বাগচী ও কেট কারোপক্ষেই সরঞ্জনের বক্তব্য বুঝতে সহজ হলো না। বাগচী এমনকী কল্পনা করলো, নিয়োগী হয়তো কৈলাশ পণ্ডিতের সেই অবিবাহিতা কন্যার কথা কিছু বলছে। বাগচী বললো–এ সম্বন্ধে কি কাছারিতে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে?
সর্বরঞ্জন বললো–সেটাই তো বিপদের উৎস। আপনি কি শোনেননি? নয়নতারা নামে এক অবিবাহিতা স্ত্রীলোককে রাজকুমার বাগানবাড়ি কিনে দিচ্ছেন, তাও প্রকাশ্যে?
বাগচী প্রায় হেসে ফেলো–কেটের মুখে তো হাসি খেলা করলোই! সে খুব মৃদুস্বরে বললো, সেন্ট বটল?
সেন্ট বটলের ব্যাপারটা মাথায় না ঢুকলেও সেই সকালে নিয়োগী বাগচী এবং কেটকে প্রায় বিপর্যস্ত করে দিতে পেরেছিলো। সে অনেকবার শুরু করে, মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে, আবার শুরু করে, ডাইনে বাঁয়ে মাথা দুলিয়ে, দু-একবার লাল হয়ে বাগচীকে বুঝিয়ে দিতে পারলোয়নতারা একজন অবিবাহিতা স্ত্রীলোক। তাকেই রাজকুমার বাগানবাড়ি তৈরী করে দিচ্ছেন, ঠিক তখনই, যখন কলকাতার এক কুসুম কোমল কুমারী কন্যার সঙ্গে তার বিবাহ প্রায় স্থির। সে কী করে বা এই পাপে অংশ নিতে পারে? কেননা এখানে সত্য গোপন করা কি পাপে অংশীদার হওয়া নয়? বিশেষ সেই কন্যা যখন হিন্দুনয়,বরংনবধর্মের বিশিষ্ট সদস্য, এমনকী ইংরাজি-দক্ষা আধুনিকাও বটে।
বাগচীকে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে থাকতে হলো। তার এবং কেটের একটা আনন্দোজ্জ্বল ধারণা। যা রাজকুমারের বিবাহ সম্বন্ধে তাদের আনন্দের কারণ হয়েছিলো সেটা কি কলঙ্কিত হবে? কেটের মুখটা শুকনো দেখালো। কিন্তু বাগচী বললো, একে অন্যের কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ দিতে পারেনা। আমি আপনাকে এই বলতে পারি, রাজ-পরিবারে এরকম ঘটে থাকে। আপনি প্রচার করবেন কিনা আপনার বিবেচনার বিষয়।
সর্বরঞ্জন নিয়োগী নিতান্ত চিন্তাকুল মুখেই চলে গেলো।
সে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে কেট জিজ্ঞাসা করলো–তুমি কি এখন রাজবাড়িতে যাচ্ছো?
-হ্যাঁ, দশটা বাজে। আমি তো কাছারির নিয়মে বসি না। বাগচী রাজবাড়িতে যাওয়ার জন্য টুপি হাতে করলো। তার মুখটা অস্বাভাবিক কঠোর দেখালো।
১৪. বসন্ত যেন আগে এসেছিলো
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
০১.
