গাড়ি তখন রাজারে গ্রামেই ঢুকছে। নায়েব বললো–বড়োবউ, তুমি কিন্তু কান্নাকাটা একটু কম করে করো।
-কেন নিজের ঘরে মধ্যে কাঁদবো না?
-এই দ্যাখো বাপু, তা আমাকে দুষো না। আমি কিন্তু আর একজনকে পরপরই এনে দিয়েছিলাম। আর এই ভদ্রলোক? লোকের মুখে মুখে শোনা আগের চাইতে নাকি দপ্তরে দশগুণ কড়া হয়েছেন। আমলা ফামলা রাগের ভয়ে তটস্থ। কিন্তু তারাও নাকি বোঝে না। ক্ষুঃ বলে উঠলে গলদঘর্ম হয়। কার ভিতরটা কতখানি পুড়েছে তা বোধ হয় বোঝা যায় না। নায়েবগিন্নি ভয় পেলো। সে বললো–ওখানে কী করে এলে? তোমার কথার পাত আমি বুঝি। রাগের মাথায় সড়ক বন্ধ করে এলে নাকি নীলসাহেবের?
নায়েব বললো–মেয়েমানুষ আর কাকে বলে। রাগের মাথায় কাজ হয়!
এখানে সময়ের দিক দিয়ে অসামঞ্জস্যের হলেও পরের দিন সকাল হতেই যা ঘটতে শুরু করেছিলো তা বলা মন্দ হবে না।
সামচাচা ভেবে ভেবে কিনারা পায়নি, লাভের মধ্যে ঘুম বরবাদ। হাসিখুশি লোকটি যে হঠাৎসাপটে উঠেছিলো তা ভোলা গেলো কোথায়? মোরগের ডাকেই সেউঠে বসেছিলো। বাইরে বেরিয়ে সে দেখলো তার সেই সড়কে গ্রাস করা জমিটার উপরে যেন হাজার লোক পিলপিল করছে। তার জমি ছাড়িয়েও নতুন সড়ক বরাবর আরো অনেকে।
কী আপদ বলে সে এগিয়ে যা দেখলো তা বরং দূর থেকে হাজার লোকের ভিড় কল্পনার। চাইতেও খারাপ। অস্থত পঞ্চাশটা কান্তে চলছে তারই ধানে। এর মধ্যে বারো আনা কাটা শেষ, আঁটিতেও বাধ্য হয়েছে! ওদিকে মরেলগঞ্জের সীমা ঘেঁষে নতুন সড়কের আড়াআড়ি খাম্বা বাঁশের খোঁটা বসেছে সারিসারি। আর তার এপারে ঝুপঝাঁপ ত্রিশখানা কোদাল পড়ছে, নতুন সড়ক কেটে মিশিয়ে দিচ্ছে দুপারের জমি বরাবর। ফর্দাফাই মাঠান জমি। দুমাসের সড়ক একবেলায় মাঠ।
ভয়ে হাত-পা সেঁদিয়ে যাওয়া বোধ হয় একেই বলে। বাড়িতে ফিরে তবু তারই মধ্যে ভাবলো সে একবার মনোহর সিংকে একটা খবর দেওয়া উচিত; অন্তত বলা দরকার আমি এসবে নেই। একটু বেলা হলেই তা করবে সে, এই ঠিক করলো। কিন্তু তাই বা কী, এতক্ষণ ননোহর সিং কি আর খবর পেয়ে যায়নি? আর এতক্ষণে সে বা কী মূর্তি ধরেছে। কাল যে গোরুগাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের সঙ্গে সে কথা বলেছিল তা কি আর ছাপানো আছে? সে কল্পনায় লাল সূর্যে কখনো মনোহর সিং-এর চোখ, নীলসাহেবের মুখ দেখতে লাগলো। আর তা হবেই, কারণ বাঁধা সড়ক কেটে নামিয়ে দেওয়া তা গিয়ে লাথ ঝাড়ারই সামিল আর তা জোরসে এবং নাক বরাবর। বাঁদরামির হাসির মুখে ডান হাতের এক থাপ্পড়।
কথায় বলে হস্তিমূর্খ পণ্ডিত আর বলদবোকাই তাঁতী। নীলবাবুদের রেশমদাদন মেটাতে–পেরে ওনকানের নীলের দাদন। বোঝ এখন? পণ্ডিত তার শাস্ত্রের বাইরে কানা, তাতীও তার তাতের নকশার বাইরে কীই বা দেখে? সামসুদ্দিনের ততও নেই, কিন্তু টানা দেখে বালুচরীর নকশা কেউ ধরতে পারে না এ সে বোঝে। তার গোটা বুকের মধ্যে সাতপুরুষের ভাবনা উথাল পাথাল করে উঠলো। নইলে তাতের ভুলো যাওয়া কথা এমন করে মনে আসে? লোকে বলে মাথায় বাড়ি পড়লে ভিরমি যাওয়ার আগে শৈশবকালের ঘটনাও নাকি মনে ফেরে। সূচনা আর পরিণতি, টানা আর নকশায় অনেক তফাত। কালকের সেই সাদা ছই-এর গাড়ি আর আজ সকালের এই দৃশ্য। কিছু কি বোঝা গিয়েছিলো কতটা বাগ? একবারই সাপটেছিলো বটে!
