-রোজ হলেও আপত্তি নেই। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয় কী করেন আপনারা আড্ডায়?
রাজু হাসলো–বলতে পারো খুব ভালো ক্লারাট আর সত্যিকারের টার্কিশ। অথবা তোমার জানাই ভালো, কর্তাকে তোমার বিপথে নিচ্ছি না। আপাতত পিয়েত্রোর স্বজাতি অর্থাৎ ফরাসীদের সম্বন্ধে কিছু জানার চেষ্টা চলছে। ভারি কৌতুকের, জানো? পিয়েত্রো ফরাসীদের সম্বন্ধে অনেক কথা আমাকে বলতেন, কিন্তু যাকে ফরাসীদের বিদ্রোহ বলে সে সম্বন্ধে দেখছি বিশেষ কিছুই বলেননি।
–আপনার কি সেসব গল্প ভালো লাগতো? অত রক্ত আর শানানো ধারালো গিলোটিন?
-তা জানতে পারলে গল্পটা অত করে শোনার দরকার হতোনা। আমার তো মনে হয়েছে ওটা এক ধরনের ব্যর্থতা। কিছু পুরনো ধারণা বদলেছে। রাজাকে বরতরফ করে ওরা বুঝতে চেয়েছিলো রাজা আর ঈশ্বর এক নয়। কিন্তু তা বুঝতে অত নরহত্যা দরকার ছিলো না। পিয়েত্রো এজন্যই বোধহয় আলাপে আনতো না ওটাকে।
একটু ভেবে আবার বললো– রাজচন্দ্রকার কোন গল্প ভালো লাগবে তা কি আগে বলা যায়? বেশ লাগে তোমাদের রাজা চার্লসকে। তোমাদের রাজা চার্লস আর ফরাসীদের সেই সব মার্কুইস,কাউন্ট কেউ মৃত্যুভয়ে কাঁদেনি বলেই গল্পগুলো ভালো লেগে থাকবে আমার।
কথাটা শুনে কেট অবাক হয়ে গেলো।
রাজু বললো–তুমি নিশ্চয়ই জানো রানী মারিকে ওর যখন নিয়ে যাবে গিলোটিনে, তখনো কিন্তু তিনি তাঁর সাজপোশাকে ত্রুটি করেননি। তারা কেউ কিন্তু বলেননি, যা করেছি ভুল করেছি। সূর্য-ডোবার মতো ব্যাপার নয়? তেমনি ম্লান হয়ে যাওয়া কিন্তু অনেক রঙের মধ্যে। কোনো অনুতাপ নেই।
এসবই আড্ডার বিষয় নাকি আপনাদের। বিষণ্ন শোনালো কেটকে।
–বিষয়টা দুপক্ষের জানা না থাকলে কী আলোচনা হয়? বাগচী বলেন, আমি শুনি। এলোপাথাড়ি প্রশ্ন করেকখনোতার অসুবিধা ঘটাই। ভেবেছো তার সঙ্গে আমার মত মেলে? তার কাছে সব ব্যাপারটাই খারাপ। মানুষকে সমাজের চাপে বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয়েছিলো। তারা যখন চাপ থেকে বেরিয়ে এলো তখন তাদের স্বভাবতই বিকলাঙ্গ সুতরাং কুৎসিতই দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু ভেবে দ্যাখো তোমাদের রাজা চার্লস ফরাসীদের রাজা লুই আর এদেশের রাজা বাহাদুর শা-এর মধ্যে কত তফাত! শুনেছি সে বুড়ো। জীবন ভোগ করার কোনো ক্ষমতাই আর নেই। কিন্তু মরতে জানলো না, ছি!–অবশ্য একা বাহাদুর শা নয়। অনেক নকল নবাব, অনেক নকল রাজা কেউ এ শহরে, কেউ অন্য শহরে বৃত্তি ভোগ করছে। জানো কলকাতায় এক ভালো গাইয়ে নবাব আছেন? ভালো ঠুংরি গান?
-যুদ্ধে জয়-পরাজয় আছেই। হেরে গেলে কী করা যায়?
