সে বললো–বেশ, বলুক। এখন তুমি বলো লাঞ্চো কাকে বলে?
–আর, রাজকুমার!
-ঠিক বলিনি তবে? আমার কী হবে? ওদিকে শুনেছিকলকাতায় যেতে হবে কিছুদিনের মধ্যে যেখানে নাকি ওসবই ব্যবস্থা। আমার অবস্থাও দেখছি তাহলে ডানকানের মতোই। সে শুনেছি মনোহরকে মানোআর কালীমাঈকে কুল্লিমাদার, বাঈকে পাই বলে।
-ঠিক শিখলেই বা দোষ কী? কথাটা লাঞ্চ আর এটা ডেস্কো নয় ডেস্ক।
–আর এই কাগজটা টাইমেস নয় টাইমস। অগ্রসর হও। কিংবা থাক। লাঞ্চোর বয়ান একদিন আমাকে শুনতেই হবে, দু-দুবার বড্ড বেশি হবে। কাগজটাই পড়ো।
-কিন্তু কাগজটা তো অনেক পুরনো।
–হায়, বরাননে!
কাগজটা টাইমসই বটে। কেটের বাড়িতে নতুন। হরদয়ালের কাছ থেকে কালই মাত্র সংগ্রহ করেছে বাগচী। এবং তার মূলে লাঞ্চে কীবলের আলাপ। অন্যদিকে কাগজের তারিখটা ছ মাসের পুরনো। ইংল্যান্ড থেকে আসতেই তো সময় নিয়েছে।
এখানে একটা চমৎকার যোগাযোগের ব্যাপার ঘটে গেলো। কাগজের প্রথম পাতার ডান দিকে বিশেষ টাইপে একটা সংবাদ। রাজচন্দ্ৰ আঙুল দিয়ে সেটাকে দেখিয়ে বললো–এখানে নিশ্চয় কিছু মজার খবর থাকবে। ফ্লোরেন্সের খবর নাকি? বাগচী বলছিলেন ফ্লোরেন্স নাকি ভাস্কর্যের পীঠস্থান। সেটা কী ইংল্যান্ডের কাছে? নাকি নাইটইনজেল। দ্যাখোদ্যাখো ঠিক পড়লাম নাকি।
কেট রাজুর কাঁধের উপর দিয়ে ঝুঁকে কাগজ দেখতে শুরু করলো। সে অবাক হলো। নামটা সে-ও এই সেদিনমাত্র শুনেছে কীবলের মুখে। কাগজ খুলে তারই সংবাদ পাওয়া। যাবে ভাবতে অবাক লাগেনা? খবর ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের। অন্যদিকে এতে বিস্ময়ের কী বা আছে! প্রায় ছয় মাসের কাগজ একত্রে। তখনকার ইংল্যান্ডে দু মাসে একবারও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সম্বন্ধে ছোটো বড়ো কোনো সংবাদ থাকবে না এমন সম্ভব ছিলো না।
-লও, পড়ো–বলে রাজু কাগজটা কেটের হাতে দিলো।
কেট কাগজ নিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো। অবাক হলে যেমন হয়, মনে মনে পড়তে ভুলে গেলো। পোপোজ্যাল ফর ওপনিং এ ট্রেনিং স্কুল ফর নার্সের্স আট সেন্ট টমাসেস হসপিট্যাল। (সেন্ট টমাসের হসপিটালে নার্সদের জন্য ট্রেনিং স্কুল খোলার প্রস্তাব)।
বাংলায় বলো। বললো– রাজু।
কেট পড়ে বাংলায় অর্থকরে সংবাদটাকে এইরকম দাঁড় করালো। ক্রিমিয়ার অভিজ্ঞতার পর এই ধরনের প্রস্তাব যা মিস নাইটিঙ্গেলের দূরদৃষ্টি ও সাহসিকতার পরিচয় এবং একমাত্র তার কাছে থেকেই আশা করা যায়। এ বিষয়ে এ রকম মনে করা হচ্ছে স্যার সিডনি হার্বাটের সহানুভূতি পাওয়া যাবে। কবি আর্থার ক্লাপ এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সেন্ট টমাসের এই ট্রেনিং স্কুল যে গোটা পাশ্চাত্য জগতের হসপিটালে নার্সিং-এর ব্যাপারে আমূল পরিবর্তন আনবে তাতে সন্দেহ নেই। মে-ফেয়ারের এই মহিলার অন্যান্য ব্যাপারে যেমন দেখা গিয়েছে নার্স ট্রেনিং-এর ব্যাপারেও নিশ্চয়ই অনেক সদ্বংশজা কুমারী এগিয়ে আসবেন।
রাজু বললো– কী রকম হলো ব্যাপারটা? নার্স কারে কয়? খুলে বলল।
সংবাদটা কেটকেও ভাবিয়ে তুলেছিলো, সে বললো–নার্স মানে জানি, কিন্তু ব্যাপারটা আমাকে হতভম্ব করছে। সদ্বংশের এক মহিলার পক্ষে কেন, কোনো সৎ মহিলার পক্ষেই কি নিজের বাবা ভাই স্বামী ছাড়া আর কাউকে সেবা করা সম্ভব? বলুন, তা যায়? আর তিনি কিনা মে-ফেয়ারের মহিলা!
