জয়নালের বয়স হয়েছে। তার গায়ে চকখড়ি এবং সিঁদুরের আলপনা যেটুকু সকালে দেখা গিয়েছিলো এখন চোখে পড়ছে না, বনজঙ্গলের ডালপালায় ঘষে উঠে গিয়ে থাকবে। কিংবা বাতাসে এখন রং থাকায় সেই নকশা এখন অস্পষ্ট। জয়নালের গুঁড়ে জড়ানো বেশ মোটা কিন্তু খাটো একটা কলাগাছের ডুমো। তার হাঁটা দেখে মনে হয় যেন সে ভাবছে কতক্ষণে হাওদা খুলবে, আর সে সেইনরম ডুমোটাকে সদ্ব্যবহার করবে। সেজন্য তার চলার মধ্যে যেন একটা খুশির ভাব।
হাওদায় রাজু রাজকুমার, রাজচন্দ্র। সারাদিনের পরে শিকার থেকে ফিরছে সে।
রাজুর সকালের কথা মনে হলো। শিবমন্দিরটা অনেকটা উঁচুই হবে! মেঝে থেকে অন্তত বিশ বাইশ হাত উঁচুতে থাকবে চূড়া। আর সেই মেঝে, যা সেই হাওয়াঘরের, তা না কোন দশ হাত। রাজবাড়ির চূড়া শোনা যায় মাটি থেকে পঁচিশ হাত। কিন্তু রাজবাড়ির চূড়াটা গম্বুজের। মন্দিরের চূড়া যেন রথ। রাজবাড়ির গম্বুজের কাছে দাঁড়ালে সেই চূড়া চোখে পড়বে কি?
গোটা মন্দির কী রকম হবে তার ছবি রাজু দেখেছে। রানী নিজেই দেখিয়েছিলেন। জয়পুরী সেই মিস্ত্রির নকশা।
হঠাৎ মনে হলো রাজুর, হাওয়াঘরটা থাকবে না। বলতে পারো এখনই নেই। কিছুদিন আগেই টেনে নামানো হয়েছে খড়ের সেই পুরু ছাদ, লোহা আর কাঠের তির বরগা। যেন হঠাৎ একটা ধাক্কা লেগে শূন্য হয়ে গেলো তার মন।
ওখানেই, ওই হাওয়াঘরেই, প্রথম বন্দুক চালাতে শিখেছিলো সে। শিখিয়েছিলো বুজরুক। কত তাড়াতাড়ি বর্তমান অতীত হয়ে যায়!
আর অতীত এমন বিষয় যে বর্তমানে পৌঁছে সবকিছু যেমন করে ঘটেছিলো পরপর তেমন করে দেখবারও উপায় থাকে না।
শাখা-পথটার কাছে জয়নাল দাঁড়ালো না।
আর এই শাখা-পথের উপরেই কিছুদূরে এগিয়ে গিয়ে সেই ঘটনাটা ঘটেছিলো। পালকি বেহারার হুমহাম শব্দে তার ঘোড়া বারবার শিষপায়ে দাঁড়াচ্ছে। ঘোড়ার উপর থেকে সে যেমন, পালকির ভিতর থেকেও তেমন বিরক্ত বুজরুক কে যায় বলে কেঁঝে উঠেছিলো। সারাক্ষণ বুজরুকের কথাই ছিলো মনের কাছে, ইংরেজের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরছে। বুজরুক। অথচ তখন সেই পালকিতেই বুজরুক তা সে ভাবতেও পারেনি।
দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়লো রাজুর। তখন দেখা হয়ে গেলে কী না কৌতুকের হতো! সন্ধ্যার ম্লানভাবটা রাজু অনুভব করলো তার মনে। আসলে বোঝা যায় না। একই পথের উপরে মুখোমুখি অবস্থান করলেও চেনা যায় না, জানাও যায় না কী কার পরিণতি হবে। কেউ কি জানে পিয়েত্রো ঠিক কী আশা করেছিলো? তা কী ইংরেজদের প্রতি ফরাসীর মিথ্যা অর্থহীন আক্রোশ? একদিন গল্পের ঝোঁকে বলেছিলেন বটে এক হাজার লোক নিয়ে শুরু করে এক রাজ্য স্থাপন করা যায়–ভাগ্য সহায়তা করলে এবং অশেষ কষ্ট সহ্য করার উৎসাহ থাকলে।
