পেয়ালা হাতে নিয়ে রাজু বললো–প্রবন্ধটা শুনলাম, কিন্তু যুক্তিতে আমার সন্দেহ আছে। কেট। আঘাতটা যার সত্যি ভয়ঙ্কর, তাই সেই অবস্থায় সে বোধ হয় বাঁচা-মরার কথা ভাবে না। হয়তো জল চায়, সেটা শরীর; হয়তো বলে শীত লাগছে, সেটা শরীর। বর্তমানটাই তখন তার কাছে প্রবল, যদি তার চিন্তা করার ক্ষমতা থাকেই।
কেট বললো–রাজাও তো মানুষ। তারও শরীর আছে। তারও তো ব্যথা লাগে।
রাজকুমার হেসে উঠলো : এতদিন তুমি তাই জেনেছো? রাজা একটা ধারণামাত্র, তার শরীর কোথায়? সব রাজা জানে না, কিন্তু জানা তো উচিত যে রাজা অনেকগুলি মানুষের স্বাধীনতার ধারণা; শক্তির ধারণা। সেটা গেলে রাজাই-বা কোথায়? শরীরটা? তোমাকে একটা খুব গোপন কথা বলে দিই। তরকারি কাটতে কখনো আঙুল কেটেছো? কিংবা রান্না করতে আঙুল পুড়িয়েছো? গলা কেটে গেলে তার চাইতে বেশি যন্ত্রণা হয় না। কিন্তু তাই বা কেন? সকলে কী চায়, আর রাজা কী চায় তার মধ্যে পার্থক্য থাকবে না? সারা জীবন সকলের থেকে পৃথক, আর মৃত্যুর সম্মুখে একাকার তা হয় না, হলে অন্যায় হবে।
রাজুর হাতে কফির কাপ, সামনে কেট, রবিবারের আবহাওয়াই। তবু মুখটা এমন দেখালো রাজুর যে অনুমান হবে, সে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে।
কেট বললো–এটা একটু খেয়ে দেখবেন? এই বলে সে নিজে হাতে একটা পেস্ট্রি তুলে রাজকুমারের হাতে দিলো।
বললো– আবার–শুনেছি লুই-এর রাজত্বে প্রজার কষ্টের সীমা ছিলো না! জনসাধারণ অত্যাচারী রাজার বদলে নিজেদের শাসন চাইছিলো।
-তোমারও তাই মত? কেক দেখে মনে হচ্ছে? কিন্তু বলো তো আবার নেপোলিয়ন অত সহজে সম্রাট হলেন কী করে? তার অধীনে যুদ্ধ করতে গর্ববোধ করেছিলো তারাই যারা ব্যাস্টিল ভেঙেছিলো। সেই প্রজাদের অত্যাচারী এক দলকে সরানোর ইচ্ছা ছিলো। তাদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। তাদের নিশ্চয় নিজের ইচ্ছাকে কাজে লাগানোর অধিকার আছে। অত্যাচার তাদের অমানুষের স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলো, তাদের ঘৃণায় হিংসায় রাক্ষুসে চেহারা ধরা পড়েছিলো। কিন্তু সেটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। অন্যপক্ষ কী করেছিলো, যা করলে তাদের মানায় তা করেছিলো কি না আমরা এতক্ষণ তাই ভাবছিলাম। রাজা লুই মরতে জেনেছিলো তা মনে করো আবার।
–তাহলে কি বলবো নেপোলিয়ন লুই-এর চাইতে ছোটো ছিলেন?
দ্যাখো, খটকা আছে। তিনি একবার যেমন নির্বাসন থেকে প্যারিসে ফিরেছিলেন শেষ পর্যন্ত আবার তেমন ফেরার আশা করেছিলেন হয়তো। ওদিকে ইংরেজরা যে তাঁকে সেঁকো বিষ দিচ্ছে তা জানতে পারেননি। আমার মনে হয়, ইংল্যান্ডে তখন রানী না থেকে রাজা থাকলে এমন কাণ্ডটা ঘটতো না।
–কি সর্বনাশ!
