.
০২.
সকালটা অন্যদিনের মতোই শুরু হয়েছিলো চরণের। বনদুর্গা জল পান তামাক দিয়ে বললো, আজই অমর্ত্যমামাদের শেষ দোল মরেলগঞ্জে, তুমি তোমার ছেলে, আর অমর্ত্য মামার ছেলেকে নিয়ে একবার যাও। চরণ এসব ব্যাপারে বনদুর্গার কথা সহজেই মেনে থাকে। কিন্তু আজ সে বললো–তার মন ভালো লাগছে না। দোলের আর আনন্দ কোথায়?
চরণ যখন কৃষ্ণানন্দের বাড়ির কাছাকাছি তখন বেলা দশটা বাজে। অন্যান্যবার সে কি এরকম সময়ে আসে, কিংবা আরো আগে? অন্যান্যবার এ সময়ে মৃদঙ্গের শব্দ শোনা যায়। সে ভাবলো, লজ্জা হতেই পারে। মানুষ যখন কেবলই হেরে যেতে থাকে তখন তার তো মনে হয়ই আমার আবার উৎসব কেন? আর আজ কিনা মদন-বিমোহন যাঁর রূপ, তাকে। রং দিয়ে, ফুলের সৌরভ দিয়ে সাজাবে। বোধ হয় চুপচাপ ফিরে যাওয়াই ভালো।
অমর্ত্যর বাড়ি আগে পড়ে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিঃসাড় দেখে সে ভাবলো, সকলেই তাহলে কৃষ্ণানন্দের বাড়িতে পূজার কাজে। সে নিজেকে বোঝালো, তা ভালো, বিপদে একত্র হতে হয়। কৃষ্ণানন্দর বাড়িতে মানুষের সাড়া পাওয়া গেলো। তার বাইরের দিকের ঘরেই বেশ কয়েকজন মানুষ। চরণ ঢুকতে ঢুকতে দেখলো কৃষ্ণানন্দ ছাড়াও পাড়ার দু-চারজন পুরুষ আছে, একপাশ ঘেঁষে কৃষ্ণানন্দর পরিবার ছাড়াও স্ত্রীলোকও কয়েকুজন। চরণকে ঢুকতে দেখেই তাদের একজন হু হু করে কেঁদে উঠলো। এসবক্ষেত্রে মেয়েদের দিকে চাওয়া হয় না। কিন্তু আনন্দের দিন তো বটে, তখন এ রকম হলো কেন? যেন এই ভেবে চোখ তুলে চরণ দেখলো, যে কেঁদে উঠলো সে অমর্ত্যর স্ত্রী বটে।
কৃষ্ণানন্দ বোধ হয় নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে যদিও সেই প্লাবনে পাড় ভেঙে পড়া থেকে বাঁচানোর মতো মহীরুহ সে নয়। সে তো নিজেই থরথর করে কাঁপছে। সে বললো–দ্যাখো, চরণ, এই চিঠিটা অমর্ত্যর বিছানায় ছিলো।
ফাঁকা কাগজে একছত্র লেখা : চললেম, সখি। অমতাঁর বাইরেটা শক্ত ছিলো, বলবান ছিলো সে, কিন্তু রসিকতা ছিলো নিজেদের মধ্যে। এটা তার স্ত্রীকেই লিখে থাকবে। কিন্তু এই দুঃসময়ে এটা কী রকম রসিকতা? স্ত্রী বলেছে, অমর্ত্য তার মাথা খারাপ হওয়ার আগে কখনো কখনো তাকে সখি বলতো বটে। তাই বলে ভোররাত থেকে মানুষটার দেখা নেই! তাছাড়া কৃষ্ণানন্দ কোমরের কাপড় থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বার করে বললো, আমি তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম চরণ, এই চিঠিটা তোমাকে লেখা ইংরেজিতে, তাই আমি পড়িনি। চোপ, ফের কাদছো তোমরা! এই বলে ঘরের স্ত্রী পুরুষকে ধমকাতে গিয়ে কৃষ্ণানন্দ নিজেই ভ্যাক করে কেঁদে ফেলো।
কৃষ্ণানন্দ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো–গোপালদার এক কিষাণ কুতঘাট থেকে এদিকে। আসছিলো, তার হাতে এই চিঠিটা দিয়েছে সেই ও সুলিভান।
