ভার্জিন মেরিও যেন ক্রাইস্টের অটল গাম্ভীর্যকে, তার রুদ্র রূপকে স্নিগ্ধ করতে পারছে না। দণ্ডিত পাপীদের আত্মা নিচে কেরনের নৌকোর দিকেই ঘুরে-ঘুরে পড়ছে দেখা যাচ্ছে, অথবা তাদের সবলে টেনে নেওয়া হচ্ছে সেই বিভীষিকার দিকে। বাগচী নিজের ডান হাত তুলে চোখের সামনে রাখলো। যেন তাতে স্মৃতি থেকে সেই ছবিগুলোকে মুছে দেওয়া যায়, সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর আর্য ন্যুড আকৃতিগুলিকে।
কী আশ্চর্য, এ কি সে বিশ্বাস করে? সে অনুভব করলো, নিজের বিশ্বাস নিয়ে চিন্তা করলে মন বরং খারাপ হয়ে যায়। তাই নয়?
