দরজার কাছে মৃদু শব্দ হলো।
একজন কে ঢুকছে। অল্পবয়সী, মুখটা ভরাভরা, চোখ দুটো বড়ো, ছোটো নাক, তাতে ঝুটা মুক্তার মোলক। চুল টেনে বাঁধা, সম্ভবত বেশি তেল দেওয়ায় আলোয় চকচক করছে। দুহাতে সাদা শাখার বালা। গায়ের উপর দিয়ে টেনে কোমরে এনে জড়ানো রাজবাড়ির থোসা। কাজ করছে বলে হাত দুখানা প্রায় কাঁধ থেকেই আবরণের বাইরে। তার হাতে ধুনুচি, ধোঁয়াচ্ছে। রাজুকে দেখে সে শশব্যস্তে ফিরে যাচ্ছিলো। রাজু বললো–ধূপ দেবে? দাও, আমি স্নানে যাচ্ছি। সে বেরিয়ে গেলো। কেমন ঠকলো সে আবার।
বিধান এই, ঝিরা রাজপরিবারের পুরুষদের সামনে চলতে ভয় পায়। বিধানও এই, যে ঘরে তারা থাকবেন না-ডাকলে সেখানে যাবে না। বিধানটা নতুন। পুরুষ ভৃত্যদের বেলায় এ বিধানটা খানিকটা শিথিল, কারণ তাদের সংবাদ আদানপ্রদান করতে হয়।
ঝিটি এখানে ওখানে ধূপ দিলো ধুনুচি দুলিয়ে। কিন্তু কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে তার। সে কি বেআইনী কিছু করে ফেলেছে?
তবু কর্তব্য তো করতে হবে। ডেস্কের কাছে এলো সে ধূপ দিতে দিতে। ডেস্কের চারপাশে তার উপরে দেয়ালের গায়ে ধূপ দিতে দিতে সে যেন সৌন্দর্যে অবাক হয়ে গেলো। বারকোশটা আর বারকোশে সাজানো ফল। ধুনুচি দোলাতে দোলাতে সে সরে গেলো। এখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে পিয়ানোর দিকে ধূপ দেওয়া শেষ হলে। কিন্তু পিয়ানোর দিকে না গিয়ে বরং সে ডেস্কের কাছে সরে এসেই আবার ধুনুচি দোলালো। আর সেই সুযোগে বারকোশ এবং বারকোশের উপরে রাখা ফলগুলোকে আবার দেখলো। ধূপ দেওয়া কি আর হয়নি? দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়ে এদিক ওদিক দেখলো। তাড়াতাড়ি ফিরে এসে ধুনুচিটা মেঝেতে রাখলো। বারকোশের উপর থেকে একমুঠো যা উঠলো একবারে তুলে নিয়ে আঁচলে বাঁধলো। আঁচল কোমরে জড়িয়ে ধোসা দিয়ে ঢাকলো। তার মনে হলো এগুলোকেই কাবুলী-মেওয়া বলে। না জানি কী অমর্ত সোয়াদ। কিন্তু ঘর থেকে বেরোতে না-বেরোতে কিছু যেন তার বুক চেপে ধরলো। রক্ত চলাচলের অভাবে তার হাত-পা বিবশ হয়ে আসছে, মুখ বিবর্ণ।
দুড়দাড় করে সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো। সেখানে প্রাচীন একজন অন্য ঝিদের দিয়ে এদিক ওদিক ধূপ দেওয়াচ্ছে। প্রাচীনা বললো–কী রে, হাঁপাচ্ছিস কেন?
রাজকুমার ঘরে ছিলেন। তার পেটের কাছে বাঁধা মেওয়াগুলো লোহার দলার মতো ভারী আর শক্ত বোধ হলো।
-তা রাজকুমার ঘরে থাকলে–প্রাচীনা বললো–কিন্তু, আমি কিন্তু দরজার বাইরে পর্যন্ত গিয়েছিলাম তোর সঙ্গে, তাই না?
