শোবার ঘরে ঢুকলো সে। পেটাঘড়ির শব্দ তাকে অন্যমনস্ক করেছিলো। সম্ভবত সেজন্যই ব্যাপারটা ঘটলো। সে যখন দেয়াল-আলমারি খুলে গুলির বেল্ট একটা বেছে নিয়েছে তখন তার চোখে পড়লো পালঙ্কের ওপারে ফ্রেঞ্চ উইনভোটা খোলা, তার ওপারে ঝুলবারান্দায় কেউ যেন দুহাতে কান চেপে ধরে ঘরের দিকে পিছন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো ঝি কি? কিংবা হৈম? এই ভেবে সে চোখ সরিয়ে নিতে গেলো, কিন্তু মস্ত এলোখোঁপা, এবং খোঁপার নিচে সাদা ঘাড় তাকে আকৃষ্ট করলো। আর ডালিমফুলী শাড়িটাও। রাজুর বুকের ভিতরে—
রাজু তাড়াতাড়ি আলমারির পাল্লা বন্ধ করলো। বললো–ও, তা, শব্দটা কি এখনো লাগছে কানে?
যে মুখ ফিরালো সে নয়নতারাই বটে।
হাসি হাসি মুখে সে বললো–আপনাকে দেউড়িতে দেখেই এসেছিলাম, রাজকুমার। ঝুলবারান্দায় এসে পুকুরে মাছধরা চোখে পড়লো। ঘড়ির ওই রাক্ষুসে শব্দ না-হলে পায়ের শব্দ কানে যেতো।
রাজচন্দ্র ঝুলবারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে খিড়কির পুকুরের জলে নৌকো, জাল টানছে জেলেরা। তীরের গাছগুলোর ফাঁকে রোদ। চিল ও বক উড়ছে, মাছ চমকাচ্ছে, মাছরাঙা ঝুপ করে জলে নেমেই উড়ে যাচ্ছে আবার। কিন্তু এই মসলিন ডালিমফুলী!
সেদিকে পিঠ দিয়ে নয়নতারা রাজুর দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো।
সে বললো–অনেক বেলা হলো। এ পোশাকগুলো এখন পাল্টালে হয় না? তার জ্ব কিছু বাঁকা হলো।
-অহো, বিস্ময়! তুমি কী আমার খানসামাকে বরতরফ করেছো ললনা? কিংবা এই জানলাম হৈমী নাকি তদারক করে। ইতিমধ্যে সে কোথায় গেলো?
-এটা কী রকম হলো? ডানকানের কাছে গিয়েছিলেন নাকি সকালে?
-তার কাছে? রাজু বিস্মিতই হলো। পরক্ষণেই ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে বরং হাসিমুখেই বললো–তোমার কি ধারণা একজন রাজকুমারকে সামান্য মদের জন্য নিজের ঘরের বাইরে যেতে হয়! রূপচাঁদ পর্যন্ত জানে ডানকানটা হুইস্কি আর রম ছাড়া কিছু চেনে না।
বলতে চান এমন ভাষাই আজকাল স্বাভাবিক?
–এই দ্যাখো। রাজকুমারের ভাষা একটু পৃথক হবে না?
নয়নতারা যেন নিজেকে সামলে নিলো।
রাজু ঝুলবারান্দা থেকে ঘরে ফিরলো। দেয়াল-আলমারিটা খুললো। র্যাকের গায়ে রাখা বন্দুকগুলোর বাড়তি আরো দু-একটা সেখানে। কাগজের কাঠের বাক্সে গুলি। রাজু চামড়ার বেল্টটাতে কিছু গুলি বসিয়ে নিলো।
পিছন পিছন এসে নয়নতারা রাজচন্দ্রকে লক্ষ্য করছিলো। বললো–সময়মতো স্নানাহার করাটাকে কি আজকাল অন্যায় মনে হয়?
রাজু বললো–রূপচাঁদ নালিশ করেছে বুঝি? হতভাগাটার বাড় হয়েছে বিশেষ। ভেবেছিলাম আজ ও সঙ্গে যাবে। ওকে না-নিয়ে শাস্তি দিতে হচ্ছে।
নয়নতারা বললো–আপনি কী শিকারে যাবেন এখন? তা হলে কথা ছিলো।
–শিকার থেকে ফিরে এসে হয় না?