-কোনটি? সেঁকো বিষ, না মেয়েলি চক্রান্ত? দ্যাখো সেঁকো বিষের কথা বাগচী বিশ্বাস করেন না। আমি করি, কারণ পিয়েত্রো বলেছে বলেও বটে। রাজু হাসলো। বললো, আবার–দূর করো ইতিহাস। তুমি কি মনে করো আড্ডাটা আমাদের পাঠশালা? সেখানে ক্লারাট নেই? আর এখানে তুমি ক্লারাট-গ্লাসের চাইতেও মনোহরা, তোমার কফি এবং পিঠেও। তুমি বোধহয় এদেশী পিঠে খাওনি। এই শীতকাল, নয়নতারার এদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
শুনলাম তিনি গ্রামে ফিরেছেন।
এসেছেন? আর একটু কফি দিই? কেটের মুখ উজ্জ্বল হলো।
–অবশ্যই নয়। বরং ডেস্কে চলো। তোমরা কি ভেবে দ্যাখোনা, কারোই দৃষ্টি নেই যে, কিছুদিনের মধ্যেই এ গ্রামের বইপড়া লোকেরা তোমার স্বামীর স্কুলের কল্যাণে অনায়াসে আমাকে মূর্খ বলতে পারবে। বুঝতে পারছি তুমি আমার প্রেমিকা নও।
-তা আমি জানি। কেট বললো– নতুবা নয়নঠাকরুন যতদিন ছিলেন না তখন অন্তত একবারও দেখা পেতাম। বরং উল্টো।
কেট হাসলো। হাসতে গিয়ে কি তার গালে রং লাগলো? আর সেজন্যই যেন এক মুহূর্ত আগে সে যা ভাবছিলো কথার আড়ালে তা অবিশ্বাস্য হলো। স্বভাবতই চিন্তাটা মাতৃভাষাতেই হয়। কিংবা তাকে চিন্তা না বলে অনুভূতি বলা সঙ্গত, একটা অনুভূতি যা শব্দের আকৃতি নিচ্ছে। হঠাৎ কথাটা মনে এসেছিলো কেটের নিজের ভাষাতেই-সিড অব ডেথ। এখন আবার রাজকুমারের মুখের দিকে চেয়ে তার মনে হলো তা কি হয়? মৃত্যুর বীজ কি এমন একজনে লুকিয়ে থাকে?
রাজচন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কের দিকে গেলো। তাতে যেন ঘরের আলোটা নড়ে উঠে উজ্জ্বল হলো।
কেট তখন ভাবলো পরের ভাবনাটা। এই যে রাজকুমার বললেন লেখাপড়ার কথা–এর মধ্যে সত্যি কি গ্লানি আছে? গ্রামের কথাই নয়। কলকাতাসমেত গোটা দেশটাকে একটা সমাজ মনে করলে আধুনিক মানুষদের বই পড়াটাই একটা লক্ষণ। রাজকুমার পড়েন না। কিন্তু এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিত কিছু বলতে পারোনা। কথাগুলো কী তার ক্ষোভ প্রকাশ করে? কিংবা সিনিসিজম? যেন কোনো বিষয়েই আস্থা নেই। সেজন্য সবকিছু এমনকী নিজের অস্তিত্বও ঠাট্টার বিষয় হতে পারে।
-আচ্ছা, রাজকুমার, এই বলে সে থামলো। কথাটা গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলো, সুতরাং একটু চেষ্টা করে হেসে বললো, আর কী বলবে আমার স্বামীর ছাত্রেরা?
ডেস্কের সামনে দুখানা চেয়ারে বসলো দুজনে।
কী বলবে? রাজকুমার! আমাদের জমিদার অন্য জমিদারের চাইতে ভালো। রাজচন্দ্র ভাবলো, কেটের জানার কথা নয় জমিদার জাগীরদারে কী তফাত থাকতে পারে, আর এখন তফাতও নেই। এ ভাবটাকে বরং তাড়াতাড়ি অন্য কথার আড়ালে ফেলে দেওয়া ভালো।
