–তখন কি বিচার ছিলো না?
ছিলো না আবার! নায়েব বললো–এখানকার পথেই কাজীর তুরুকদের সঙ্গে বেঁধে গেলেই হলো। তা এরাও বিচার চাইতো না। বরং ধরে নিয়েছিলো মারকাট করতে করতে বংশে গড়ে একজন পুরুষ থাকলেই হলো। ছোটোকালে মাসিদিদিমার কোলে রাখো লুকে। তারপর সে-ও আবার কোমরে কিরিচ বেঁধে হাঁটবে। তা বাপু সেসব দিনের চাইতে নাকি এ রাজ্য ভালো। এই তো দ্যাখো, অত বড়ো মন্দির উঠছে, কেউ ভাঙতে এগোচ্ছে না।
গাড়ি একটু এগিয়ে গেলো। হঠাৎ নায়েব খাড়া হয়ে বসলোতা দ্যাখো এরাও তো রাজা। আর তার বিদ্বেষী তোমার ছেলে। বলল, রাজদ্রোহ তো পাপ। দ্যাখো কত লোকের ছেলে কমিসরিঅটে চাকরি করে কলকেতাতেই কত বাড়বাড়ন্ত। আর তোমার ছেলে? ফিরলো বলো তোমার তিন সালের কান্নায়? পাপ নয়? লুক্কে রাখতে হয় না? কেমন কি না! তাহলেই দ্যাখো, চোরের মায়ের কাদন নেই।
হঠাৎ নায়েব হা হা করে হেসে উঠলো। আর তখনই যেন তার উত্তাপ লেগে তার নিজেরই সারা মুখ ঝলসে গেলো। বললো–ওরে তোরা তামুক দিতে ভুলছিস। না থাক। আরে ও গাড়োয়ান, থামা বাপা, থামা। নামবো একটুকন। চারিভিত উজল যে। লালে লাল দেখি। শিমূল নাকি অকালের?
গাড়ি থামলো। নামলে গাড়ি থেকে নায়েব। কয়েক পা এগিয়ে পাকা সুরকির সড়কটার। মুখে যেখানে মাটি পড়ছে সেই বরাবর গিয়ে দাঁড়ালো সে। ঝুড়ি করে মাটি ফেলছে পাঁচ সাতজন, কোদালে মাটি কাটছে জনাপাঁচেক। একজন তো পথের ধারেই।
নায়েব ইশারায় তাকেই ডাকলো। সে এলে বললো–লাল সড়কের ধারে উই ছাতনা। গাছ নাকি বাদামগাছ–ওটাই না মরেলগঞ্জের সীমানা? বটে তো? ওখানেই তো মনোহর। সিং-এর মকান। তা, এখানে এ রাস্তা পাতে কে?
-শুনি তো সিংজী, আসলে নীলেসাহেব আজ্ঞা। শুনি যে কুতঘাট তক যাবে।
বাঃ। একেবারে ফরাসডাঙা ফুঁড়ে? আহা বড়ো ভালো গো। তোমাদের আর কষ্ট থাকবে না। তা বলি, এই যে জমির মাটি কাটছে আর যে ধানের উপরে মাটি ঢালছো–এ সবই বুঝি নীলসাহেবের!
লোকটি ভয়ে ভয়ে বললো–জমিটা কর্তা ওই মাথায় করে মাটি ঢালছে-ওরই।
এই বলে সে থামলো। কেমন যেন ভাষা না বাবুটির? আর মুখের সঙ্গে তাও মানায় না। ফিনফিন ধবধবে জামা-পিরহান। কিন্তু পিতলের গরম পিদিমের মতো যেন চোখ দুটি।
তাহলে নিজের ধানে মাটি ঢালে কেন? নায়েব হো হোকরে হাসলো। একদম বেহেড। দেখছি। লোকটি এদিক ওদিক দেখে স্বর নিচু করে বললো–ধান তো গেয়েই আছে। কাল নয় পরশু আসবে মনোহরের নোক ধান কেটতে। তা সামচাচা কইলে মরার বাড়া গাল। নেই, দে গোরে ধান।
সাফ মাথা। তা মনোহর তোমরা চাচার জমির ধান কাটে। তার বর্গা বুঝি? নাকি তারও চাচেরা লাগে।
সাদা ধবধবে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে রাজার গ্রামে যাওয়ার সড়কে। এই ভদ্রলোক তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলছে। যারা কাজ করছিলো তারা এই আকর্ষণেই কাজ ফেলে ক্রমশ নায়েবমশায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেলো।
তাদের একজন বললো–কও না, সামচাচা, মনোহরমশাইয়ের ফয়সলা। কেন ধানে মাটি। ডানকানের সুবিধার জন্যেই এই সড়ক হবে মনোহরের বাড়ির তল দে কুতঘাট পর্যন্ত।
নায়েব খুক করে হাসলো–তা সামসুদ্দি নাকি শ্যামাচাঁদ, তা যাই হোক জমির খাজনা নেয় কে?