কিন্তু আরো আছে। জমি থেকে ধানের বোঝা সব মাথায় উঠছে এবার। রাস্তা চৌরস করে এবার ধানকাটা জমিতে কোদাল দিচ্ছে। কোদালেই চাষ। ক্রমে তারা জমি আর সড়ক ছেড়ে উঠে আসছে। সরষেও ছিটায় নাকি? আল্লা! এগিয়ে আসছে আর সামসুদ্দিনের ঘরের সামনেই ঝুপঝাঁপ ফেলছে কাঁচাপাকা ধানের বোঝাগুলি। উঁই করে ফেলছে। সামসুদ্দিন ফকির দরবেশের মতো নির্ভাজ হয়ে বসে রইলো। কে কাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে?
ধানের বোঝা ফেলা শেষ হলে লোকগুলি দল বেঁধে ফরাসডাঙার দিকে হাঁটতে শুরু করলো। তখন হঠাৎ এক বুদ্ধি খেলে গেলো সামসুদ্দিনের। বাড়ির ভিতরে গিয়ে বউকে বললো–বেলরা তো। বেরো, আয় আমার সঙ্গে। ছোটোমেয়েটা দাওয়ায় খেলছিলো, তাকে টেনে কোলে তুলো। ছেলেটা মায়ের আঁচল ধরে কী বায়না করছিলো, আঁচলসমেতই তার হাতে চেপে ধরলো। –আয় আমার পিছনে। বললো– বউকে। -আয় বলছি।
যারা দল বেঁধে ফরাসডাঙার দিকে যাচ্ছিলো তাদের লাগ রবার জন্য সামসুদ্দিন লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করলো বউ-এর আঁচলসমেত ছেলের হাত চেপে ধরে মেয়ে-কাঁকালে।
বউ বললো–আরে আরে, করো কী? ছাড়ো, আঃ!
–শশুরের বাড়ি যাই।
তা শ্বশুড়ের বাড়ি বটে, ফরাসডাঙার অন্য প্রান্তে নদীর ধারে।
বউ বললো–এক বস্ত্রে? করো কী? খেপলে? ছাড়ো। লোক?
চপ। সাপূটে উঠলো সামসুদ্দিন।
সামসুদ্দিন জানে টানা টানাই, নকশা নকশা। এই তো সবে সূচনা। অথচ ভাবো একবার কাল সেই বাবুমশায় রাস্তা সড়ক হচ্ছে দেখে কত প্রশংসা না করলো নীলেদের। কেমন হলো না? আকাশে ভাসা মেঘ দেখে বিদ্যুতের পোড়ানি বোঝো? ওদিকে আবার ডানকান আর মনোহর। তাদের লেঠেলরাও বোধ হয় এতক্ষণ বেড়ার গায়ে দুমড়ে পড়েছে।
এসবই পরের দিন ঘটেছিলো।
.
০৯.
শেষ হেমন্তের দুপুর দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যায়, ১৮৬০, মতান্তরে ১৮৬১-র সেই দুপুরও হয়েছে। এখন সবকিছুই কাছের হলে বাদামী, দূরের হলে কালচে।
