নায়েব বললো– রাজকুমার, তা কি ভালো দেখায়? ডানকানরা খাজনা দেয় না, লীজে একবারে আগাম দিয়েছে। কিন্তু মরেলগঞ্জের দরুন লাট তো আমরাই দিই। প্রজার জমি খাস করা যায়, আপনার নামে কেনা যায় কি?
একজন ভৃত্য ও একজন দাসী চরণদাসদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলো। রাজকুমার বললো–তোমরা কি নয়নতারা-ঠাকরুনকে চেনো? তিনি যদি রাজবাড়িতে থাকেন, এখনই একবার তাকে দরবারে আসতে অনুরোধ করো। রাজচন্দ্রের মুখে একটা বিচিত্র হাসিই যেন। সে বললো–খাও তোমরা, চরণ। সে যেন মনে মনে এমন লোক খুঁজতে লাগলো যে এদের জমি কিনতে পারে অথচ ডানকানকে পরোয়া করবে না।
নায়েবমশায় অনুমতি নিয়ে চলে গেলো। নয়নতারা এলো। এই সময়ে রাজচন্দ্ৰ হেসে উঠেছিলো। সে বললো–বসো নয়ন, এরা সকলেই আমায় কিছু করতে বলছে। সে গলা তুলে বললো, নায়েবমশায়কে আবার ডাকো তো। নয়নতারাকে বললো, তুমি একদিন জমি নিয়ে বলেছিলে, এদেরও সেই সমস্যা। জমি আর স্ত্রী কিংবা মা কিন্তু এক নয়। জমিকে মাথায় করে পালানো যায় না।
বিব্রত নয়নতারা কী বলবে খুঁজে পেলো না।
রাজচন্দ্র মৃদু মৃদু হেসে বললো–রসো, নায়েবমশায় আসুন।
নায়েব তখনো কাছারি পৌঁছায়নি যখন তাকে ভৃত্য আবার ডেকে আনলো।
রাজচন্দ্র বললো–আসুন, আসুন। তোক খুঁজছিলেন তো মনে মনে একশো বিঘার। জমিটা আমি যদি নয়নতারার নামে কিনি?
নায়েবও কী বলবে খুঁজে পেলো না। এটা কেমন এক লজ্জার ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে না? -লজ্জা এবং অবিবেচনার?
রাজচন্দ্র বললো, হ্যাঁ, এই ঠিক হয়েছে। তোমরা রাজী হয়ে যাও। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিটা নয়নঠাকরুনই আমাকে দিয়েছিলেন। এদের কথাও থাকছে। নয়নঠাকরুনকে ডানকান নীল বুনতে বলবে না নিশ্চয়। তাছাড়া, নয়ন, এরা যেমন চাইছে তাও নয়। জমিকেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়। ওটা এক একশো বিঘার দীঘি হতে পারে।
নয়নতারা খুব মৃদু করে বললো, রাজকুমার! কিন্তু চাঁদরের ঘোমটা থাকায় সেই মৃদুস্বরকে যে-ভঙ্গি অর্থবহ করবে তা প্রকাশ পেলো না।
রাজকুমার বললো–এই ভালো হলো, নয়নতারা। ও জমিতে আর চাষ হতে হয় না। ও জমি আমার চাই। বুঝেছো তোমরা? বৈশাখের আগেই,নয়ন, ওই মার্টিটুকু কেটে উড়িয়ে দেওয়া যাবে। একটা দীঘি, কিন্তু এমনভাবে কাটবে যেন বৈশাখে জল আসে। তারপরে লম্বার দিকটা চওড়া করে আবার কাটাব, ফের লম্বার দিকটাকে চওড়ার দিক করে দিলে তোমার একশো বিঘা ঢেকে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা দীঘিই হবে। তোমরা খাও। আমি এবার উঠবো। নায়েবমশায়, আপনি এদের আগাম দিয়ে বায়নাপত্রে দস্তখত নিয়ে রাখবেন। কিংবা নগদে দাম চায়, দিয়ে দেবেন, আর তা আজই। নয়নঠাকরুনের যদি সই করতে হয়, ইনি আপাতত রাজবাড়িতে থাকবেন।
নয়ন স্তম্ভিত,নায়েবমশায় বাকরুদ্ধ। তখন বোধ হয়, চরণদাসদের মাথা ঝিমঝিম করছে।
নয়নতারা কিছু বলতেই হবে এরকম ভেবে মিনমিন করে বললো–আমাকে কি সই করতে হবে?
