রানী হেসে বললেন–দুষ্টু মেয়ে, তোমার কথায় মনে হবে লোভ যখন অসমর্থ তখন তা পরশ্রীকাতর হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু নয়ন,সত্যি ভেবে দেখো কথাটা কতটা আমাদের সত্যিকারের অভাব আর কতটুকু তা বণিকের তৈরি।
রানীমা, হিংকসের হারিকেন দেখা দেবার আগেও আলোর অভাব ছিলো। তা হয়তো প্রদীপ, মশালে মিটতো। কিন্তু হিংসের হারিকেনে যদি তার চাইতে ভালো মেটে তাহলে বণিককে দোষ দেবো কেন?
রানী বলতে শুরু করলেন–সত্যিকারের অভাবটা হবে সত্যিকারের মানুষটার। তার তেমন চোখ নেই যে প্রদীপ আর লণ্ঠনে তফাত বোঝে। কিন্তু হঠাৎ এক কৌতুকবোধে। তিনি হেসে উঠলেন। বললেন–জানো নয়ন, কায়েতবাড়িতে নাকি নকল পাথুরে তৈজস ব্যবহার হবে। নাকি চীনামাটি বলে। বিলেতে নাকি তৈরি। শুনে নায়েবমশাই খোঁজ করেছিলেন যদি রূপোর কিছু তৈজস দরকার হয়ে থাকে। দূর করো। রূপোর দামেই নাকি সেসব চীনামাটি।
রানীর অন্য সঙ্গিনী বললো–আপনি তো হাসতে হাসতেই মঞ্জুরি দিলেন। -ওটা আমরা আলোচনা করি না,বলে রানী আবার হাসলেন। বললেন আবার–যাকগে, খুব কথা তুলেছে, নয়ন, পারো তো দুএকদিনের মধ্যে আবার এসো। তোমার বিদেশবাসের গল্পই শোনা হয়নি। সাবি, তুমি কি একা পারবেনয়নকে পৌঁছে দিতে। আচ্ছা,না হয় রূপচাঁদকে দ্যাখো। আমরা এখানে দাঁড়াই।
রূপচাঁদ খুক করে কাশলো। সাড়া দিলো, সে এসে পড়েছে। হিংসের লণ্ঠনটা যে নয়নতারাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে তা বোঝা গেলো।
রূপচাঁদ আগে আগে চললো। এই সময়ে কথাটা তার অনুভূতিতে এসেছিলো। একটু পরিবর্তন হয়েছে। আগেও নয়নঠাকরুন ঠাকুরানীদের মতোই ছিলেন। কিন্তু যেন ঘরোয়া, লক্ষ্মীঠাকরুন যেন। আসলে হয়তো এখনো তেমনি মিষ্টি করে হাসেন। কিন্তু চেহারা হাল্কা হলে কী হয় যেন চালির মধ্যে দুর্গা। হয়তো এ কয়েকমাস ছিলেন না বলেই ধরা পড়ছে। কতকটা যেন রানীমার মতো হয়ে উঠতে লেগেছে।
লণ্ঠন হাতে রূপচাঁদ। পিছনে নয়নতারা। নিজের বাড়ির দিকে চলতে চলতে নয়নতারা ভাবলো : অন্যের যা আছে তা দেখে তাকে পেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু এটার অন্য দিক আছে। কাব্য তো সকলেই দেখে, পাঠ করে, কিন্তু সকলেই কি কবি হতে চায়? ইতিহাসের গল্প অনেকেই শোনে, কিন্তু বালক বয়স পার হলে সকলেই কি রাজা হতে চায়?
০৩. রাজচন্দ্র বললো
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
০১.
রাজচন্দ্র বললো–কেট, ডার্লিং, রবিবার কথাটা শিখলাম তোমরা গ্রামে আসার পরেই। জানলাম সেটা সপ্তাহের প্রথমে না এসে শেষে আসে, বিশ্রামের দিন হয়ে। কিন্তু হায়, দ্যাখো, রবিবারেই তোমার কর্তা কর্মব্যস্ত। ইতিমধ্যে শিব স্থাপন দশদিনের পুরনো ব্যাপার।
-আপনার কি কাজ ছিলো, রাজকুমার? কেট বললো।
রাজকুমারের কাজ থাকে এ-সংবাদ তোমাকে কে দিয়েছে মনস্বিনী?