–ছাই গিয়েছিলে।
এবার প্রাচীনার মুখও বিবর্ণ হলো। সে ভাবতে লাগলো রানীমাকে কি এখনই গিয়ে বলা উচিত, সে যায়নি? বলে কি ক্ষমা পাওয়া যাবে? রানীমার হুকুমই এই নতুন নতুন ঝিয়েরা যখন কাজ করবে পুরনো বিশ্বাসী ঝিয়েরা তখন সঙ্গে থাকবে।
তাদের সে অবস্থায় দেখে কিছু একটা ঘটেছে আন্দাজ করে অন্য ঝিয়েরা এগিয়ে আসছিলো কৌতূহলের টানে। প্রাচীনা বেঁজে উঠে বললো–যা-যা, কাজ শেষ কর। আমি কটাকে সামলাই বল। এটাকে বললাম দাঁড়া, তো ওটা একাই ছুটলো রাজকুমারের ঘরের দিকে।
অন্য ঝিয়েরা নিজের গালে হাত দিয়ে এদিক ওদিক মুখ ফেরালো যেন ঘটনাটায় কী না বিস্ময়কর অভাবনীয়তা আছে। কী না গা শিরশির করা ঘটেছে।
নতুন ঝিটি যেন প্রাচীনার এই বিড়ম্বনার পিছনেই নিজের বিবশতাকে আড়াল করতে পারলো। পরামর্শ করার ভঙ্গিতে বললো–তা দিদি, তুমি তো ছিলেই দরজার কাছে! ধোঁয়ার। আমরা ঠাহর করতে পারিনি রাজকুমার ছিলেন ঘরে।
–তাই বল। তুই যে কখন কী ভয় দেখাস না!
কিন্তু তার গা তখনো কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে একবার ভাবলো, কিন্তু বারকোশটা কী বেশি খালি হয়ে যায়নি! প্রাচীনা তার মুখের দিকে চাইলো আবার। জিজ্ঞাসা করলোতোর শরীরটা কী খারাপ নাকি লো?
-মাথাটা ধরেছে খুব।
-তাহলে বাড়ি যাবি? সেই ভালো। প্রাচীন এই বলে ভাবলো, একেবারে ঘাবড়ে গিয়েছে। দূরে দূরে থাকে এখন তাই ভালো। সামলে নেওয়ার সময় পাওয়া যাবে। নবীনা ধুনুচি নামিয়ে রেখে বাড়ির দিকে চললো।
রাজবাড়িতে যারা কাজ করে তাদের সকলের ছুটি একসঙ্গে হয় না। এবং বর্তমানে ঝি বলতে যা বোঝায় সকলেই সে স্তরের ছিলো না। ঝি এবং কন্যায় যে কোথাও কোথাও মিলের আভাস আছে তা তখন এখানে অযুক্তির ছিলো না।
প্রথম পরিচারিকা পথে বেরিয়ে একজন সঙ্গী পেলো। এই দ্বিতীয়ার নাম সুন্দরী বামনি, এবং প্রকৃতপক্ষে তাকে সুন্দরীই বলা যায়। প্রথমার চাইতেও সে কিছু বয়সে বড়। সেজন্যই হয়তো সে সাহসিকা এবং হয়তোবা সেজন্যই তার সৌন্দর্য লোকের চোখে লাগে। টানা চোখ, নাকে ঝুটা পান্নার ফুল, কানে মাকড়ি। সবসময়েই সে পরিচ্ছন্ন কিন্তু অনেকসময়ে যেন ক্লান্ত দেখায় তাকে।
একই রাস্তায় যাবে তারা, আগে সুন্দরীর বাড়ি পড়বে।
খানিকটা দূরে গিয়ে সুন্দরী খুব ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করলো–সৌভাগ্য নাকি লো?
প্রথমা ঝি অবাক হলো। –কিসের? কী সৌভাগ্য দিদি?
রাজকুমারের ঘর থেকে এসে অমন হাঁপাচ্ছিলি।
সুখ? ও? আছি ছি! তুমি একমুঠো ছাই ধরেছো সুন্দরীদি।
দুজনে আর কথা না বলে হাঁটতে লাগলো। সুন্দরীকে যেন বিবর্ণ দেখালো। সুন্দরী বামনির বাড়ি এসে পড়েছিলো। বাড়ির দরজায় তার ফুটফুটে ছেলেটি আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে। বোঝা যায় স্বামীও আছে কাছাকাছি। সুন্দরী তাড়াতাড়ি এগিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলো। একটু বেশি জোরে।
