রাজু লক্ষ্য করেছিলো যেন রামধনুরই একটা টুকরো, যা তার জুতোর উপরে, পাইপধরা হাতের উপর দিয়ে সোফায় গিয়েপড়েছে। সেই বর্ষীয়সী এবং রানী আলাপ শুরু করলেন। রাজু তখন রামধনুর উৎস খোঁজ করলো। এই সিদ্ধান্ত হলো তার, সিলিং-এর বেলদার ঝড়ে সূর্যের আলো পড়েই এমন হয়েছে। চুলের ঝাপটায় নিচে চোখ দুটি নয়নতারার নয়? চিবুকের তিল, যা আঁকা মনে হয়, হৈমীরই হবে।
বোধহয় রানী বলেছিলেন রাজু, তোমাদের স্কুলের নতুন মাস্টারমশাই নিয়োগীর বোন উনি।
রাজু নিজের হাতের পাইপের বউল থেকে ওঠা অলস ধোঁয়াটাকে লক্ষ্য রাখছিলো। আর কী কথা হয়েছিলো সেখানে?
রানী কী বলেছিলেন? -ইনি তোমার বিয়ের সম্বন্ধ এনেছেন একটি। বোধ হয় এমন কিছু বলে থাকবেন। তারপর তিনি বললেন–তোমার স্নান হয়নি রাজু? হৈম, তুমি একটু দ্যাখো তো।
রাজু উঠে এসেছিলো সে ঘর থেকে।
নিজের মহলের যাওয়ার অলিন্দ দিয়ে চলতে চলতে রাজু একবার পিছন ফিরে চেয়েছিলো। সে দেখেছিলো হৈমী পিছন পিছন আসছে। তাহলে সেই কি কিছুদিন যাবৎ রূপচাঁদের পিছনে থেকে তার স্নানাহারাদির ব্যাপারে তদারক করছে?
রাজচন্দ্র স্নানে গেলে সেই দরবার আরো কিছুক্ষণ চলেছিলো। তারই একসময়ে মহিলাদের একজন বলেছিলো, কনের গড়ন কী রকম? বয়স তো যোলো বললেন। আমাদের হৈম, কিংবা নয়নতারা এদের পাশে কি দাঁড় করানো যাবে? যিনি গেলেন তিনি হৈম, আর ইনি নয়নতারা।
নিয়োগীর বোন বললো– একটু ভেবে–যে বয়সের যা। পনরো যোললা বছরের মেয়ের গড়ন হাল্কা হবে এঁদের চাইতে।
-খুব ছেলেমানুষ ছেলেমানুষ দেখাবে না তো?
বিদ্যাপতির সেই অল্পবয়সী বালা শুনেছেন তো?
গম্ভীর রানী বললেন–আচ্ছা, এখন এই পর্যন্ত। তিনি উঠলেন। বললেননয়ন, তুমি একটু কষ্ট করো, বাছা। এঁর জন্য পালকি জোগাড় করে দাও। আর তারপর আজ তুমি আমার ঘরে খেয়ো। দুপুরে তোমার সঙ্গে কথা আছে।
রানী চলে গেলে ঘটকীকে নিয়ে নয়নতারা বার হলো ঘর থেকে। দোতলা থেকে একতলায় পৌঁছনোর আগেই একজন পরিচারিকাকে দেখতে পেয়ে পালকির ব্যবস্থা করে ফেলো। বলে দিলো, আমরা নিচের হলঘরে দাঁড়াই। পালকি এলে খবর দিও।
নিচের হলঘরে পালকি আসার আগে ঘটকী বললো–দেখুন তো কী কথা! যোলো বছরের মেয়ে যত সুন্দরীই হোক, আর এ মেয়ে সুন্দরী কিনা তা আপনারা যাচাই করুন, কিন্তু যোলো বছর কখনো পঁচিশের রূপ হয়? কথায় বলে কুঁড়ি আর ফুল।
নয়নতারা হেসে বললো–তাতে আর কী হয়েছে? বিয়েতে লাখ কথা খরচ হয় শুনেছি। রানীমার সঙ্গে আপনার পাঁচশো কথাও হয়েছে কিনা সন্দেহ। আপনি কনের চিত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
ঘটকী বললো–আসল ব্যাপার কী, টকটকে একটা লাল গোলাপ সব পুরুষের চোখেই পড়ে, তার পাশের ছোটো কলিটা তখন নজরে আসে না। কিন্তু আমাদের রাজকুমার তো বছর বিশ বাইশ হবেন। যোলোর বেশি কী করে মানাবে তার সঙ্গে? পুরুষের বিশ বাইশ আর স্ত্রীলোকের পঁচিশ-ছাব্বিশে তেমন তফাত থাকে না। কিন্তু পুরুষের ত্রিশ আর স্ত্রীলোকের তেত্রিশ-চৌত্রিশে? তখন তফাতটা আগের চাইতে বেশি মনে হয় না? তারপরেও পুরুষের যখন চল্লিশ তখন চুয়াল্লিশ বছরে স্ত্রীলোক তো বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছে। সে কী চল্লিশ বছরের পুরুষের কাছে বোঝা হয়ে পড়ে না?