ডেস্কের উপরে একগোছা খবরের কাগজ। পায়চারি থামিয়ে রাজচন্দ্র কাগজের গোছাটাকে কোলের উপরে তুলে নিয়ে একবার ডেস্কের উপরে পা ঝুলিয়ে বসলো।
স্থানটা হেডমাস্টার চন্দ্রকান্ত এভুজ বাগচীর বসবার ঘর। তখন রবিবারের সকাল আটটা হবে।
কেট বললো– হেসে-ওটা কী সম্বোধন হলো?
-কোনটা? মনস্বিনী? ওর মানে তুমি এক মনের অধিকারিণী। রূপসী বলে সম্বোধন করলে কেউ আপত্তি করতে পারে, তাই মনকে সম্বোধন। কিন্তু এই কাগজগুলো কী? কীই-বা লেখে তা বলো বরং।
কেট সেলাই-এর ঝুড়িতে উলকাঁটা রেখে রাজুর দিকে চাইলো। সে উঠে রাজকুমারের। কাছে এসে দাঁড়ালো। ঠিক এই সময়ে সদরদরজায় বাঁধা রাজকুমারের ঘোড়া হুঁডই করে নাক ঝাড়লো। তার সাজ-লাগামের মৃদু শব্দ উঠলো।
তা শুনে হাসিমুখে বললো– কেটকী চঞ্চল!
রাজকুমারের দিকে চেয়ে তার কিন্তু একটু অবাক লাগলো। ন-দশ মাস পরে সে আবার রাজচন্দ্রকে দেখছে কাছে। ইতিমধ্যে বোধহয় সে আর একদিনই দেখেছিলো তাকে। জানলায়। পথের ধার ঘেঁষে কী যেন ভাবনা নিয়ে চলেছিলো রাজকুমার। অন্যদিকে, রাজচন্দ্র নিজে কেটদের বাড়িতে না এলেও বাগচী গত একমাসে অনেকদিনই রাজবাড়িতে গিয়েছে। সন্ধ্যায়। তার অনেকগুলিই রাজকুমারের বৈঠকখানায় কেটেছে তা কেউ জানে। কথাটা। এখানে এই : কিছু সময়ের ব্যবধানে দেখে অবাক লাগছে আজ। পাহাড়ী শহরে হাওয়া। বদলে এলে পরিচিত লোককে এমন দেখায় নাকি? গাঢ় হয়েছে রংটা। সরু জুলফি দাড়ি চিবুকের নিচে ছোটো এক ইম্পিরিয়ালে মিশেছে। অনুমান, মানুষটিও বেশ কিছুটা উচ্চতায় যেন বেড়েছে। এসবেরই এই কারণ হতে পারে, যেমন বাগচী বলেছে, যে দিনের বেশির ভাগ সময় রাজকুমারের মাঠে জঙ্গলে কাটে শিকারের খোঁজে অথবা নিছক ঘোড়া ছুটিয়ে। কিংবা সময় কাটে উত্তর-পশ্চিম সংযুক্ত প্রদেশে বেড়িয়ে।
-কিন্তু এগুলো তো পুরনো কাগজ। বললো– কেটরাজবাড়ি থেকেই এসেছে।
–তা হোক না। কিংবা বলো কী ভাবছো অমন গাল লাল করে?
কই, কোথায়? কিংবা যদি বলি অনেকদিন পরে দেখছি, এখন রাজকুমারকে আরো সুন্দর দেখায়। কিন্তু এখন কাগজ থাক। তার চাইতে বলুন কর্তার খোঁজ কেন?
–এই দেখ, পুরুষের কত দরকারীকথা থাকে। বললো– রাজকুমার। একটু পরেই আবার হেসে বললো, তাই বলে তুমি ব্যস্ত হয়ো না। এখন এখানে নিছক আড্ডা। আড্ডার খোঁজেই এসেছি।
-সে তো রোজ সন্ধ্যাতেই হয়।
–রোজ নয়, সুভগে, মাঝে মাঝে বলতে পারো। তাও ইদানীং।
