রাজু ভাবলো, বনে বুনোমোষও আছে। বাঘও আসে হরিণের লোভে। তারপর বনের ধারে গ্রামে গোরু বলদের উপরেও হামলা করে।
হরিণ যদি তেমনভাবে এসে থাকে বুনোমোষও কি তবে গৃহস্থের হারিয়ে যাওয়া মোষ থেকেই এ অঞ্চলের বনে তৈরি হয়েছে? কিন্তু তা কি সত্যি হয়–পুরনো ঝাড় থেকে একেবারে নতুন বেপরোয়া এক বংশ। তা কি হতে পারে? গৃহস্থ মানুষ থেকে স্বাধীন এক পুরুষ!
এখন গ্রামের প্রধান পথে উঠেছে হাতি। তাই এ সন্ধ্যাতেও লোকচলাচল একটু বেশি এখানে তাদের কারো কারো কাঁধে অথবা মাথায় ধামা। ওদিকে কাঠুরেপাড়ার হাট ছিলো তবে দু-একজন এ-গলি ও-গলি থেকে বেরিয়ে হনহন করে হেঁটে হাতির পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উল্টোদিকে। শেষ হাটে কিছু কিনতে আশা রাখে। তাদের কেউ কেউ আবার দাঁড়িয়ে পড়ে হাতি ও হাতির পিঠের শিকারকরা জানোয়ারটাকে দেখে নিচ্ছে। এমন অস্পষ্ট আলোয় তা কি ঠাহর হবে?
প্রধান পথই সুরকির রং ধরেছে চোখে, সুরেন ওভারশিয়ারের রাস্তা। এখান থেকেই সার্বভৌমপাড়া শুরু। কাঠুরেপাড়াটা বরং সাহেবপাড়ার পিছনে। নাম সার্বভৌমপাড়া। তার অর্থ এই নয়, এ পাড়ায় একাধিক সার্বভৌম থাকেন। একজনই ছিলেন। তাতেই এই নাম। ব্রাহ্মণপ্রধান পল্লী এখনো।
কিন্তু সবসময় তাও হয় না। যেমন কাঠুরেপাড়াটা খুব পুরনো হলেও সেখানে এখন যারা থাকে তাদের অধিকাংশ রাজকাছারির আমলা। আর সাহেবপাড়া তো এখনো কাগজপত্রে ওঠেনি, মুখেমুখে চলছে। আগে নাম ছিলো গঞ্জ। প্রধান হাট বসতো। সুতার হাট, কাপড়ের হাট। এদিক ওদিকে এখনো কয়েকজন মহাজনের স্থায়ী আড়ত, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওখানে স্কুল-হরদয়ালের। স্কুলের হেডমাস্টার বাগচীসাহেবের বাসা। তা থেকেই সাহেবপাড়া বলছে। এটাও নতুন হওয়ার ঘটনা বইকি।
ইতিমধ্যে রাজবাড়ির দোতলার কোনো কোনো জানলার আলো চোখে পড়ছে। রাজু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলো, কিন্তু সোজা হয়েও বসলো। প্রায় সারাটা দিন কেটেছে হাতির পিঠে, এবার নামতে হবে। আসল কথা, এই অত্যন্ত পুরনো কথাটাকে টানাসুরে ভাবলে সে বদলে যায়, পুরনোকে ধরে রাখা যায় না।
মাহুত বললো–হুঁজুর!
কিছু বলবে?