-ও কেট! তুমি রীতিমতো মেয়েমানুষ। রাজু হেসে উঠলো। রাজা সন্ধি করতে পারে, কিন্তু নিজেকে বন্দী করতে দেবে কেন? তাও ব্যবসাদারদের বেনিয়ানের মতো বৃত্তি ভোগ করতে?
কেট বললো–বাহাদুর শা-এর উপরে আপনার ভয়ানক রাগ।
যথেষ্ট, যথেষ্ট। হাসি হাসি মুখে বললো– রাজু-মাঝে মাঝে বরং মনে হয়, অনেকদিন থেকেই মোমভরা নকল মোতির মতো নকল বাদশা ছিলেন দিল্লীর ভদ্রলোকেরা। কী যেন, দিল্লীসে পালাম তক। যেমন অন্য কোথাও কেউ নকল রাজকুমার থাকতে পারে।
কেট রাজুর মুখের দিকে চাইলো।
কিন্তু তখনই আবার বললো– রাজকুমার–অয়ি স্বর্ণলোচনে, গৃহকর্তা আসছেন না, তোমার হাতের সেবা চাই। রাজকুমার তো বটি। এসো এই কাগজটা পড়ো, নয় পিয়ানোর টুলে যাও, এসোনা হয় একসঙ্গে বাজাই, অথবা কী যেন সেই উষ্ণ পানীয়, কফি নয়?
কেট হেসে বললো–হবে রাজকুমার। এই বলে সে ত্বরায় কফি আনতে গেলো।
কেট যতক্ষণ কফি করে আনতে গেলো রাজু উঠে পায়চারি করছিলো। বাগচীর টেবলে এবং শেফে অনেক বই। রাজু হাত দিয়ে না ছুঁয়ে দেখলো। বাংলা হরফের বইও আছে। তার একবার ইচ্ছা হলো উল্টেপাল্টে দেখে কী আছে এসব বই-এ। এতসব লেখা, এ কি লেখকের নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনাই শুধু, না, অন্যের মতামতের সংকলন? অন্যের মত বললেই কীবাসি মনে হয়না? কলকাতায় যেনানা মতের প্রচার চলছে তা নিয়ে একদিন আলোচনা হয়েছিলো–তখন হঠাৎ মনে হয়েছিলো রাজুরকী আশ্চর্য, সকলেই যেন নিজের মত দিয়ে সত্যটাকে ঢাকতে চায়।
সেসব মত দিয়ে জীবনের কোনো গূঢ় সূত্র খুঁজে পাওয়া দূরের কথা, নিজের চারপাশটাকেও চেনা যায় না। ভাবতে ইচ্ছা করে, কিন্তু লক্ষ্য করেছে যে কোন বিষয়ে ভাবতে গেলেই অন্য কারো মত এসে যেন মাঝখানে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যায়। অনেকসময়ে মনে হতে পারে সে দেয়ালের গোড়ায় পৌঁছে যাওয়াই যেন চিন্তার ভবিতব্য।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজকুমারের জন্য কফিসেট সাজিয়ে আনলো কেট।
রাজু চেয়ারে বসলে কফি করতে করতে সে ভাবলো ভাগ্যে কফিটা সকালেই ভাজা হয়েছিলো। কফি ঢেলে দিয়ে বললো–আপনি বাহাদুর শা হলে কী করতেন, রাজকুমার? আচ্ছা, এখন এত সকাল, আপনার ছোটো হাজির হয়েছে তো? কিংবা রাজকুমার, বাহাদুর শা একা কেন? নেপোলিয়ন কী বন্দীদশা স্বীকার করেননি? কেট পাশের চেয়ারে বসলো নিজের জন্য ছোট্ট একটা কাপ ভরে নিয়ে।
–যা প্রমাণ করা যায় না, বলে লাভ নেই। আমি হয়তো বাহদুর শা-এর চাইতেও নিরেস কিছু করতাম।
-কিন্তু এরকম প্রবাদ আছে, বাঁচতে সবাই চায়। যুদ্ধক্ষেত্রে যার বুকে গুলি লেগেছে সে-ও। কেট হাসিমুখে আলাপটা চালিয়ে গেলো।
