-কী?
–ঠিক বলতে পারছি না। একালে আমার নিজের ঘরবাড়ি নেই বললে তো ভাষা হয় না।
-বেশ কথাটা তো! চটুল সুরে নয়নতারা বললো। কিন্তু ভাবলো সে। হঠাৎ এসে পড়া এই একটা কথা রাজকুমারের যাতে কোথাও ঠাট্টা নেই। লুকিয়ে রাজুর মুখ দেখবে নাকি? কিন্তু বরং সে মন থেকে বাইরে চলে এলো। বললো–দ্যাখোদ্যাখো রাজকুমার, হাতি ডুবে যাচ্ছে এমন ঘাস। গ্রামের কাছে এমন দেখিনি। এমন ঘাস। ধানও হতে পারে তাহলে।
রাজুর দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়লো। কিন্তু বাস্তবের ধাক্কায় হেসে সে বললো–কেন ধান হয় জানি না। হাত দিও না। ধার আছে ঘাসের। দ্যাখো হাতির গায়ে দাগ পড়ছে। একটু পরে সে আবার বললো–নয়নতারা, আমি কিন্তু তোমাকে কুশল প্রশ্ন করিনি।
–এতক্ষণে বুঝি মনে পড়ছে? ধাক্কাটা সামলে নিয়েছো বলো।
কীসের ধাক্কা? ও! এত গর্ব নাকি রূপের?
নয়নতারা ঠোঁটে আঙুল রেখে চোখের ইশারায় মাহুতকে দেখিয়ে দিলো। বললো–সবার কাছে শুনছি, নাকি বেড়েছে। তাই বললাম।
ঘাসের জঙ্গল কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নও বটে। সামনে কিছুটা ফাঁকা। তাতে ছোটো ঝোপঝাড় কাঁটাগাছ। লতা উঠেই যেন তাকে আরো দর্শনীয় করেছে।
রাজু তাড়াতাড়ি বললো–ওটা কি খদির, কবরেজ মহোদয়া?
-খয়ের? তাই কী? নয়নতারা বুঝতে পারলো রাজকুমার আন্দাজ করছে কবরেজি শিখতেই সে এতদিন গ্রামের বাইরে ছিলো। সে কি নিজেই বলতে পারে স্পষ্ট করে কেন সে দূরে চলে গিয়েছিলো? সে তাড়াতাড়ি বললো–আচ্ছা রাজকুমার, না-হয় এক কাজ করুন, আপনার এদিকের তহশীলটাই না-হয় আমাকে পত্তনি দিন। শুনেছি এদিকের তহশীল কাছারি নাকি একটা ভালো বাংলো। সেটাই পত্তনিদারের বাড়ি হতে পারবে। দিন না।
রাজু বললো–শুনেছি, উচ্চ অভিলাষ মহত্ত্বের ভিত্তিভূমি। আমি ভুল করেছি। সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিলো এতদিন কোথায় ছিলে, কেনইবা তেমন না বলে চলে গেলে?
রাজু, মানুষ শুধু কি বেড়াতে যায় না?
নয়নতারার চোখের কাছে কি ছায়া পড়লো? কিন্তু হাতির চলার একটা দোলা লাগলো কিনা-লাগলো, নয়নতারা হাসলো। আর তখন মনে হলো তার মতো চোখকেই খঞ্জন আঁখিও বলা যায়।
সে বললো–ওটা কী? বিল? কী সুন্দর যে! যদিনা-হাসেন বিল সম্বন্ধে আপনাকে একটা কথা বলি।
রাজু সম্মুখে চাইলো। দিগন্তের নীল রেখাটা যা বনে জন্য বিচ্ছন্ন হওয়ায় আরে বেশি বাঁকা মনে হচ্ছে সেটা মেঘ নয়।
নয়নতারা বললো–বিল নাকি কচ্ছপের মতো চলে বেড়ায়।
রাজু হো-হো করে হেসে উঠলো।
এদিকে বর্ষা মেই, তবু কখনো কখনো বিলের জল বেড়ে ওঠে, তা থেকেই মনে হয় বিল গুটিগুটি এগোচ্ছে। তা থেকেই এই প্রবাদ। আসলে হয়তো তা মরা নদীর খাত বেয়ে উত্তরের বর্ষার জল এসে পড়ার ফলেই।
এই বললো– নয়নতারা কিন্তু ভাবলো, এখানে রাজকুমারের সামনে কখনই দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলা উচিত হবে না।
হাতি এগিয়ে চললো।
নয়ন বললো–রাজকুমার, গরম লাগছে।
–তা লাগতেই পারে। এই খোলা হাওদাটা মহিলাদের জন্য নয়।
নয়ন এদিক ওদিক চেয়ে একটা বড় গাছ দেখতে পেয়ে মাহুতকে সেদিকে হাতি নিতে বললো। ছায়ায় জিরিয়ে নেওয়া দরকার। সেখানে হাতি পৌঁছলে নয়ন বললো– হাতিকে বসাতে। হাতি বসলে জানালো তার পিপাসা পেয়েছে। রাজু কিছু বলতে গেলে সে গলা নামিয়ে বললো–ভুল যা করেছি করেছিই, তুমি জল না-খেলে আমি খাই কী করে?
