চিঠি দেওয়ার পরে হাতে এখন অনেক সময়। সুতরাং সে এদিক-ওদিক ঘুরে। বেড়াচ্ছিলো। ঘণ্টাতিনেক আগে ব্রেকফাস্টহয়েছে। ঋতুটা এখন এমন যে চারিদিক থেকেই সূর্যের আলো তার গায়ে পড়ছে। ধুলো নয়, প্রচুর ঘাস; কাদা নয়, ট্যালকমের মতো মাটি। উপরন্তু যেদিকে তাকাও সবুজ, ময়ূরের পেখমের মতোনীলে জড়ানো সবুজ এবং উজ্জ্বল।
ঘোড়া ক্যানটারে চলছে। সে শিস দিতেও শুরু করেছিলো। তা এখানকার জলটাও ভাল, ক্যালকাটার তুলনায় বটেই। আর ক্যালকাটার নেটিভপাড়ার, এবং ক্যালকাটার বেশির ভাগই তাই, সেই খোলা পচা জলের নর্দমাগুলোর চাইতে এই বুনো পথও ভালো। ডিসাইডেড়লি। এখন আবার চিঠির কথাটা অথবা চিঠির প্রশ্নর কথাই তার মনে এলো। দুটো প্রশ্ন আছে এই চিঠিতে। সে প্রশ্ন দুটির বিষয়ে ম্যাগির ধারণা জানতে চেয়েছে : (১) সেন্ট পলের হাতে স্বর্গের যে চাবি আছে তা কি সোনার তৈরি? (২) সে হাত কি অ্যাঞ্জেলদের হাতের মতো? বস্তুত এই প্রশ্ন দুটো তৈরি না-হলে গত সপ্তাহের পর আজই আবার চিঠি কেন?
এখন মনে হলো, কীবলের অ্যাঞ্জেলদের হাতই বা কি? তা কী স্বচ্ছ একটা জমাটবাঁধা আলো? কিংবা অ্যামব্রোসিয়ায় তৈরি? কী আশ্চর্য, এ সম্বন্ধেও তার ধারণা স্বচ্ছ নয়।
কিন্তু চিঠিতে প্রশ্ন ছাড়াও অন্য কিছু থাকে। কীবল তার অভিজ্ঞতার কথাও কিছু লিখেছে। এটাকে মানে ইন্ডিয়াকে ন্যাংটো সন্ন্যাসী ও সাপুড়ের দেশ মনে করে বটে লোকে। এখানে অন্য অভিজ্ঞতাও হতে পারে। তোমাকে বলতে পারবো না সবটুকু। কিন্তু এখানে জননেন্দ্রিয় পূজা হয়ে থাকে। হ্যাঁ, আমি তা নিজের চোখে দেখেছি। তবে তুমি নিশ্চিন্ত থেকো। তোমার মুখোনি আমার স্মৃতির দিগন্তে। আমি বিপথে যাবো না। তবে এ দেশটা, যা আমাদের সাম্রাজ্যের কোহিনুর, সত্যি অদ্ভুত। এখানে আমার পরিচিত ইংরেজ ভদ্রলোক কালীপূজা করেছিলো। এই কালী নাকি এক কালো ন্যুড গার্ল। এখানে এক কালো ভদ্রলোক আছে যার স্ত্রী বৃটিশ। এই কালো ভদ্রলোককে কখনো কোয়েকার মনে হয়। কখনো বিধর্মী। কিন্তু সবচাইতে বড়ো কথা একটি বৃটিশ গালা কী করে তার সঙ্গে টেলে বসে এবং ঘুমায়।
এটা বোধ হয় বেতের ঝোপ। ডানকানের কথা বিশ্বাস করতে হলে মালাক্কা কে আর এই বেত একই জিনিস। একটা নালার বরাবর তার দুপারে মানুষের মাথা ছাড়িয়ে উঁচু বেতবোপ। ধারেকাছের গাছের ডালপালা আঁকড়ে ধরেও বেত উঠে পড়েছে। দুএকটি বড়ো গাছের মাথা ছাড়িয়ে রোদে ঝলমল করছে বেতের চূড়া।
ঘোড়াটা চমকে উঠলো। কারণ খুঁজে এদিক-ওদিক চাইতেই কীবল হাতি, হাওদা ও হাওদায় মানুষ দেখতে পেলো। বেশ দ্রুত চলেছে হাতি, আর তার ঘোড়াও ক্যান্টার করছে। আরো ভালো করে দেখতে হলে লাগাম টানতে হয়।
সে অনুভব করলো : মাইপ্লেনডিড! এর আগে কি হাতি দেখেছি, না তার সওয়ার!