রাজু হাসলো। হাওয়াঘরের কথাটাই আবার ঘুরে এলো মনে। সে অনুভব করলো ছাদ টেনে নামানোর পরেও সেদিকে চাইলে যেন হাওয়াঘরটার ছায়া সেখানে এতদিন দেখা যেতো। এরপর সেদিকে চাইলে নিরেট বিপুল শিবমন্দিরটাই চোখে পড়বে। এরপর পিয়েত্রোর বলা কোনো প্রতিধ্বনিও মনে আসতে আসতে হয়তো মন্দিরে ঘণ্টাশব্দে ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাবে।
হাতের উপরে চিবুক রেখে সামনের দিকে চাইলো রাজু। তাহলে শব্দটা উঠছে জয়নালের গলায় ঝুলনো ঘণ্টা থেকেই? গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েছেহাতি। শিকারের হাতির ঘণ্টা বাজালে চলে না। গ্রামে ঢুকেই সোভান দড়ির বাঁধনটা ছাড়িয়ে দিতেই বড়ো পিতলের ঘণ্টাটা হাতির গলার ডোর থেকে দোল খেয়ে খেয়ে বাজছে।
আর জয়নাল এখন গতিও বাড়িয়েছে যেন। বাড়ি ফেরার পথ, মাহুতকে অঙ্কুশ ব্যবহার করতে হচ্ছে না। কানের পিছনে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে মাঝে মাঝে। কিন্তু অঙ্কুশটাও হাতে আছে। গ্রামে ঢুকে পিলখানার দিকে ছুটতে পারে, রাজবাড়ির দিকে না গিয়ে।
হ্যাঁ, গ্রামেই তো। খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামছে এখন। তাহলেও পথ চেনা যাচ্ছে। লোজন আছে পথে। তারা সরে সরে যাচ্ছে হাতি বাঁচিয়ে।
হাওদায় বসে দুলুনিটা ডাইনে-বাঁয়ে লাগে ঠিকই, কিন্তু কাঁধের কাছেবসা মাহুত অনবরত উঠছে আর নামছে সন্ধ্যার অন্ধকারে।
এমন অন্ধকারেই পিয়েত্রোর হাতিটা একা একা এক গাছতলায় সামনে পিছনে দোলে। শুড় তোলে। কী ধরতে চায়? কিছু যেন শুড়ে টেনে পায়ে ফেলছে মনে হবে। মিথ্যা কিংবা উদ্দেশ্যহীন আক্রোশে।
পিয়েত্রোর হাতিটা ছোটো। তার পিঠে হাওদা, হাওদায় পিয়েত্রো। অন্য হাতিতে ছিলো বুজরুক।
রাজু ভাবলো সে শিকারের তুলনায় অন্য কোনোদিনের কোনো শিকারকেই সে নাম দেওয়া যায় না। অথবা তাকে কী শিকার বলা হবে? আহত বাঘের দিকে বুজরুক যেভাবে খোলা কিরিচ হাতে ছুটে গিয়েছিলো? সেটা হয়তো তার পক্ষে শিকার-খেলার অংশমাত্র ছিলো। কিন্তু আহত বাঘের সঙ্গে-ঘটনাটা যেন রাজুকে বলতে পারে, দ্যাখো, পুরুষের কত সাহস হতে পারে, নিজের হাতের কিরিচে কত বিশ্বাস রাখতে হয়!
আজকের হরিণটা কিছুমাত্র খেলেনি। পাকা ধান খেতে বনের ধার-ঘেঁষা ধানক্ষেতে ঢুকেছিলো। বেশি খেয়ে যেন ছুটতেও পারছিলো না।
এ জাতের হরিণ, অবশ্য, কচিৎ মেলে জঙ্গলে। প্রচলিত গল্প মানতে হলে বলতে হবে, রাজুর বৃদ্ধ পিতামহের সময়ে পুরনো বাড়িতে বন্যার জল পৌঁছলে হাতার চিড়িয়াখানার হরিণগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো। এ হরিণ তাদেরই জ্ঞাতিগুষ্টি হবে।