চিঠিটা ইংরেজীতে লেখা নয়, চরণকে লেখাও নয়। এতক্ষণ এই মিথ্যা ছলনায় কি কৃষ্ণানন্দ এই বিপন্ন বিহ্বল লোকগুলিকে শান্ত রাখছিলো? সে কি ভেবেছিলো এত বড়ো দুর্ভাগ্যের কথা প্রকাশ করে শত্রুকে হাসতে দেওয়া যায় না? তার হয়তো মনে হয়েছিলো কিছু করতে হলে চরণের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া দরকার।
অমর্ত্য লিখেছে :
কৃষ্ণদাদা, তুমি আমাকে মানুষ করেছো। তোমাকে ছেড়ে যেতেও কষ্ট। সাহেব বলেছে সে দেশ নতুন, সেখানে নীলচাষ নাই। জমি বিক্রির টাকা রাজকুমারের কাছে গচ্ছিত আছে। তা দিয়ে বউ-ছেলেকে…(লেখাটায় এখানে জলের দাগ)…চরণকে বলো সে যেন আমাকে না খোঁজে। মাঝরাতেই আমরা দূরে চলে যাবো। এইটুকু শুনেছি, সে দেশের নাম মরিস। অ্যালবেট্রস…(এখানে লেখায় জল পড়েছে, তা মোছর চেষ্টায় লেখাও মুছে গিয়েছে)।
চরণ লাফিয়ে উঠে ছুটতে শুরু করলো। সে তো জানেই কুতঘাটের নতুন জেটিতে অ্যালবেট্রস বাঁধা আছে।
সে কুতঘাটে পৌঁছে অ্যালবেট্রসকে দেখতে পেলোনা। একটা জেলেনৌকো ভিড়লো। চরণ তাকে জিজ্ঞাসা করতেই জানলো মাঝরাতে মাইলচারেক আঁটিতে তারা কলের জাহাজকে পেরিয়েছে বটে।
চরণ ফোঁপাতে লাগলো। সে বুঝতে পারলোনা যাকাঁপছে, ভেঙে পড়তে চাচ্ছে, তাকে চোখে দেখতে দিচ্ছে না, তা আলো ঢালা নদীর জল কিনা।
১৫. রানীর পক্ষে সংবাদ পাওয়া
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
০১.
রানীর পক্ষে সংবাদ পাওয়া কঠিন নয়। কাছারির লোক ছাড়াও তাঁর নিজেরও তো সংবাদ সরবরাহের ব্যবস্থা ছিলো। বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যেত বলেই তো তার কাছে পৌঁছানো সংবাদকে নির্ভুল মনে করা হতো। সিদ্ধান্ত নিতেই যেন দেরী হচ্ছে। তিনি জানেন অ্যালবেট্রসের লোকেরা চড়ুইভাতি করতে নামেনি। তিনি জানেন সেই সাহেবের দলে মরেলগঞ্জের নীলকররা ছিলো; কালেক্টর, যার নাম ম্যাকফার্লান ছিলো; কলকাতা থেকে আসা এক সাহেব ছিলো, যার নাম সিবাস্টিয়ান, বলে, সে নাকি পাদরি। তারা ডিয়ার পার্কের টিলার উপরের দিকের কয়েকটা মেহগ্নি গাছ ইতিমধ্যে কেটেছে। তারা সেদিন জরিপ করছিলো। ওখানে একটা চার্চ বসাবে। তারা জায়গাটাকে খুব পছন্দের মনে করেছে। এমন ঢেউ খেলানো জমি আর এদিকে কোথায়? অন্যদিকে প্রজাও নেই, পিয়েত্রোর খাসে ছিলো। কাউকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও নেই। চার্চ আর মিশনারি সাহেবদের বাংলোর পক্ষে এমন জায়গা আর হয় না। সামনের গুড ফ্রাইডে, পবিত্র দিন, সেদিনই চার্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হবে। চার্চের নামও নাকি হবে চার্চ অব দা হোলি অ্যাসেনশন।
