ভারা থেকে মিস্ত্রি মজুররানামছে। রাজু হাওদা থেকে লক্ষ্য করলো, কয়েকজন কর্মচারী বেরিয়ে আসছে কাজ শেষ করে। তাদের মধ্যে সোনাউল্লা কাজীকে চিনতে পারলো সে। হাতির উপর থেকে সে বললো–আমিনসাহেব, শোনন। আমলারা দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো, এখন তটস্থ হলো।
হাতি থেকে নেমে রাজু বললো–হাতির উপরে হরিণ আছে।
সোনাউল্লা বললো–জী মেহেরবান।
–ওটার সদ্গতি করো তোমরা। চামড়াটা শুধু
–জী, রাজবাড়িতে পাঠাবো?
না। একটু হেসে রাজু বললো–শিবমন্দিরের পুরোহিতকে বরং পাঠিয়ে দিও। যদি তার কাজে লাগে। কেউ নাকি অজিন পছন্দ করে।
-বহোৎ খুব, হুজুর।
.
১০.
রাজবাড়িতে মশালচিরা তখনো আলো জ্বালিয়ে ফিরছে। অন্দরে সামনে দরদালানের সিঁড়ির গোড়ায় বেশ ধোঁয়া। ওখানে দাসীরা ধুনুচি ঠিক করছে তাহলে। সব ঘরে ধূপ দেওয়া শেষ করতে পারেনি।
রাজু তার মহলের সিঁড়ির কাছে পৌঁছতেই রূপচাঁদের সঙ্গে দেখা হলো। হাত বাড়িয়ে বন্দুক নিলো সে, গুলির বেল্টও। পিছন পিছন যেতে যেতে সে বললো, মাসি বললেন—
রূপচাঁদ ভয়ে ভয়ে বলছিলো। রাজুও অন্যমনস্ক ছিলো। সে বললো, কে, হৈমী? সে ভাবলো, দ্যাখো পাটনায় যখন তার বোটে এলো তখন কী করুণ অবস্থা! ইতিমধ্যে কিন্তু সামলে নিয়েছে। তার সুখ-সুবিধার বিশেষ ভার নিয়েছে। রূপচাঁদ বললো–আজ্ঞে না, মাসি!
-তোমার মাসি? কে? নয়নতারা? সে কি ফিরেছে?
বললেন তিনি রাজবাড়িতেই আছেন।
কয়েক ধাপ উঠে বললো– রাজু–রূপচাঁদ, স্নানের ব্যবস্থা করো।
-গরম জল তো?
-আ, রূপচাঁদ, এখন আমি বেশ বড়োই হয়েছি। তাছাড়া সাতদিন আগে যে ঠাণ্ডা লেগেছিলোনা না, থাক, গরম জলই দাও স্নানের ঘরে। এখন আর মাকে বিরক্ত করে মত আনতে যেতে হবে না। মা কোথায় রে, রূপচাঁদ?
-জেনে আসি, হুজুর।
না। শেষ কী করতে দেখেছিলে? রাজু হাসলো রূপচাঁদের চালাকিতে।
–আজ্ঞে, রানীমা বোধহয় মহাভারত শুনছিলেন।
–আর তোমার মাসিই পড়ছিলেন নিশ্চয়?
