নয়নতারা বললো–এমন সুন্দর দেখিনি।
তার চোখ দুটি ডাগর, তার লাল ঠোঁট দুটি একটু উন্মুক্ত, স্নিগ্ধ হাসিতে তার উজ্জ্বল দাঁতের দু-একটি ডগা চোখে পড়ছে। দেখে রাজুর মনে হলো এমন পাশ থেকে সে নয়নতারাকে কখনোই দেখেনি। কী আশ্চর্য!
সে, সোৎসাহে বললো–দ্যাখোদ্যাখো নয়ন, ডাহুক বোধ হয়, যাদের টিটিভ বলে।
হাতি বিলের পাশ ঘেঁষে এগিয়ে চলেছে। যেন একটা পায়ে-চলা পথও আছে সেখানে। অনুমান হয় তা থেকে এদিকে একটা গ্রাম থাকবে।
হঠাৎ নয়নতারা বললো, বলার আগেই হাসি ফুটলো তার মুখে–আচ্ছা রাজকুমার, টিটিভ না ডাহুক, কে ভালো?
রাজু বললো–নয়ন, তোমাদের রাজকুমার যে মূর্খ এটা প্রমাণ না করেই তা বলা যায়।
-আ, রাজু, আমি কি? দ্যাখো–নয়নতারা মুহূর্তের জন্য ভাবলো, সে কি বুঝিয়ে বলবে ডাহুক কথাটা অনেক বাংলা গানে আছে, টিট্টিভের সাক্ষাৎ বিষ্ণুশর্মার উপদেশের বাইরে নেই। সেজন্যই সে জিজ্ঞাসা করেছিলো।
কিন্তু বিলের দিকে চোখ রেখে রাজু বললো–ও কী, মুখের কেন অমন চেহারা? তুমি কি সত্যি ভেবেছো তোমাদের রাজকুমার মুখ থেকে যাচ্ছে? যদি তুমি সেই আড্ডাগুলো দেখতে নয়ন যা অনেক সন্ধ্যায় আমার বৈঠকখানায় বসে। কী শ্যাম্পেন! আর কত শের আমি শ্যারম, আঁশটে কত ঘনঘন! আমাদের বাগচী মাস্টারমশায় কিন্তু যত গম্ভীর দেখায় তত গম্ভীর নন।
নয়নতারা বললো–নিজের ব্যাপারে এখন দেখছি আপনার সব কথাই বাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
রাজচন্দ্র হাসলো। বিলে সৌন্দর্যের প্রফুল্লতাই যেন তার মুখে। সে বললো–কে বলেছে? আমার এই বন্দুকের রেঞ্জ ভেলোসিটি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করো কিংবা পিয়ানো সম্বন্ধে, দেখবে আমার কোনো কথাই বাঁকা নয়।
রাজকুমারের মুখের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে নয়নতারা চিন্তা করলো। কথার সুরে কোথাও কোথাও সুখ জড়ানো আছে, কিন্তু শেষ কথাটার চাইতে বাঁকা আর কী?
কিন্তু মাহুত, যে এতক্ষণ নিজেকে লুপ্ত করে রেখেছিলো, কথা বললো– সামনে লোকজন দেখছি।
-হ্যাঁ, ওরাই পথ দেখাবে।
নয়নতারাও লোকগুলিকে দেখতে পেয়েছিলো। হঠাৎ যেন তার মুখ রাঙা হয়ে উঠলো।
কী ভাবছো?
মৃদুস্বরে নয়নতারা বললো–কাজটা ভালো হয়নি। হাওদায় কবরেজকে দেখে না-জানি অন্যে কী ভাবে। তাছাড়া আমি বোধ হয় ভুলে আপনাকে কয়েকবার তুমি বলেছি।
রাজকুমারের চোখ দুটিতে দুষ্টুমি দেখা দিলো। সে বললো–তাই তো, এখন আর অন্তর্ধানেরও উপায় নেই। একেই অগত্যা বলে, দেবী? মনে হয় করণ বুঝি, কিংবা হেত্বর্থে। কিন্তু আসলে প্রকৃত্যাদিভিঃ।
হাতি এগিয়ে চললো।
নয়নতারা ঠোঁট কামড়ে ধরে ভাবলো, সামনের লোকগুলি ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তার মধ্যেই মনে হলো তার একবার, এটা কি রাজুর একটা ঝকঝকে বাক্য তৈরির নেশা কিংবা শ্লেষ করে কিছু বলছে? স্ত্রীলোককেই তো প্রকৃতি বলে। সত্যি কী হেতু ছিলো এই শিকারে আসার তার পক্ষে?
