প্রথমা ঝি ভাবলোনা, তার ছেলে খেতে পারেনা। তার দাঁত ওঠেনি। অন্যান্যেরা প্রায়ই লোভের জিনিস এটা ওটা ছেলেমেয়ের নাম করে চেয়ে নেয়। আটকুড়ি ব্রজবালার কথা সকলেই জানে। স্বামীর অসুখ বলে তো সে রানীমার মঞ্জুরই নিয়ে রেখেছে-মাছটা, দুধটা, ভালো খাবারের একটু বেশি বাড়িতে নিয়ে যাবেই। কিন্তু, না, তার স্বামীকেও সে দিতে পারবে না এই কাবুলী-মেওয়া। স্বামী তাকে কী ভাববে? চোখে জল এসে গেলো তার। না, শেষ পর্যন্ত লুকিয়ে লুকিয়ে একাই খেতে হবে, এখানে অন্ধকার হলেও ফেলে দেওয়া যায় না। কারো চোখে পড়বে কাল। আর সোয়াদে অর্মত্য।
কিন্তু তা কি পাপ, যা তার মনে আসছে? সুন্দরীর জিভে পাপ আছে। পরিচারিকা বিবাহিতা। সে জানে পুরুষের কামনা কখনো কখনো একটা কোমল স্নিগ্ধ প্রার্থনার মতো। সুকুমার সুবেশ রাজকুমারের যদি তেমন নিঃশব্দ অনুরোধ-পরিচারিকা হাঁপাতে লাগলো। আছি, ছি-ছি, না।
রাজু যখন স্নান করে ফিরলো অন্ধকার গাঢ় হয়েছে বলেই যেন ঘরের দেয়ালগিরিগুলিকে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
এখন আলগা জামার উপরে শাল! এখনই স্নান করে এসেছে ঠাণ্ডায়, মুখটা লালচে দেখাচ্ছে দাড়ি সত্ত্বেও। এখন তাকে কি একটু অন্যরকমই দেখায়–আট-দশ মাস আগে যারা দেখেছে তাদের চোখেও আট-দশ মাস আগে কুড়ি ছিল না, এবার কুড়ি পার হলো!
রূপচাঁদ এসে জিজ্ঞাসা করলো ডেস্কের আলোটা জ্বেলে দেবে কিনা?
না। বলে রাজু খাটের দিকে এগিয়ে গেলো। বললো–আর কিছু দরকার নেই এখন।
রূপচাঁদ চলে গেলে সে ভাবলোকিংবা আরও স্পষ্ট করে বলতে হলে তার এই কথাটা মনে হলো–নয়নতারা ফিরেছে। কথাটার আগে এবং পরে যেন আর কিছু নেই।
ডেস্কের সামনে চেয়ার টেনে সে বসলো। যেন তার জাকুটি চিন্তায় কুটিল হবে, কিন্তু সে হাসলো। দু-এক মিনিটেই উঠে গিয়ে পিয়ানোর ডালা খুলে টুলের উপর বসলো। ডানার ভিতর দিকে একটা খাপে স্বরলিপি। কয়েকখানা বার করে কোলের উপর রেখে উল্টেপাল্টে দেখলো। ভাব দেখে মনে হলো কোনোটাই যেন তার পছন্দ হচ্ছে না। অথচ এগুলো তার খুবই পছন্দের জিনিস।
ব্যাপারটা যেন এই রকম : সদ্য স্নানশেষে শরীর থেকে যে সারাদিনটাকে সে সরিয়ে দিতে পেরেছে সেটাই তার বন, রৌদ্র, জনতা, উত্তাপ, ক্লান্তি, মৃত হরিণ, তার ব্যথা সব নিয়ে যেন তার শরীরের বাইরে অথচ মনের সামনে এসে পড়েছে। বাজানো যায় পিয়ানোতে সেই অনুভূতি? এদিকে ওদিকে এ-ঘাট ও-ঘাটে ঘা দিয়ে দিয়ে সে অন্যমনস্কের মতো শব্দঝঙ্কার তুলো, যার সবটুকু তার নিজের কানেও ধরা দিলো কিনা বলা কঠিন।
