চরণদাসের বাড়িতে একটা দাঁতব্য হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি গড়ে উঠেছে। সেখানে সপ্তাহের অন্যান্য দিন সকালে কিংবা বিকেলে অন্তত একবার সে যায়ই। ছুটি ও রবিবারে দুবেলাই।
রবিবারে–আজ রোগীর ভিড় ছিলো। ফিরতে কিছু দেরি হয়েছে বাগচীর। বিলমহল থেকে, ফরাসডাঙা থেকে দু-চার ক্রোশ পায়ে হেঁটে কয়েকজন রোগী এসেছিলো। কারো বাত,কারো স্থায়ী মাথাধরা, একজনের তো ক্ষয়রোগ বলেই সন্দেহ হয়েছে, অজীর্ণ, আমাশা তো বটেই।
প্রশ্নের উত্তরে রোগীরা যে রোগলক্ষণ বলে চরণদাস তা সংক্ষেপে টুকে নেয়। বাগচী কিছুদিন যাবৎ চরণদাসকে প্রশ্ন করে, তুমি হলে কী দিতে? চরণদাস যদি সাহস করে কিছু বলে বাগচী কোনো ক্ষেত্রে তার ভুল দেখিয়ে দেয়, কোনো ক্ষেত্রে বলে দাও, দেখা যাক; অন্য কখনো বলে ঠিক বলেছো, আমারই ভুল হয়ে যাচ্ছিলো। এ সেই চরণদাস যে গ্রামের পোস্টমাস্টার, বাগচীর স্কুলে শিক্ষকতাও করে; এবং দেখা যাচ্ছে ডানকানের আত্মা বিচারের আগে লাখ-লাখ বছর ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ পাবে এমন গল্পও বানায়।
ডিসপেনসারির কাজ ভালোই চলেছিলো। বাগচী কখনো হেসে কখনো তিরস্কার করে রোগী দেখা শেষ করছিলো এবং চরণদাস ওষুধ দিয়ে চলেছিলা।
দেখা যাচ্ছে গুজবের মতো রসিকতাও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে কৌতুকের এই হলো : চরণদাসের সেই আমলের বিচার নিয়ে রসিকতা অন্যের মুখে ঘুরে চরণদাসের কানেই ফিরে এলো।
বিলমহলের সেই চিরস্থায়ী মাথাধরা রোগী, যার কপালে সুতোর ডোরে একটা সরু শিকড় বাঁধা, সেই বললো–চরণ কবরেজ, শুনেছো নাকি ডানকানার নাকি নরকেরও ভয় নেই।
চরণদাস ওষুধের ফোঁটা ঢালছিলো জলের শিশিতে।
বাগচী জিজ্ঞাসা করলোকে? কার কথা বলছো? ডানকানা কে? কিন্তু বাগচী নিজেই বুঝতে পারলো। সে হো-হো করে হেসে উঠলো। এরা ডানকান সাহেবকে একটামাত্র আকার দিয়েই কানা করে ছেড়েছে। রোগীটি বাগচীর সামনে লঘু কথা বলে ফেলে অপ্রস্তুত বোধ করছিলো। বাগচী হাসলেও রসিকতাটা আবার করা উচিত হবে কিনা এ বিষয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ হলো।
বাগচীই বরং বললো– হাসতে হাসতে–সে আবার কী গো, নরকের ভয় কার নেই?
সাহস পেয়ে রোগীটি বললো–নরকে তো আত্মাই যায়। তা সে আত্মা যদি লাখ লাখ বছর ঘুমিয়েই থাকে তার তবে কিন্তু ভয় কমে গেলো।
এই কৌতুকের জনক চরণদাস কিন্তু বিব্রত বোধ করলো। সে ব্যাপারটাকে হালকা করার জন্য বললো–পাপ কি কেউ এড়াতে পারে? ওর আর তামাদি নেই।
রোগীটি যা শুনেছে তা ভোলেনি। বললো– সে, তামাদি নয় নেই। কিন্তু তুমিই বলো; হলোইবা ইংরেজ চিত্রগুপ্ত। তার সেরিস্তায় কাগজ কি লাখ-লাখ বছর পরের পর ঠিক থাকে? বিচার তো করে সেই শেষের একদিনে।
বাগচী অবাক। একবার মনে হলো সে আবার হেসে উঠবে। কিন্তু রসিকতা হলেও এটা কি ভালো রুচির? একটু গম্ভীর মুখেই সে বললো–সব ধর্মেই এমন কিছু থাকে যা অন্য ধর্মের লোকেরা সহজে বুঝতে পারে না। ওষুধটা ওকে দিয়ে দাও চরণ। দেরী হচ্ছে।
একটু হেসে সে রোগীটিকে বললো–ওষুধটা কীসের তৈরি জানো? স্রেফ ঘোল। তাই বলে ঘোল খেলে মাথা ধরা সারবে না। হু-হুঁ!