.
০৪.
কীবল কেন এসেছিলো এই অঞ্চলে? নানা দিকে বিচার-বিবেচনা করার পর অনুমান হয়: তার অনেকটা জীবিকা অনুসন্ধান, কিছুটা পলাতকবৃত্তি। ক্রিমিয়া ফেরত সে তাইপিং বিদ্রোহ দমনে চীনে যেতে অনিচ্ছুক ছিলো কি? পরবর্তী জীবনে এদেশে আইন ব্যবসায় সে খ্যাতি ইত্যাদি লাভ করেছিলো। তার স্বদেশে কি তা হতে পারতো না? অথবা ভারতে তখন কয়েকটি হাইকোর্ট স্থাপিত হচ্ছে, সেইসব নতুন হাইকোর্টে নতুন আইনজীবীদের প্রতিযোগিতা করার সুবিধা ছিলো। অন্যদিকে তাহলে এই প্রশ্ন থাকে, কিছু বেশি টাকার জন্যই কি সহজে স্বদেশ ত্যাগ করা যায়? আসলে একথাও মনে রাখতে হবে, কারো কারো কাছে সাজানো-গোছানো লন্ডন সভ্যতার কেন্দ্রর চাইতে অসভ্যতার প্রান্তে যেখানে সভ্যতা গড়ে উঠছে এমন সংযোগস্থলেই আকর্ষণীয় বোধ হয়।
আপাতত সে রাজারগ্রামে চিঠি দিতে এসেছিলো ডাকে। কিন্তু সেটা এমন ব্যাপার নয় যে তাকে আসতেই হতো। মরেলগঞ্জের নিজস্ব ডাকহরকরা আছে। ঝোঁকের মাথায় কীবল কাল অনেক রাত পর্যন্ত একখানা চিঠি লিখেছে, এবং দ্বিতীয়বার না-পড়েই তা পোস্টকরতে ঝোঁকের মাথাতেই ডাকঘরে এসেছিলো। অনুপ্রেরণার স্বভাব এই যে দ্বিতীয়বার পড়লে তার অনেক কথাই বর্জনীয় মনে হয়।
কীবল চিঠি লিখেছিলো তার আত্মিক ভগ্নীকে। তাদের রোমান ক্যাথলিক ভিকারের বিধবা মেয়ে। বয়সে কীবলের চাইতে কিছু বড়ো হতে না-ও পারে, কিন্তু সম্মানে কীবলের চোখে গগনচুম্বী। তাকে চুম্বন করতে সুতরাং গগনই পারে। বিধবা এই মহিলাকে, তার নাম ম্যাগি হওয়ার সুবাদে, কীবলের চোখে ম্যাগডালেনের ঘোর লাগে। কিন্তু কী করে কী হয় বলা যায় না। বাইবেল নিয়েই বসা। কিন্তু সেই বিকেলের উজ্জ্বল আলোয় তারা বেশি বয়সে অল্পবয়সী ভাইবোনের মতো হাত কাড়াকাড়ি করছিলো। জাপ্টাজাস্টি শেষে বইটা দখল করে কীবল চেয়ারে বসতেই মুখোমুখি বসলো ম্যাগি। তখনো সে হাঁপাচ্ছে। হঠাৎ দেখতে পেয়েছিলো তখন কীবল। ব্লাউজের হুক খুলে গিয়েছে, পারঙের অর্গান্ডির আন্ডারগার্মেন্টের শাসনবিচ্যুত সুপক্ক পুষ্ট স্তনের অর্ধাংশ, যা নাকি স্বর্গের মতো। আর তখন হাঁপাচ্ছিলোও ম্যাগি।
কিন্তু তারা অবশ্যই নতুন সুতরাংক্যাথলিক কীবল তার আত্মিক ভগ্নীকেই চিঠি লিখতে অভ্যস্ত। কেননা চিঠিতে যেমন এই আত্মিকভগ্নীত্বের গভীরতা ছুঁয়ে চলা সম্ভব পাশাপাশির নৈকট্যে ততটা সাহস হয় না যেন।