আচমকা এরকম অনুভব করার পর তার মন যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলো। তুমি স্বপ্নও দ্যাখোনি। এমন রূপ সম্বন্ধে। কী আশ্চর্য, এমন রূপ কি হিদেন-নেটিভদের হয়? আচ্ছা, পুরুষটি রাজকুমার কি? কারণ প্রিন্সই হাতি চড়তে ভালোবাসে। পরবর্তী পর্যায়ে সে যুক্তি দিলো, মহিলাটি প্রকৃতপক্ষে ক্যাথারীনই? নতুন পোশাকেই তাকে তেমন দেখিয়েছে? অবশ্যই জিনুইন ব্রিটিশ ব্লাড়। নতুবা এত রূপ হয়! কীবলের চাপা ঠোঁটে ভাঙচুর দেখা দিলো, কিন্তু এই রাজকুমার অবশ্য হার ম্যাজিস্টির একজন সাবজেক্টমাত্র। বৃথা জাঁকজমক। এই সময়ে তার সদ্য শোনা প্রবাদটা মনে পড়লো :ইন্ডিয়ান প্রিন্সরা হাতিতে চড়ানোর লোভ দেখিয়ে স্ত্রীলোকদের সিডিউস করেন না, তাহলে কেট হয় না। প্রকৃতপক্ষে সে রাজচন্দ্র আর নয়নতারাকে দেখেছিলো।
এখন তার মরেলগঞ্জে ফেরারও তারা নেই। এদিকে দ্যাখো, সামনের ওই রাস্তাটা চওড়া। সে লাগাম টানতে ঘোড়াটা চওড়া পথটা ধরলো। কিছু দূরে গিয়েই গোল, সাদা, প্রকাণ্ড একটা ছাতার মতো গম্বুজ চোখে পড়লো। আচ্ছা! ওটাই নাকি রাজবাড়ি?
অতঃপর সে আবার রাজবাড়ির গম্বুজের টানেই যেন রাজারগ্রামের দিকে ফিরতে শুরু করলো।
তখন তার মনেও একটা উল্টো পাক দেখা দিয়েছে। সে ভাবলো, (যেন সে নৃতত্ত্ব সম্বন্ধেই উৎসুক) আসল কথা এদেশে অর্থাৎ এই ইন্ডিয়ায় বিভিন্ন রকমের মানুষ থাকাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ মানুষের যত রকমের দেহবর্ণ হতে পারে বোধ হয় সবরকমই এখানে পাওয়া যাবে আর তা হয়তো এইজন্য যে একের পরে এক মানবগোষ্ঠী এখানে তাদের বিভিন্ন বর্ণের দেহ নিয়ে এসেছে এবং থেকে গিয়েছে। হয়তো একদিন তেমন ইংরেজদেরও কিছু চিহ্ন পড়ে থাকবে। কীবলের মন থেমে দাঁড়ালো। নানা, অবশ্য তা প্রকৃতপক্ষে হবে না। কেননা কোন এমন জাত আছে পৃথিবীতে যা ইংরেজদের পরেও আবার এদেশে রাজ্য পাবে। অর্থাৎ ইংরেজ অপেক্ষা উন্নত ও শ্বেতকায়? রাজকুমার হয়তো এবং হয়তোবা রাজকুমারের সঙ্গীও তেমন কোনো অভিযাত্রী দলের বংশধর। তারা কী এরিয়ান ছিলো?
.
০৫.
অনেক সময়ে যোগাযোগ ঘটে যায়। চন্দ্রকান্ত এডুজ বাগচী তখন চরণদাসের বাড়ি থেকে নিজের কুঠিতে ফিরছিলো লাঞ্চের জন্য। তার পনিটা বেশ মোটা, গতিটাও শ্লথ। যদি কেউ দুএক বছর আগে দেখে থাকে তবে তার অনুমান হবে বাগচীর যত্নেই তার এই দৈহিক উন্নতি। হাঁটুর কাছে থোপা-থোপা পশম, ঘাড়ে সিংহসম কেশর ও লেজের মাটিছোঁয়া বালামচি দূর থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাগচীর পোশাকও গ্রামে লক্ষণীয়। স্প্যাটস, ক্রাভ্যাট সমন্বিত পুরো ইংলন্ডীয় তার পোশাক। শুধু মাথার পেন্টহ্যাট যেন বেশ বড়ো। পনি মাথা ঝাঁকিয়ে টিকটিক করে চলেছে। বাগচীর লম্বমান পা দুখানা মাটির কয়েক আঙুল উপরে। দুষ্টু ছেলেরা গোপনে মন্তব্য করে ঘোড়া ও সওয়ার দুজনেই একসঙ্গে হাঁটে। কিন্তু তা গোপনে, খুবই গোপনে।