ইতিপূর্বে বলা হয়েছে, বসন্ত যেন আগে এসেছিলো রাজনগরে। এখন তো চৈত্র এসে গেলো। অনাবৃষ্টিতে নদীর জলও শুকিয়ে উঠছে। কিন্তু দোলও এসে পড়েছে। ঘাটের কাছে সকালের থেকেই যেন প্রচ্ছন্ন একটা জ্বালা অনুভব করা যায়। খরার কথা উঠে পড়ছে। স্মরণকালে এমন হয়নি।
সেদিনটা অন্যদিনের মতোই। বাগচীকে রাজবাড়িতে যেতে হয় বলে সে বরং বেশ সকালেই চরণের ডিসপেনসারিতে যায়। কিন্তু রোগী আজকাল যেন কমেছে। বাগচী বেশ গম্ভীরভাবেই বললো–দ্যাখো, চরণ, বাদলা ভাব না থাকায়, জ্বর, সর্দি, পেটের পীড়া কম। চরণও তেমন গম্ভীরভাবেই মন্তব্য করলো–এতো শুকনোবসন্ত, বসন্তনা লেগে যায়। বাগচী বললো–রোগটার সঙ্গে কিন্তু ঋতুর যোগ নেই।
এটা তো দুজনেই লক্ষ্য করছে রোগীর সংখ্যা খুবই কম। বিশেষ মরেলগঞ্জের রোগী গত কয়েকদিনে একটিও আসেনি। সেখানে পুরাতন রোগের রোগী কোনো অঞ্চল থেকেই কমনয়। বাগচীর একবার মনে হলো সে জিজ্ঞাসা করে, মামলার খবর চরণ আর কিছু শুনেছে কিনা। কিন্তু তার বরং এই অদ্ভুত অনুভূতি হলো, ডানকান মামলা করছে, উকিল ব্যারিস্টারে অনেক খরচ করবে, তার চাইতেও বড়ো কথা সে অনেকগুলি লোককে হলফ করে ঈশ্বরের নামে মিথ্যা বলতে বাধ্য করবে। এই সময়ে একটি অপরিচিত ভীত চেহারার বালককে চরণের বাড়ি থেকে বেরোতে দেখে বাগচী তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো। চরণ বললো, অমর্ত্যর ছেলে। অমর্ত্যর স্ত্রী কন্যা এখনো মরেলগঞ্জে আছে। দোলের পূজা করে তারা রাজনগরে চলে আসবে। কৃষ্ণানন্দও সেদিন থেকেই উঠে আসবে। আপাতত তারা চরণের বাড়ির কাছেই তারই জমিতে ঘর তুলে নেবে।
বাগচী বললো–ওদের তো মরেলগঞ্জের সঙ্গে কোনো যোগই থাকলো না।
রাজবাড়ির দিকে যেতে যেতে বাগচীর মনে হলো, পড়া টাইমসগুলোকে ফেরত দিয়ে নতুন টাইমস আনতে হয়। সুতরাং সে কুঠিতে ফিরে তার স্টাডিতে ঢুকলো। কেট এখন খানিকটা সময় বিশ্রাম করে। অনেকসময়ে বাগানে গিয়ে বসে।
সুতরাং তার খোঁজ না করেই সে স্টাডি থেকে বেরিয়ে আসছিলো। এই সময়ে তার মনে হলো, পার্লারে কেউ কথা বলছে। হয়তো রাজকুমার–এই ভেবে উঁকি দিয়ে সে অবাক হলো।
পার্লারে রাজকুমারের বদলে ও সুলিভান। বোঝা যায় সে কিছুক্ষণ এসেছে। তার সামনে ধোঁয়াচ্ছে এমন কফির কাপ। বাগচী হাসিমুখে বললো–বনাত কিনছো নাকি, কেট? নাকি সিল্ক, এখন গরম পড়বে তো?
কেটও হেসে বললো–না, মিস্টার ও সুলিভানের সঙ্গে গল্প করছিলাম।
–বেশ, করো। আমি রাজবাড়িতে যাচ্ছি। বলে বাগচী বেরিয়ে গিয়েছিলো।
লাঞ্চে কেট বললো, ভারি মজার কথা, বাগচী, ওসুলিভান বলেই ফেলো, আমিই নাকি প্রথম ইউরোপীয়ান মহিলা যে তাকে বসতে বলেছে, নিজে থেকে কথা বলেছে, বাড়িতে ঢুকতে আমন্ত্রণ করেছে।
বাগচীর মন তখন প্লেটে, মনের অন্য অংশে বোধ হয় কেটের সান্নিধ্য ও রাজকুমারের ফেনসিং অভ্যাসের কথা সমানভাবে। সে মনের উপরিভাগ থেকে বললো– হেসে, তাহলে দ্যাখো হেট দা সিন, নট দা সিনার–এই উপদেশটা কত কম লোকে মানে। তাছাড়া দেখা যাবে হয়তো ও সুলিভান দরিদ্র বটে, পিতামাতার সিনের ফলভাগী, নিজে সিনার নয়।