নয়নতারা বললো–এসব আমি ঠিক বুঝি না।
ঘটকী হেসে বললো–তাহলেও, রানীমা, আপনার কথাকেই মূল্য দেন আমার মনে হলো। কথাটা ভেবে দেখুন। এই হৈমীসুন্দরী, খুব সুন্দরী, আহা বেচারা বিধবা। এমন রূপ রাজকুমারদের পাশেই মানাতো। আমি শুধু মানানোর অর্থে বলছি। কিন্তু এখন থেকে বিশ বছর বাদে চল্লিশ-বেয়াল্লিশে আমাদের এই রাজকুমার তো যুবকই থাকবেন। কিন্তু হৈমীর মতো একজন কী তখন পাপড়ি ঝরে-যাওয়া ফুলের মতো হবেন না?
যেন নয়নতারার মুখই শুকিয়ে উঠেছিলো। এমন অনুভব করেই সে বললো–আমি তো বললুম আমি বুঝি না। আর রানীমার কাছে আপনার এসব যুক্তিও আমি তুলতে পারি না। এ বাড়িতে তেমন প্রথা নেই।
ঘটকীর কথাগুলি অত্যন্ত হিসাবী, যেনবা দোকানে শোনা যাবে এমন। কিছুদিন আগেও, সেসব গল্প যদি সত্যি হয়, ক্রীতদাসী বিক্রি হতো। সেই বাজারে যাদের আনাগোনা ছিলো তারা এমন সব হিসাব করতে কিনা ক্রীতদাসীদের বয়স নিয়ে তা বলা সহজ হচ্ছে না। সত্যর মতো এমন রূঢ় আর কী?
.
০৩.
সে যাই হোক, আমরা রাজকুমারের কুমীর শিকারের গল্প বলতে যাচ্ছিলাম। কেটকে এক রবিবারে যা সে বলে এসেছিলো। আজ আবার রবিবার।
সংবাদটায় ভুল নেই। বেশ বড় কুমীরই। বিলে মানুষ নামে জলের জন্য, স্নান করতেও; মাছনা ধরলে চলে না; তাছাড়া গোরু বাছুর বিলের মাঝে মাঝে জেগে থাকা ডাঙায় ঘাসের লোভে জল পেরিয়ে যাওয়া-আসা করে। যা রটেছে তা সত্য হলে পাঁচ-সাতটি গোরু-বাছুর খোয়া গিয়েছে ইতিমধ্যে এবং একজন মানুষ।
রাজচন্দ্র কর্মচারীটিকে বললো–এদের যেতে বলে দাও, জলযোগ করিয়ে দিও। পিলখানায়, পিয়েত্রোর হাতিটাকে দিতে বলো তার মাহুতকে। আজই কাজে লেগে যাক।
রাজচন্দ্র যখন নিজের মহলে ঢুকছে তখন দেউড়ির পেটাঘড়িতে এগারোটা বাজতে শুরু করলো। শব্দ তার উৎসর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে । কিন্তু ততক্ষণে রাজু যেখানে পৌঁছেছে সেখান থেকে দেউড়ি চোখে পড়ার কথা নয়, বরং শব্দটা খুঁজতে গিয়ে একটা টুকরো গোলাপী দেয়াল চোখে পড়লো তার। এটার প্রয়োজনীয়তা কী? এটা ছাড়া কি এতদিন ল্যান্ডিংটাকে ন্যাড়া মনে হতো–এই চৌকোন খাড়া দেয়ালটা ছাড়া? এটা নতুন দেখছে সে ফিরে।
