একটা হুঁই-হাঁই শব্দ শোনা গেলো একবার। হাতি এগিয়ে চললো। হঠাৎ দেখতে পেলো। রাজু বাগানটার পাশ ঘেঁষে রাস্তা যেখানে মোড় নিচ্ছে সেদিকে একটা পালকি বাগানের গাছগুলোর ফাঁক থেকে বেরোচ্ছে। সেই পালকিটাই বটে। ভাবলো রাজু, রাজবাড়ি থেকে কেউ ফরাসডাঙায় যাচ্ছে পালকিতে। হয়তো তা রানীর শিবমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত কোন ব্যাপারে। কিন্তু কিছুদূর যেতে না-যেতেই হাতিকেই থামতে হলো। কী মুশকিল! পালকিটা পথের উপরে নামানো। এমন ছুটে চলেছিলো সেটা যে ইতিমধ্যে শীতের দিনেও গামছা ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে বেহারারা। তাদেরই একজন পথের ঠিক মাঝখানে হাতিকে দেখামাত্র হাত তুলে দাঁড়ালো।
কী ব্যাপার? বললো– রাজু-যেন শীতের রোদে ভিরমি!
কাছাকাছি এসে মাহুত জিজ্ঞাসা করলো বেহারাটি কিছু বলবে কিনা।
বেহারা বললো–হুঁজুরের খাবার আর জল।
খাবার? বিরক্ত রাজু জিজ্ঞাসা করলো।
বেহারাটির মুখ শুকিয়ে গেলো। মাহুত দ্বিধা করতে লাগলো। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই এরকম ভঙ্গিতে রাজু বললো–তুলে লও। বেহারা ভয়ে ভয়ে পালকির দিকে এগোলো। আর ঠিক তখনই পালকির দরজাটাও খুললো।
মোটা একটা রেশমের চাঁদরেই বটে–মাথা, মুখ,কাঁধ ঘিরে ঘেরাটোপের মতোই। কিন্তু নামতে দেখে, দাঁড়াতে দেখে রাজুর সন্দেহ রইলো না। রাজু কিছু বলার আগেই নয়নতারা বললো–মই আনেননি তো? এখন? নাকি হাত ধরবেন?
–কিন্তু
নয়নতারা হাতির গা ঘেঁষে হাত উঁচু করে দাঁড়ালো।
একটু টানাটানি করেই তুলতে হলো। হাতি বসলো। হাতির পিছনের পায়ের উপরে উঠে দাঁড়াতে হলো নয়নতারাকে। পালকি ফিরে গেলো। হাওদার আসনে বসে অবগুণ্ঠন একটু সরালো নয়নতারা। হাঁপাতে হাঁপাতে হাসলো। বললো–বাব্বা, কী ভয় লেগেছিলো!
রাজচন্দ্র বললো–কিন্তু, নয়ন
নয়নতারা তাড়াতাড়ি নিঃশব্দে আঙুল দিয়ে মাহুতকে দেখালো। যেন সে বলতে চায় লোকটির কান আছে, কৌতূহল সেকানকে বরং সজাগ রাখবে। কিন্তু তখনকার দিনে এমন একটা প্রসিদ্ধি ছিলো যে যখন এরা তাড়াতাড়ি নিজেদের মধ্যে একটু বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলে তার সবটুকু বেহারা বা মাহুতরা বোঝে না। আন্দাজ কি করে না? করে, এবং তাতেই তো নানা রূপকথা ও কাহিনীর সৃষ্টি।
কিন্তু কীসের? আমি কি এর আগে কোনোদিন হাতির দশ হাতের মধ্যেও গিয়েছি? আর এ একেবারে তার গায়ের উপরে দাঁড়ানো!
রাজচন্দ্র কিছু ভাবলো।
নয়নতারা বললো–গল্পটা বলবো? টেনে তুলতে পারবেন ভাবিনি।
–তার আবার গল্প কী?
