দরজার কাছে কেট বললল–এখন কোথায় যাবেন?
বিলপাড় থেকে ওদের আসবার কথা। গোটাকয়েক কুমীর নাকি ভারি উপদ্রব করছে। শিউরে উঠলে তো? যদি পাই চামড়াটা তোমাকে উপহার দেবো। এতদিন তো ক্রোকোডাইল নামটাই শুনেছো।
রাজকুমার, ক্রোকোডাইল মানুষের ক্ষতি করে না?
রাজু হেসে বললো–শক্ত চোয়ালে দুসারি ছুরির ফলা। সেই চোয়ালে মানুষকে ধরে জলের তলায় নিয়ে শুধু কি চুম্বন করে?
সদরদরজার আড়কাঠে বাঁধা লাগাম খুলে ঘোড়াটাকে সড়ক অবধি হাঁটিয়ে নিলো রাজু। ঘোড়াটা নতুন। গাঢ় খয়ের রং। আর বেশ উঁচু।
রাজু রাস্তা বরাবর চেয়ে হাসিমুখে ভাবলো, ও ব্যাপারে সে কেটের কাছে ঠকেছে–ওই জীবন-মৃত্যুর কথায়। নির্জন, সব সময়ে মেঘ আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার একটা দ্বীপের কথাই মনে হলো। নিঃসঙ্গ নয়? খুবই নিঃসঙ্গ, নিকটজন কয়েকজন থাকা সত্ত্বেও কেন ঠিক বলা যায় না বটে, কিন্তু বেঁচে থাকতেই হয়। আমাদের চিন্তাভাবনা সত্ত্বেও, জীবনের যেন নিজস্ব একটা টান আছে। মনে হয় যার জীবন আর যে ভাবে তারা এক নয় যেন।
তার মুখের হাসিটা সরে গেলো।
কেট রাজকুমারের পাশে পথের উপরে এসে দাঁড়িয়েছিলো। এমনটা সেবাগচীর জন্যও পারতো না। (সে অবশ্য এটাকে চিন্তাতেও আনলোনা)। ঠিক এ সময়ে সে নিজেকে অত্যন্ত দুর্বল বোধ করলো। সে রাজকুমারকে কিছুতেই বিপজ্জনক কুমীরগুলো থেকে দূরে রাখতে পারে না। কোনো জোরই নেই।
সামনে দিকে চাইতেই সে দেখতে পেলো, একজন তাদের দিকে হনহন করে আসছে। দূর থেকে তাকে ইউরোপীয় পোশাক পরেছে মনে হয়। কারো কারো হাঁটায় এমন বৈশিষ্ট্য থাকে যে তা-ই তাকে চিনিয়ে দেয়।
কেট বললো– রাজকুমার, স্কুলের নতুন ইংরেজি মাস্টারমশায় কী আপনাকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলো?
রাজুও সামনের দিকে চেয়েছিলো। বললো–কে, মিস্টার নিওগি? তিনিই তো আসছেন মনে হচ্ছে। এবং যথারীতি খুবই ব্যস্ত।
কেট বললো–ভদ্রলোক যেন সব সময়েই সময়ের অভাবে বিব্রত।
রাজু হেসে বললো–দুষ্টুমেয়ে, তা তুমি ওঁকে বলতে পারো-আমার এত সময় আছে, তা থেকে ওঁকে আমি বেশ কিছুটা দান করতে পারি।
রাজচন্দ্র সওয়ার হতেই ঘোড়া চলতে শুরু করলো।
কেট ততক্ষণই দাঁড়িয়ে রইলো যতক্ষণ ঘোড়া এবং সওয়ার অদৃশ্য না হলো। তারপর সে আবার বসবার ঘরেই ফিরলো। এখন তার কাজ আছে বটে লাঞ্চের জোগাড় করতে হবে। তাহলেও একটু বসে নিতে পারে। উলকাঁটার ঝুড়িটাকে সে কাছে টেনে নিলো।
মিস নাইটিঙ্গেলের কথাই কি সে ভাবছিলো? সে আর কোনোদিনই হয়তো ইংল্যান্ডে যাবে না, কিন্তু মে-ফেয়ারের এই মহিলার ব্যাপারটা কিন্তু ভারি কৌতূহলের।
কিন্তু রাজকুমার? (যেন সে ঘোড়া এবং তার সওয়ারকে আবার দেখতে পেলো)। তাঁর কথাগুলো কি আজকের সকালের মেজাজই মাত্র? চার্লস ও নেপোলিয়র মৃত্যু নিয়ে বলা কথাগুলো?