নয়নতারা ভাবলো। তার হাসি হাসি ঠোঁটের একটা কোণ দাঁতের ডগায় চাপা।
সে বললো–অনেকদিনের কথা তো, হয়তো প্রতিশ্রুতিটা মনে নেই।
রাজু একটা বন্দুক বাছাই করে র্যাকের কাছে থেকে সরে এসে বললো– বলল কেকয়কন্যা।
সে রুমাল দিয়ে বন্দুকের চোং মুছলো। তেলকালিতে রুমালটা বিশ্রী হতেই অ্যাঃবলে রুমালটাকে মেঝেতে ফেলে দিলো।
নয়নতারা বললো–আজ আমি শিকারে যাবো।
-তুমি? রাজু হাসিমুখে বললো–হা, অনেক অনেকদিন আগে এমন কথা ছিলো বটে। –হো-হো করে হেসে উঠলো সে। সেই পুরনো পরিস্থিতিটাকে মনে এনেই যেন। বললো–কিন্তু, না আজ হয় না, অন্তত।
-এতে আর এমন চিন্তার কী আছে? টোপর-হাওদা দিতে বলুন। আমি রানীমাকে বলে আসি।
রাজচন্দ্র উঠে দাঁড়ালো সেই ভঙ্গিতে নয়নতারার প্রস্তাব নাকচ করে।
-কিন্তু স্নানাহারও হলো না। একবেলায় কখনো বিলমহলের কুমীর মেরে ফেরা যায় না।
রাজচন্দ্র দরজা পার হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হালকা গলায় বললো–স্নান সকালেই হয়। আর মাঝে মাঝে একবেলা না-খেলে মানুষের ক্ষতির চাইতে লাভই বেশি হয়ে থাকে।
হঠাৎ একেবারে ঘরটা শূন্য হয়ে গেলো এই অনুভূতি নিয়ে নয়নতারা ধীরে ধীরে রানীর মহলের দিকে চলে গেলো।
পিয়েত্রোর বেঁটে হাতিটাকে ওরা হাওদার সাজিয়ে এনেছিলো। কিন্তু পাইপ ধরানোর অজুহাতে রাজু খানিকটা সময় যেন অপেক্ষা করলে প্রথমে গাড়িবারান্দায়, তারপর হাতি যেখানে দাঁড়িয়েছে সেই চবুতরায়। কিংবা রোদটাই কি ভালো লাগলো? অবশেষে সে নয়নতারার চমকে দেওয়া শিকারে যাওয়ার প্রস্তাবের রসিকতাটাকে মনে করে হাসিমুখে হাতিকে বসতে বলার ইঙ্গিত করলো। কিন্তু এবার হাতিকেই একটু দেরি করতে হলো, কারণ তখনই অন্দরমহলের থেকে একটা ছোটো পালকি বেরিয়ে হাতির সম্মুখ দিয়ে আড়াআড়ি পার হচ্ছে। এটা সাধারণ পালকি। সাধারণ কোনো পুরস্ত্রী রাজবাড়ির বাইরে যেতে ব্যবহার করে থাকে। পরে হাতি যখন নিজের পথ নিয়েছে সে ভাবলো একবার, এটা কেমন হয়ে গেলোনা? নয়নতারাকে কুশলপ্রশ্নই করা হলো না। আজই তো প্রথম দেখা হলো কতদিন পরে। কতদিন হবে? গোটা বর্ষাকালটাই নয় কি? এবং শরৎও। আট-দশ মাস কম করেও; প্রায় বছরই ঘুরে আসে।
গ্রামের বাইরে এখন ক্রোশটাক পথ চলে এসেছে হাতি। পথটা এখানে ঘুরে গিয়েছে। একটা ফলের বাগানকে বেষ্ট করে। বাঁশের অনেক কঞ্চি এদিকে এমন ঝুঁকে রয়েছে যে হাওদায় লাগছে। মাহুত ধারালো দা দিয়ে কখনো কখনো পথের উপরে ঝুঁকেপড়া সেই বেয়ারা কঞ্চি কেটেও দিচ্ছে। ফলের বাগানের বেড়া সব সময়ে রাখা যায় না। গাছ বড়ো হয়ে গেলে সেটাকে নতুন করে দেওয়ার চেষ্টাও থাকে না। বাগানের গাছগুলোর নিচে নিচে বরং পায়ে চলা পথ।
