.
দোল-উৎসবের আগের দিন ছিলো সেটা। রাজবাড়িতে উৎসবের আয়োজন শুরু হয়েছে। রানী নয়নতারাকে বললেন, তোমার কাজ শেষ হতে চায় না। বিকেলে বেড়াতে যাবে এমন সময় হয় না। তুমি কি নতুন জেটি ছাড়া আর কিছু দেখেছো? কাল সন্ধ্যার পরে শব্দ শুনে জানা গেলো সেই অ্যালবেট্রস জাহাজ নাকি আবার ভিড়েছে ঘাটে। ভোররাতেও তার ভো শুনলাম। নয়নতারা তো বুঝতেই পারছে, রানীর বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা। সে বললো, পালকী দিতে বলবো রানীমা?
রানীর সেদিন হাতি পছন্দ হলো। তারা দুপুর শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়লেন। তাতে অসুবিধা হলোনা। টোপর-হাওদার চারদিকের জানলার মাথায় বাইরে ছড়ানো ঢাকনা থাকে, জানলায় রেশমের পর্দাও। রানী সেদিন জয়নালকে পছন্দ করেছিলেন। অনেকটা উঁচুতেই সুতরাং সেই হাওদা। খানিকটা দূরে গিয়েই রানী বললেন–হাওয়া দিচ্ছে কিন্তু এখানে।
সেই বিকেলে অনেকটা সময় তারা বেড়ালেন। নতুন জেটিতে খানিকটা দূরে থেকেই একটা গাছতলায় হাতি থামিয়ে তাঁরা অ্যালবেট্রসকে দেখলেন। রানী বললেন, কত। জোরে বা চলে! যাই বলো বাপু, ইংরেজদের যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। একেবারে দাগাবাজ নয়।
নয়নতারার হঠাৎ মনে হলো, এটা কিন্তু সুলুপ নয়। দু-চারটে বন্দুকের গুলিতে এটা বানচাল হয় না।
রানীও বললেন–আচ্ছা, নয়ন, এটা পতাকা নয়? ওর নামই কি ইউনিয়ন জ্যাক?
সেদিন রানীর শখ হলো ফরাসডাঙার পথে ঘুরে বেড়াতে। মন্দিরের পাশ দিয়ে তারা ফরাসডাঙার প্রথম পথগুলোকে দেখে দেখে বেড়ালেন। অবশেষে যখন বিকেল হয়ে গিয়েছে রানী মাহুতকে বললেন–এদিকে একটা ডিয়ার পার্ক ছিলো। চেনো? নয়নতারাকে বললেন, জানো নয়ন, জমিটা চারপাশের জমি থেকে বেশ উঁচু। একসময় হরিণ থাকতো, এখন আর নেই। নয়নতারা কৌতূহল প্রকাশ করলে, রানী হেসে বললেন, কী জানি, খেস্টান ততা। নিজেই খেয়েছিলো হয়তো।
নয়নতারা বললো–দেখুন, রানীমা, কত পাখি! হাঁস নয় তো? নাকি বক?
রানী দেখতে না পেয়ে এদিক ওদিক চাইলেন। হাতিটা তখন কয়েক পা মাত্র চলেছে। নয়নতারা তার দিকের জানলা দিয়ে ঝুঁকেছিলো,হঠাৎমুখ সরিয়ে আনলো, বললো–রানীমা, সাহেব যে!
ততক্ষণে রানীমার চোখেও পড়েছে। হাতিটা এখন যেখানে তা থেকে স্পষ্টই তিন চারজন শ্বেতাঙ্গকে ডিয়ার পার্কের টিলার কাছে দেখতে পাওয়া গেলো। রানীমা হাতিকে গাছের আড়ালে নিতে বললেন।
নয়নতারা জিজ্ঞাসা করলো–অ্যালবেট্রসের নাকি? চড়ুইভাতি করছে?
রানী বললেন, সোভান, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, এবার ফিরে চলল।
.