নয়নতারা একটু হাঁপাচ্ছে। সেজন্য ঠোঁটের ফাঁকেও নিঃশ্বাস নিচ্ছে, দাঁতের নিচে জিভের লাল ডগার আভাস যেন চোখে পড়বে। নয়নতারা বললো–ঠাকুমারদের মুখে শোনা। বাল্যবিবাহ খুব খারাপ জিনিস, জানেন? ছোটো ছেলেমেয়েরা ব্রতর কীই বা বোঝে তাই ঠাকুমার দুপাশে বরকনে শুয়ে থাকে। এদিকে তাদের ভারি ইচ্ছা গল্পগাছা করে। একবার সারাদিন দুজনায় পরামর্শ হলো। ধনুকের ছবি দেখেছেন? কাঠের দুকোটি উপরের দিকে বাঁকানো থাকে না? গভীর রাতে ছেলেটি ঠাকুমার গায়ের উপর দিয়ে ধনুকের কাঠটিই এগিয়ে দিলো। মেয়েটি ধনুকের এক কোটির ভঁজ নিজের কোমরের নিচে দিয়ে এমনভাবে রইলো যে ভারটা এদিক ওদিক না হয়। তারপর ধনুকের অন্য ডগা ধরে ছেলেটি ধনুক তুলতে শুরু করলো। কপাল আর কাকে বলে! অনেকটা উঠেছে মেয়েটি, আর একটু তুলে ঘুরিয়ে নিতে পারলেই হয়। মচ করে একটা শব্দ। ধনুকটার মাঝখানটায় ভেঙে গেলো। ঠাকুমারা এমনি ঠাকুমা হয় না। সবই বুঝলো সে। বললো–আউর কুছ দের বা। এই বলে বুড়ি পাশ ফিরে ঘুমো।
রাজু অনুভব করলো গল্পটা আশ্চর্য রকমে বলা হয়েছে। এক মুহূর্ত যেন মাধুর্য অনুভব করে পরে সে হাসলো। বললো–এবার সংগ্রহ করা নাকি?
নয়নতারা বললো–ঠাট্টা মনে করলেন?
না।
–কেমন টেনে তোলার গল্প নয়। উদ্বহন। উদ্বাহ।
সন্দেহ কী? ধনুকের ডগায় কনেকে তুলে আনার শক্তি না-হলে বিয়ে হয়নি মনে করতে হবে। কিন্তু নয়ন
কী?
এদিকে দ্যাখো কী করে ফেলেছো!
বটে?
কারো হাত যে টেনে তোলার মতো শক্ত তা প্রমাণ করে ফেলেছে।
নয়নতারার মুখের খানিকটা রক্তাক্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু সে ঝটিতি বললো–সেজন্যই তো ব্রহ্মময়ীর আসা যাওয়া। জানেন, ব্রহ্মময়ী কিন্তু বেশ অঙ্কের ধাঁধা বানাতে পারেন!
–অঙ্কের ধাঁধা?
বেশ একটা কৌতুকের ব্যাপার ঘটলো। ঘটকী ব্ৰহ্মময়ী একটা অঙ্কের হিসাবই বলেছিলো বটে। সেটাই মনে এসেছিলো নয়নতারার। যখন সে প্রায় বলে ফেলেছেন হঠাৎ সম্বিৎ পেয়ে থামলো সে।
-কই, বললে না?
নয়নতারা তাড়াতাড়ি বললো–আচ্ছা, রাজকুমার, আপনি যে একবার পিয়েত্রো বুজরুকের সঙ্গে শিকারে গিয়েছিলেন সে কী এই পথ? সামনে ঘাসের জঙ্গল। হাতিটাও পথ চেনে যেন। রাতে যেমন ভূতের গল্প, এ জঙ্গলেও শিকারের গল্প তেমন।
রাজু বলতে যাচ্ছিলো, বাব্বা, কোথায় ঘটকীর অঙ্কের ফাঁদ আর কোথায় শিকারের গল্প, কীসের জঙ্গলটা তারও নজরে পড়েছে। বুজরুক পিয়েত্রোর সঙ্গে সে শিকারে গিয়েছিলো এমনই ঘাসের জঙ্গল পার হয়ে। সে দৃশ্যটা–যা দুটি অত্যন্ত প্রিয় মানুষের স্মৃতিতে জড়ানো তা ভোলার নয়, আর এখন তা মনে করাই হচ্ছে। রাজচন্দ্রর উজ্জ্বল মুখের উপরে একটা হালকা ছায়া পড়লো যেন।
তা দেখে নয়নতারা সময় নিয়ে পরে বললো–বাহ্, আমার শিকারের গল্পটা কী হলো? রাজু বললো–তোমাকে বরং একটা মজার কথা বলি। জানো নয়ন, পিয়েত্রো আর বুজরুক দুজনেই আমার চাইতে বয়সে বড়ো ছিলেন। সুতরাং তাদের কাল আর আমার কাল এক হতে পারে না প্রকৃতপক্ষে। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়