ওষুধ নিয়ে রোগীটি উঠে দাঁড়ালো। ট্র্যাক থেকে পাঁচসিকে পয়সা বার করে বাগচীর জুতোর সামনে রেখে বললো–কবে আবার আসবো, সার?
বাগচী বললো––ও কী, পয়সা কেন?
সার কত গরীব লোককে পথ্য দেন শুনি। পয়সা কটা সেই ধর্মভাণ্ডারে দেবেন। দেখা যাচ্ছে ছাত্রদের দেখাদেখি রোগীরাও কখনো কখনো তাকে সার বলে।
বাগচী রোগীটির মুখের দিকে চাইলো। এই পরার্থপরতা তার ভালো লাগলো। সে সস্নেহে বললো–ফের রবিবারে এসো। নিজে আসতে না-পারা কাউকে পাঠিও খবর দিয়ে। আবার হেসে বললো–তোমাকে ঘোল খাওয়াচ্ছি বলে আবার কেউ ঠাট্টা করবে না তত, হে?
–তা করবে, সার, মেন্তুজা শুনতে পেলে রক্ষা রাখবে না।
কিন্তু রসিকতা কখনো নাছোড়বান্দা হয়। দাওয়া থেকে পৈঠায় নামতে অন্য আর-এক রোগী বললো– আবার–তা চরণ, যাই বলল ভাই, ভাগ্যটাই ওদের ভালো। এদিকে ইহকালে রাজা হয়েই জেতে বসেছে, ওদিকে দ্যাখো পরকালেরও সাজার ভয় নেই। মজা আর কাকে বলে।
ওদিকের বেঞ্চের উপরে স্বগ্রামের কয়েকজন রোগী ছিলো। তাদের একজন রসিকতার সুরেই বললো–তা, ভূতোদা মিথ্যে বলোনি। কিন্তুক এক কাজ করা যায়। সবসমেত পুড়িয়ে দিলে হয় একদিন। তাহলে আত্মা ঘুমুতে জায়গা পায় না। সরাসরি নরকে পৌঁছায়।
সকলেই হেসে উঠলো।
রোগীর ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। বাগচী কিছু ভাবলো। তার মুখে হাসি ফুটেছিলো,
.
মিলিয়ে গেলো। পাইপ বার করে ধরালো। বরং পায়ের উপরে পা তুলে আয়েশ করে নেয়ার ভঙ্গিতে বসে বললো–চরণ, ডাবা টেনে নাও। ওতে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। কিন্তু একটা কথা, ১রণ।
চরণ বললো––বলুন সার।
–এই এখনই যা বলা হলো।
চরণদাস উত্তর দেয়ার আগে চিন্তা করলো। তামাক, শোলা, চকমকির বাক্সটাকে আঙুলে নির্দেশ করে একজন রোগীকে বললো–তামাক খাও, চেলোকাকা।
তারপর হঠাৎ বাগচীর দিকে ফিরে বললো–যদি লাগাই হয়, সার, সবসমেত পুরিয়ে দেয়াই মন্দ নয়! যাকে সকার বলে। আর তা করতে হবে পাপ করে উঠেছে ঠিক এমন সময়ে। অনুশোচনা কর পাপ কাটানো সুযোগ যাতে না-পায়।
বাগচীর মুখে কথা নেই। সে যেন ভেবেই পেলো না সে হাসবে, না চটে উঠবে। একবার তার মনে হলো সেদিন সে আর রোগী দেখতে পারবে না, পরে একবার ভাবলো যত তাড়াতাড়ি এদের বিদায় করা যায় ততই ভালো। কী সাংঘাতিক কথা!