সেদিন সন্ধ্যার পর রাজকুমারের কাছে বিদায় নিয়ে বাগচী রাজনগরে অগ্রগতির কথা ভাবছিলো। রাজকুমার বলেছিলো, গ্রামের পাশ দিয়ে রেললাইন গেলে গ্রামের উন্নতি হয় কিনা, হলে তা কেন হবে? বাগচীর মনে হচ্ছিলো সে ভালো যুক্তি দিতে পারেনি। কিন্তু কথাটা উঠেছিলো সন্ধ্যায় বাতাসে ভেসে আসা স্টিমশিপের হর্ন থেকে। রাজকুমার জিজ্ঞাসা করেছিলো, ওরা কি এখন যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করবে নিয়মিতভাবে? তাহলে তো একটা স্টেশনও করতে হয় ওদের। সেই স্টেশন থেকেই রেলের কথা উঠেছিলো।
চিন্তা বিচিত্র গতি নিয়ে থাকে। রাজনগরের অগ্রগতির থেকে বাগচীর মন চরণদের সমস্যায় চলে গেলো। বিষণ্ণ মনে সে ভাবলো, ভালো হবে বলে যা কিছু করেছে তার ফলেই তারা আরো বিপন্ন হয়ে পড়লো। অন্তত দুটো পরিবারকে উদ্বাস্তু হতে হলো।
তার এরকম মনে হলো, যা তার সাধ্যাতীত ছিলো তা করতে গিয়েই এই বিপত্তি। তার এরকমও মনে হলো, চরণের চরিত্রে অনেকখানি ছিলো আদর্শবাদ। সেই আদর্শবাদ এরপরে আর কখনো মাথা তুলতে পারবে কি? এ অবস্থায় তার এরকমও মনে হলো, পাদরির পক্ষে বাইবেলের বাইরে যাওয়াই ভুল হয়েছে।
সে রাত্রিতে ডিনারের আগে পরে সে চিন্তা করার জন্য অনেকক্ষণ স্টাডিতে বসে রইলো।
তার মনে পড়লো রাতের পর রাত জেগে মেমোর্যান্ডামগুলোকে তৈরী করেছিলো। সে কিছু পড়ার জন্য বুকশেলফটাতে খুঁজলো কিছুক্ষণ, কিন্তু কিছুই যেন পছন্দ হলো না। বরং লেখার অভ্যাসটাই তাকে প্ররোচনা দিতে থাকলো।
হঠাৎ বুদ্ধিটা মাথায় এলো তার। সে অস্ফুটস্বরে বললো–না, চরণ, আদর্শবাদের মৃত্যুটা অত সহজে মেনে নেওয়া যায় না, যায় কি? না, চরণ। তুমি তো তাহলেও রোগ সারাবে, কেমন কিনা?
সে আর একটু ভাবলো। মজা পেয়ে মিটমিট করে হাসলো। নিজেকে বললো, এতক্ষণ বুদ্ধিটা আসেনি।
এতেই প্রমাণ হয় আজকাল তেমন তীক্ষ্ণ করে সে ভাবে না আর। সে উঠে ডায়েরি ক্যালেন্ডার খুলে তারিখ খুঁজলো। গুড ফ্রাইডের তারিখটাকে পেয়ে মনের আনন্দে হেসে ফেলো। সেই পুনরুত্থানের সূচনা নয়? যখন আদর্শবাদ মৃত্যুর অতীত হয়? আঙুলে গুণে দেখলো গুড ফ্রাইডের আর পাঁচদিন বাকি।
সে কাগজ কলম টেনে নিয়ে তার চেয়ারে বসে পড়লো। পারতেই হবে, নিজেকে বললো–না পারলে চলবে কেন? সে মনে মনে চরণকে বোঝালো, চিকিৎসা তুমি ভালো শিখেছে বটে, কিন্তু ইংরেজি মেটেরিয়া মেডিকা বুঝতে তো অসুবিধা হয়ই। বাংলায় হলে? আপাতত বারোটা পলিস্টে।
বাগচী পাঁচদিনে বারোটা প্রধান ওষুধের রোগলক্ষণ–নিজের অভিজ্ঞতা, এবং মেটেরিয়া মেডিকার অনুবাদের সাহায্যে লিখতে শুরু করলো।
সেদিন রাত এগারোটার সময় কেট এসেছিলো একবার খোঁজ নিতে। বাগচী হেসে বললো, যাচ্ছি ডারলিং, কিছুই না। প্রকৃতপক্ষে গুড ফ্রাইডের কথা মনে হলো। তুমি যাও, আসছি এখনই।