এটা একটা সাধারণ কৌশল যা মহিলারা অবলম্বন করে। আহার্য ও পানীয় তোত রাজবাড়ি থেকেই এসেছে। মাহুতকে যথেষ্ট খাবার দিয়ে তাকে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিলো। সে কিছু দূরে আড়ালে গেলে নয়ন বললো–রাজকুমার বন্দুক ধরে থেকে তোমার হাতে তেলকালি। এসো আমি খাইয়ে দিই।
রাজু অবাক হলো। সত্যি নয়নতারা তার মুখের কাছে খাবার তুলে ধরলো। যেন অভিমান হবে রাজুর। যেন জিজ্ঞাসা করবে–তাহলে এতদিন? কিন্তু নয়নতারা বললো–একটু তাড়াতাড়ি, মাহুতটার খাওয়া তাড়াতাড়ি হয়ে যেতে পারে।
রাজুর খাওয়া শেষ হলে তবে হাতি উঠলো। মনে হতে পারে এটাই সব চাইতে মূল্যবান–অন্তত এটাই অন্যতম কারণ যার জন্য নয়নতারা আজ শিকারে এসেছে।
এক কৌতুকের ব্যাপার হলো। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দেখা বিলের বাঁক। তার একাংশ যখন প্রায় দিগন্তরেখায়, অন্য অংশ তখন হঠাৎ একেবারে চোখের সামনে খুলে গেলো। হাওদা পিছন দিকে ঝুঁকে ছিলো বলে অনুমান হচ্ছিলো বটে হাতি উপরে চড়ছে, নতুবা ঘাস, কাশ, নল, মাঝে মাঝে শিমূল, বাবলা, কচিৎ অশ্বত্থ হিজল, কদাচিৎ কিছু দূর ধরে বেতজঙ্গল, সব জায়গাতেই হাতির উচ্চতার তুলনায় সমান উঁচু বন।
ডানদিকে গড়ানে জমি শ্যাওলা জমেনি এমন জলের দিকে নেমে গিয়েছে। পারে এক অল্পবয়সী বট, যদিবা মানুষের অনুপাতে তাকে বিশেষ বৃদ্ধই বলতে হয়। বটের একটা ডাল জলের উপরে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। ডালটাকে অতদূর এগিয়ে যেতে দেওয়ার সুবিধা, করে দিতেই যেন জলের একেবারে ধার ঘেঁষে একটা মাঝারি মোটা বট। এগিয়ে যাওয়া । ডালটা থেকেও অনেক ঝুরি জলের উপরে জালের মতো ছড়িয়ে তাছে অথচ জল বলেই যেন আরো নামছে না। তেমন একটা ঝুরিতে একটা মাছরাঙাকে দেখতে পাওয়া গেলো। দেখতে দেখতে সোনা লাল সবুজের ঝিলিক দিয়ে এক পাক উড়ে ঝুপ করে জলে পড়ে আবার ঝুরিতে এসে বসলো। তখন দেখা গেলো কালো কালো গলা দিয়ে জল সেলাই করছে। অনেক পানকৌড়ি। তাদের কার্যকলাপই ছিলো মাছরাঙার নিশানায়।