কেট ভাবলো, কীবল তাহলে উল্লেখযোগ্য খবর হিসাবেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নাম করে থাকবে। কিন্তু এ বিষয়ে আলাপ এগোয় না, কারণ রাজু হসপিট্যাল দেখেনি, নার্স দূরের কথা। কেট রাজচন্দ্রকে বোঝনোর জন্য তুলনা দিলো–মনে করুন মিস নাইটিঙ্গেল নয়নতারার মতোই একজন রুচিবতী সুন্দরী মহিলা, যার স্যার সিডনি হার্বাটের মতো একজন শক্তিশালী বন্ধু আছেন।
রাজু হো-হো করে হেসে উঠলো। বললো–তাহলে আমাকেও তো একটা হসপিটাল করে দিতে হয়। সেখানে একা ফ্লোরেন্স, এখানে তুমি আর নয়ন।
রাজু বললো–দ্যাখো আর কী খবর আছে। চীনের খবর নাকি? টাইপিং কী? বিদ্রোহ বলছেনাকি? তাহলে একপক্ষে চীন? অন্যপক্ষে ইংরেজ নাকি? থাক থাক। কী যেন বললে, স্যার সিডনি হার্বাট না কী? তা তিনি আবার কীসের কারবারী? তুলল, না কয়লা?
-সিডনি হার্বাট বোঝা যাচ্ছে মন্ত্রী। তাছাড়া তিনি নাইট; জানেন রাজকুমার, আমাদের দেশে নাইটদের কিন্তু খুব সম্মান।
বটে? আমি শুনছিলাম তোমাদের দেশে কলওয়ালারাও আজকাল নাইট, লর্ড এসব হচ্ছেন।
বারে কলওয়ালা কি মানুষ নয়?
রাজচন্দ্র দুষ্টুমি করে চোখ সংকীর্ণ করলো, বললো–নিশ্চয়ই, আমারই ভুল। নেপোলিয়নও তো একজন সৈনিক ছিলেন মাত্র। তাছাড়া আমাদের দেশেও এখন অনেক নুনের বেনিয়ান, মুদি ইত্যাদি আকছার রাজা হচ্ছেন। কলকাতা আর লন্ডনে একই রীতি দ্যাখো। সেখানেও কি দশশালা?
খবরের কাগজ পড়া আর হলো না। রাজুর কিছু মনে পড়লো যেন। চেনে ঝোলানো ঘড়িটাকে বার করে সময় দেখে আবার তা জেবে ঢোকালো। এটা নিশ্চয়ই আলাপে একটা ছেদ।
রাজচন্দ্র উঠে দাঁড়ালো। বললো–ওটা আমারই ভুল, কেট। তুমিই ঠিক বলেছো। বেঁচে থাকতেই হয়! নেপোলিয়নও অনেকদিন তার সেই মেঘে অন্ধকার দ্বীপে বেঁচে ছিলেন, বন্দী হয়েও, সেঁকো বিষ সত্ত্বেও।
আপাতত আমি বিদায় নিচ্ছি, স্বর্ণময়ী, হেডমাস্টারকে বোলো আজ যে দাবা খেলার কথা ছিলো সন্ধ্যায় তা হবে না। আজ হৈমী তাস খেলবে বলেছে। তাই সকালেই মিটিয়ে নিতে এসেছিলাম।