তারপর সে কিছু ভেবে স্থির করে নিলো। বেশ কিছুদিন আগে নয়নতারা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো, সে বোধ হয় তার কাশীনা কোথায় যাওয়ারও কিছুদিন আগে, সে তখন বাজাচ্ছিলো। হাতে লেখা স্বরলিপির পাতাগুলো আবার কোলের উপরে নামালো সে। উল্টে উল্টে দেখতে দেখতে সেই ঝঙ্কারগুলো যেন স্মৃতিতে ফিরলো, স্কোর শীটটাকে খুঁজে পেলো সে। ডালার খাঁজে সেটিকে বসালো, ডাইনে থেকে বাঁয়ে চেয়ে যেন সবগুলি ঘাট দেখে নিলো এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত।
বাজাতে শুরু করলে অবশ্য সমস্ত মনটাই বাজনাতে রাখতে হয়। প্রায় মুখস্থই পাতাখানা, পিয়েত্রো যা বলেছিলো তাও মনে আছে :এদের সম্বন্ধে কখনই অতি সাহস দেখাবে না; তা হেন্ডেল, অথবা বাখ যে-ই হোন। নোটেশন সামনে রাখা চাই।
চারিদিক স্তব্ধ। পিয়ানোর সুর সে স্তব্ধতায় অনেকটা দূর দূর ছড়ায়। কেউ যদি অনুমান করে রাজবাড়ির বাইরে দেওয়ানের কুঠিতে বসে হরদয়াল তা শুনতে পাবে কিংবা পাচ্ছে তাহলে সে অনুমান অন্তত অযুক্তির হবে না।
.
১১.
রূপচাঁদ রাজকুমারের ঘর থেকে বেরিয়ে রানীর মহলের দিকে চললো। ঠিক এখন আর তার কোনো কাজ নেই। তাছাড়া কেউ তাকে কিছু করতেও বলেনি। তবু পায়ে পায়ে সে রানীর ঘরের দিকে এগোলো। চলতে চলতে তার মনে হলো একটা কাজ সে করতে পারে–নয়নঠাকরুনের সঙ্গে দেখা হলে তাঁকে খবর দিতে পারে রাজকুমার শিকার থেকে নিরাপদে ফিরে এসেছেন।
দুটো অলিন্দ যেখানে মিশেছে সেখানে তাকে থেমে দাঁড়াতে হলো। রানীমার ঘরের থেকে একটা আলোর বৃত্ত দরজার বাইরে এসে পড়েছে। এদিকে পাশে সিঁড়ির উপরে বড়ো হিংকসের লণ্ঠন। সে আলোও একটা বৃত্ত তৈরি করেছে। বৃত্ত দুটি যেখানে পরস্পরকে ছেদ করেছে সেখানে একটু আগে পিছে তিনজোড়া পা লক্ষ্য করলো সে। আলো বড়োজোর হাঁটু পর্যন্ত উজ্জ্বল। উপরের দিকে তিনজনেরই প্রায় একই রকম চাদরমোড়া ঘোমটা-দেওয়া আকৃতি। কিছু যেন রঙের তফাত চাঁদরে-তার কোনটি কাশ্মীরি শাল, কোনটি আলোয়ান তা ধরা যায় না।
রানী বললেন (অনেক দূর থেকেই এই গলা রাজবাড়ির লোকেরা ঠাহর করতে পারে, যদিও তা কখনই উঁচু নয়) নয়ন, ইচ্ছা তো একটা শক্তি, তোমার কী মনে হয় যে অন্যের যা আছে তার উপরে লোভ থেকেই ইচ্ছার জন্ম, আর অন্যের যা আছে তানা-দেখলে লোভ জন্মায় না?
রানীমা বোধ হয় হাসলেন নিঃশব্দে। রূপচাঁদ আন্দাজ করলো, নতুবা নয়নঠাকরুণের হাসি শোনা যেতো না। উঁচু গলার না-হলেও কথায় হাসি জড়িয়ে থাকলে তা বোঝা যায় বৈকি।
-আমি কিন্তু সব ইচ্ছাকেই পরশ্রীকাতরতা বলিনি। তাছাড়া সদরদরজার পুরনো চেহারা ভেঙে নতুন নকশায় যা হচ্ছে তাতে অন্য কারো দরজা দেখে আপনার লোভ এমন নাও। হতে পারে। কবি-কল্পনা বলে কিছু আছে। যদিও দুপুরের লাঞ্চে খাওয়ার যে বর্ণনা শুনলাম। হয়তো একদিন আমাদের সেসব নানাবিধ মদ্য ও খাদ্যে লোভ হতে পারে।