এবার তার মনে এলো যা সে যেন মনে মনে খুঁজছিলো। বিষণ্ণ হলো তার চোখ দুটি। সত্যি কি তা মৃত্যুর বীজ হতে পারে?
সিড অব ডেথ যার ইংরেজি হবে? যা রাজকুমারের মনে আছে?
কেটের এখন মনে হলো রাজকুমার এখন ঘোড়াতেই চলেছেন বটে, তা কিন্তু পথের পাশ দিয়ে, আর অমন তেজী ঘোড়াটাও যেন ধীরে চলেছে।
.
০২.
সেদিন শিকার হয়নি, দিন সাতেক পরের এক সকালে দেউড়িতে বিলমহলের লোকেরা রাজচন্দ্রের জন্য অপেক্ষা করছিলো।
কিন্তু তার আগে আর একদিন সেই একজন বর্ষীয়সী স্ত্রীলোক এসেছিলো রাজবাড়িতে। তার কথা বলে নিতে হবে।
দুপুরের কিছু আগে পিলখানা তদারক করে রাজু তখন সবেমাত্র ঘরে এসেছে। পিয়েত্রোর হাতিকে পিলখানায় আনা হয়েছে এখন। এমন সময়ে রানী তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
নিজের বসবার ঘরে ছিলেন রানী। রাজচন্দ্র যেতেই তিনি একটু সরে বসে নিজের সোফাতেই পাশের জায়গাটাকে দেখিয়ে বলেছিলেন বসো, রাজু।
রানীমার আসনের কিছু দূরে গালিচার উপরে একজন বর্ষীয়সী। রানীমা বলেছিলেন–এই আমার ছেলে রাজচন্দ্র, আমাদের রাজকুমার। কেমন, দেখবার মতো হয়ে ওঠেনি?
অথবা এমন কিছুই বলেছিলেন যদি রাজুর স্মৃতিকে আমরা অনুসরণ করি। রাজু তখন লক্ষ্য করেছিলো রানীর এই আসনটা নতুন। বিঘৎ পরিমাণ সিংহ-থাবা পায়ার উপরে নিচু চওড়া সোফা। চাপা রঙের উপরে সবুজ তুলোর পাতা ও ফুল আঁকা ছিটে মোড়া। এসব নিয়েই ব্যস্ত হলো রাজচন্দ্রের মন, এবং তখনই যেন এই গুরুতর সিদ্ধান্ত করলো সে, এটাও সেই বুড়ো চীনাটার কাজ। কিন্তু ততটা নিচু আসনে রাজুর প্যান্ট পরে বসতে অসুবিধা হচ্ছিলো মনে আছে।
এও রাজুর মনে আছে যে সেই বর্ষীয়সীর কপালের উপরে ঘোমটার বাইরে কিছু চুল ধবধবে সাদা, এবং সেই সাদার মধ্যে মোটা করে দেওয়া সিন্দুর। আর সে সাধারণের তুলনায় স্থূলাঙ্গী হওয়ায় তার চিবুক বোধ হয় যাকে জোড়া চিবুক বলে তেমন ছিলো। কতকটা ধানরঙের ত্বক।
সে ঘরে আরো স্ত্রীলোক উপস্থিত ছিলো। তারা বসেছিলো একটু দূরে বরং দেয়াল ঘেঁষে, গালিচার উপরেই, কিন্তু রাজকুমারের দিকে পাশ দিয়ে। ঘোমটায় মুখগুলি আধাআধি ঢাকা, গায়ে চাদর। স্ত্রীলোক কয়েকটি সুরূপা, তাদের নানা বয়স সত্ত্বেও। বিশেষ করে লক্ষ্য না করলেও তাদের কারো কানের গহনায় উজ্জ্বল পাথর, কারো বা কপালের উপরে লতানো চুলের ঝাপটা, কারো চিবুকের তিল চোখে পড়া স্বাভাবিক।