-হাতি নিয়ে কইবেন বলেছিলেন।
–ও, হ্যাঁ। ওর বাঁ কানটার কথা।
সোভান মাহুত যা বললো– : তিন-চার বছর আগে জয়নাল সেই যে একটু খ্যাপাটে হয়, তখন বাগে আনতে তার উপরে অত্যাচার হয়েছিলো। বাঁকানের নিচে চার-পাঁচ আঙুল চেরা, সে সময়ের বল্লমের চিহ্ন। আর দাঁত দুটোর ডগা গোল নয়, মাপেও ছোটোবড়ো। সেও খ্যাপামির ফল। সে সময়ে একটা দাঁতের আগা বেশ খানিকটা ফেটে গিয়েছিলো। আসাম থেকে লোক আনিয়ে সমান করে কাটিয়ে নিতে হয়েছে। একবার কথা উঠেছিলো দাঁত দুটোয় সোনার রিং পরানো হবে। এখনো কিন্তু খুব ছুটতে পারে জয়নাল।
কারণটা মনে পড়লো রাজুরও। রিং পরানোর কথা হয়েছিলো, পরে কিছু আর করা হয়নি। কে ব্যবহার করবে জয়নালকে? কিছুদিন তার একমাত্র কাজ ছিলো বিলমহলে যাওয়ার জন্য কর্মচারীদের বাহন হওয়া। রাজুই ইদানীং তাকে তুলে এনে নতুন করে কাজে লাগাচ্ছে। এমন শিকারী হাতি হয় না, যদিও কানের ক্ষত চিহ্ন আর মুছবে না, দাঁতের গোল ডগাটা আর ফিরে পাবে না। দ্যাখো, এতদিন পরেও বনের স্মৃতি খেপিয়ে তোলে নাকি?
রাজু বললো–সোভান, হাতিটার গায়ে রং দিতে হয়।
-জী, তাই দেবো।
-পুরনো রং বেশ রগড়ে ঘষে তুলে দিও। রামপিয়ারী বা চন্দনের গায়ে যেমন অবিকল তেমন করো না। নকশাটা ভিন্ন করো। এখন তো জয়নাল আমার কাজেই লাগছে। ও আর। খেপবে না, দেখো। সবকিছু মেনে নেবে।
জী, হুজুর।
একটু পরে আবার বললো– রাজু-পিয়েত্রোর হাতিটার কী অবস্থা, সোভান?
-ওর মাহুতই ওকে দেখে, হুজুর। মাহুত মানে বান্দা, পেত্রার বাবুর্চি।
–সে কী? তার বেতন-তনখা?
–শুনি শেষমেস অনেককে চাকরান দিয়ে গিয়েছে পিয়েত্রো।
–আচ্ছা, সোভান, তোমাদের পিলখানাতে পিয়েত্রোর হাতিটাকে এনে রাখলে হয়।
–তা হয়, হুজুর।
–আমার তো মনে হয়, একা একা প্রাণীরাও বোঝে।
–হাতি তা বুঝবে, হুজুর।
রাজু ভাবলো, হ্যাঁ, কী আর কাজে লাগবে। তার নিজের হাতি তো নয়। কোথায় যেন পথের ধারের ঘাস-ঝোপ থেকে ঝিঁঝি ডেকে উঠলো। ঝিঁঝির ডাকের এই এক কৌতুক, তাতে যেন একটা ইশারা থাকে। যদিও বোঝা যায় না, কিন্তু যেন টানে, যেন দূরে নিতে চায়। আর তখন মন উদাস হয়।
রাজবাড়ির দরজায় হাতি বসছে, ভিতরে যেতে পারছে না। সদরদরজার কাছেই গোলমাল। ভারা বেঁধে কাজ করছে মিস্ত্রিরা। যদিও আগেরটাই যথেষ্ট সুন্দর এবং উঁচু ছিলো। এখন নাকি বিশ হাত ওপরে, চওড়াতেও বারো হাত আর সেই অনুপাতে কিছু হচ্ছে। রাজু মনে মনে হাসলো। এইসবই সে এবার ফিরে আসার পর দেখছে। ছ মাসের উপর ছিলো না সে। হঠাৎ একদিন স্থির হয়েছিলো। হঠাৎ একদিন বোট ভেসেছিলো তাকে নিয়ে। পাটনা, মুঙ্গের কাশী; এদিকে লক্ষ্ণৌ, দিল্লী, আলমোড়া। লক্ষ্ণৌ রেসিডেন্সি দেখেছে সে। অনেক কবর, গোলাগুলির চিহ্ন অনেক। দিল্লীর ভাঙা প্রাসাদগুলো, ভাঙা দরওয়াজাগুলো। ওহহ, এটাই তো বুলন্দ দরওয়াজার নকল বলছিল সুরেন। মাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, হাতে কাজ নেই বুঝি? পুরনোকে ভেঙে নতুন করছে সব? পুরনোকে ভাঙলে নতুন হওয়া যায় বুঝি? সে আবার মনে মনে হাসলো ।