হ্যাঁ, না–কোনটা ভালো হবে তা ঠাহর করতে পারলো না রূপচাঁদ। মহাভারত পড়ার সব ব্যাপারটাই তার অনুমান।
এক মশালচি দোতলার সিঁড়ির দেয়ালে দেয়ালগিরি জ্বালছে। বেশ খানিকটা কসরত সেটা। এপাশের রেলিং-এ উঠেদাঁড়িয়ে মশালবাঁধা লাঠি দিয়ে দেয়ালগিরির উপরেই যেন ভর রাখতে হয়। যেন একটা পতঙ্গ, মশাল-লাঠিটা যার একটা শুড়ো। আসলে নিশ্চিতই তা নয়। তাহলে দেয়ালগিরির করবী ফুলের মতো চেহারার লাল কাঁচের ডোমটা, যা নাকি পিতলের কয়েক প্যাঁচে মাত্র বসানো খানখান হয়ে ভেঙে পড়তো।
একটু দাঁড়াতে হলো রাজুকে।
মশালচি আলো জ্বেলে নেমে দাঁড়িয়ে সেলাম করলো।
রাজু নিজের ঘরের দিকে চললো।
এ ঘরের আসবাব খুব কম, কিংবা এমন হতে পারে ঘরখানি বিশেষ বড়ো বলেই তেমন দেখায়। দেয়ালে বসানো আলমারিটা বেশ বড়ো। অপরিচিত লোকের কাছে আর একটা দরজা মনে হবে। শুধু তার পাল্লাগুলোর মেহগ্নি রং দরজার পালিশের চাইতে উজ্জ্বল এবং গভীর। বরং তা রঙের দিক দিয়ে খাট, চেয়ার, দেরাজের ডেক্সটার সঙ্গে মেলে। কিন্তু গাঢ় রং দেখতে গেলে মস্ত পিয়ানোটাকে লক্ষ্যে আনতে হবে যা উল্টোদিকের দেয়াল ঘেঁষে।
ঘরের মাঝামাঝি থেকে কিছু পিছিয়ে রাজুর খাট। স্বভাবতই তাতে নেটের মশারি এবং দুধে-সাদা চাদর। দেয়াল-আলমারি থেকে কিছু দূরে একটা ছোট র্যাক। রূপচাঁদ তাতে বন্দুকটা রাখলো। আরো বন্দুক সেখানে। ডেস্কের সামনে খান দু-তিন চেয়ার। পিয়ানোর সামনে গদিদার টুল। ডেস্কের উপরে হিংকসের বড় টেবল ল্যাম্পটা জ্বালানো হয়নি। ঘরের ঠিক মাঝখানে ছাত থেকে ঝোলানো ঝাড়টাও জ্বলছে না, যদিও দেয়ালের দেয়ালগিরির আলোয় ঝাড়ের ত্রিশিরা কাঁচগুলো ঝিকমিক করছে। ঝাড়টার ঠিক নিচে গালিচা।
ঠিক এই সময়েই সে ব্যাপারটা ঘটলো। একটা হীরা বসানো বাঁটের সোনার কিন্তু তীব্ৰধার তরোয়াল। রাজুর মনের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠলো। যেন প্রতিদ্বন্দ্বীর বুকের রক্তে তার পিপাসা। কিন্তু অবাক, সে রক্ত যেন তার নিজের চোখের জল যার ফলে তার বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, কথা রাখোনি।
কিন্তু এখন ঠোঁটকে ফুলতে দেওয়া যায় না। এই কয়েক মাস গঙ্গায় বোটে কাটিয়ে তার ঠোঁটের উপরে সরু কালো গোঁফের রেখা বেশ স্পষ্ট। গালেও ইম্পীরিয়াল দাড়ি।
হেঁটে গিয়ে ডেস্কের সামনে চেয়ারে বসতে বসতে ডেস্কের উপরে আখরোট কাঠের বারকোশটায় চোখ পড়লো। ধারগুলো কারুকার্য করা। কাঠের অথচ স্বর্ণকারের কাজ মনে হয়। কিন্তু বারকোশে ফলও। রাজু কয়েকটা তুলে মুখে দিলো।
খেতে খেতে জুতো খুলতে গেলো রাজু। রূপচাঁদ তখন হাঁ হাঁ করে ছুটে এলো। নিচু হয়ে বসে জুতো খুলতে খুলতে বললো–জুতোয় হাত দেবেন, হুজুর, খাচ্ছেন যে।
-তুমি বুঝি হাট থেকে এনেছো? বেশ তো।
না, হুজুর, পিয়েত্রা কুঠির লাঞ্চোর জন্য সফর থেকে এসেছিলো। হৈমীদিদি ছাড়িয়ে হুজুরের ঘরে রাখতে দিলেন।
জুতো খুলে, চটিজোড়া পায়ের কাছে এগিয়ে দিয়ে রূপচাঁদ উঠে দাঁড়ালো। বললো–স্নানের জল তৈরিই থাকবে, দিতে বলি। আর এখন কি খাবারঘরে যাবেন? সারাটা দুপুর না খেয়ে কাটলো হুজুর।
-তাই তো দেখছি। স্নানটাই এখন দরকার।
ফিতে কষা জুতোমোজা খুলে ঢিলে চটি পরার একটা সুখ আছে। শিরশির করে রক্ত বয়ে যায় যেন আরাম দিয়ে দিয়ে পায়ের আঙুলগুলোতে। রূপচাঁদ চলে গেলে একটু পায়চারি করলো রাজু, বিছানার পাশ দিয়ে গিয়ে ওদিকের গরাদটার একটা জানলা খুললো। এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া এলো ঘরে। জানলা দিয়ে বাইরে চেয়েও খানিকটা সময় কাটলো। সে কি কিছু প্রত্যাশা করছে? সে কি জিজ্ঞাসা করবে, এই এক বছর কোথায় থাকলে? কিছু না বলে চলে গেলে কেন?