-জী? সামসুদ্দিন, হুজুর। খাজনা লেয় না।
লাখেরাজ বুঝি? নায়েব হেসে উঠলো। কিন্তু হঠাৎ থামলো সে। কিছু যেন তার মনে এলো, কপালটা কোঁচকালো। তারপর তার বোধ হয় মনে হলো অনেক বেলা হয়েছে, সে গাড়ির দিকে ফিরলো। লোকগুলি কী করা উচিত বুঝতে না পেরে পায়ে পায়ে তার পিছন পিছন হেঁটে এলো গাড়ির দিকেই।
নায়েব যখন গাড়িতে উঠছে, সামসুদ্দিনের কী মনে হলো। ঝপ করে সত্যটা প্রকাশ করে ফেলো। আজ্ঞে, পেত্রোসাহেবকে খাজনা দিতাম না। বাপ ছিলো কারিগর। চাকরান স্বত্ব এই পাঁচ বিঘার। ফরাসডাঙার ছিটমহলে আজ্ঞা।
নায়েব বললো–এদিক ওদিক বুঝি সবই পেত্রোর ব্রহ্মোত্তর?
–আজ্ঞে, ব্রহ্মোত্তর? মানে তিনি তো খেস্টান; তা উদিকে রাস্তার পুবে হৈ শিমূল গাছ থেকে ইদিকেও রাজবাড়ির রাস্তার পুবে আর পশ্চিমে তাই। এ দুশো বিঘার টোকটা পেত্রোর ছিট শুনি।
নায়েবকীভাবলো, বললো–শোনো সামসুদ্দিন,আর এক কোদালমাটিও উঠবেনা। কাল প্রেভাতে আমিন আসবে, চেন আসবে। পেত্রোর ফরাসডাঙা এখানে ফালা হয়ে সেঁধিয়েছে, না? টোঁক? সাতপুরুষে জোলা, জমি বোঝো? কার জমিতে কে সড়ক বাঁধে, হ্যাঁ?
শেষ কথায় নায়েব হঠাৎ সাপটে উঠলো। আরে বাপ–বলে সামচাচা দুধাপ পিছিয়ে গেলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। চলতি গাড়িটার পিছনে সেলাম আদাব বলে সামসুদ্দির দল খানিকটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এই সাপটেই যেন চেনা চেনা লাগলো। দেওয়ানজি নিজেই নাকি?
গাড়ির ভিতরে বসে নায়েব নিজের বাঁ হাতের তেলোটা চোখের সামনে মেলে ধরলো। গাড়ি চলতে ঝাঁকুনি লাগে তাতেই যেন তার মুখটা আরো একবার কঠিন হয়ে উঠলো।
সে বললো–গিন্নি, সেই থেকে বসে ঝাঁকুনি খাচ্ছো। বাড়ি গিয়ে মাজা খুঁজে পাবে না; শাও দেখি।
প্রায় জোর করে সে শুইয়ে দিলো স্ত্রীকে।
বললো–এখন আর তামুক না, কী বলল। বেলা গড়িয়ে গেলো।
-তুমিই তো না হক সময় নষ্ট করে এলে।
–তাও বটে। নায়েব হাসলো। কিন্তু যেন রোদ লাগার ফলেই তার মুখটা শুধু থমথমে নয়, পোড়া পোড়া দেখালোতা তুমিও বাপুকমনও। সেই থেকে পাকা সড়ক লাল সড়ক করছিলে। এটা তোমার ধাত হলো দেখছি, কাঁথার নকশা নিয়েও এমন রাতভর বকর বকর করো। তাছাড়া ইংরেজ দেশের রাজা। ডানকানই দাখো লাল সড়ক করছে। সেই গল্প, সব লাল হো যায়গা। হ্মুঃ!