নায়েব কথা খুঁজে পেয়ে বললো–তা তো করতেই হবে, মাঠাকরুন।
রাজু বললো–চলো নয়নতারা, সারাদিন আজ স্নানাহার করতে দিলে না। কী পুকুর তোমার মাথায় ঢুকেছে। অবশ্য একশো বিঘার দীঘি না করে একটা ভালো বাড়ির জন্যও জমি ছেড়ে রাখা যায়। তোমার বাড়ি হলে আমিও কি যাবো না মাঝেমাঝে? চরণ, অমর্ত, কৃষ্ণানন্দ, খাও তোমরা। না খেয়ে যেয়ো না। ভয় নেই তোমাদের। নায়েবমশায় তোমাদের জমির ন্যায্য দাম দেবেন।
.
তখনকার দিনেও এমন মত ছিলো, ধনাঢ্যদের পীড়া একসময়ে প্রকাশ পাবেই। কাছারির লোকেদের যাদের ঘটনাটা সেই সন্ধ্যার আগেই টাকার অঙ্কসমেত জানা হয়েছিলো তাদের মনোভাব এ রকম হলো :সম্বন্ধটা যে কোনোভাবেই প্রকাশ পেতে পারতো। তাদের কেউ কেউ এ রকম চিন্তা করলো বরং–গোলমাল বাধার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। সে গ্রামে তখন ন্যায়নীতি নিয়ে চিন্তা করার লোকও ছিলো, যাদের পক্ষে ধনাঢ্যদের পীড়া বলেই উপেক্ষা করা সম্ভব ছিলো না। এরকম সংবাদ কাছারির বাইরে যেতে কিছু সময় লাগে, কিন্তু যেহেতু নরেশ, সুরেন প্রভৃতি জমি বিক্রির ব্যাপারটা চরণের সঙ্গে আলাপ করেছিলো, সংবাদটা নিয়োগীর কানে একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলো।
তাতে তো এখন অধ্যক্ষের কাজও কিছু কিছু করতে হচ্ছে, সুতরাং সেও দুএকদিন সংবাদটাকে নিজের মধ্যে ধরে রাখতে বাধ্য হলো। কিন্তু রবিবার এসে যাওয়াতে সে সকালের দিকেই বাগচীর কুঠিতে উপস্থিত হলো। বিষম বিপদ যে, এই ঘৃণার ব্যাপারটা সেখানে কীভাবেই বা আলোচনায় আনা যায়। অন্যত্র এই এক সুবিধা থাকে যে গৃহের মহিলারা আলোচনায় যোগ দেন না, অথবা ইংরেজি বোঝেন না। এক্ষেত্রে তো ইংরেজিতে আলোচনারও সুবিধা নাই। কিন্তু কর্তব্য তোকর্তব্যই বটে। তাছাড়া ঋষিপ্রতিম ওয়ার্ডসওয়ার্থ কি কর্তব্যকে স্বয়ং ঈশ্বরের গম্ভীরা কন্যা বলেন নাই? অন্যদিকে সে-ই-বা কলকাতার সমাজে কীভাবে মুখ দেখায়? দিদি ব্ৰহ্ম-ঠাকুরানীই বা অতঃপর কী করেন? না, না, এ আমাকে বলতে হবে, অবিবাহিত একটি স্ত্রীলোককে পুকুরসমেত বাগানবাড়ি করে দেওয়াকে তাই বলে, ধনাঢ্যদের পীড়াই।
সর্বরঞ্জন সেদিন যত কম কথায় সম্ভব বাগচীর সঙ্গে আলোচনা করবে স্থির করে নিলো। সে প্রায় বসতে বসতেই বললো, এটা আমাদের স্কুলের বিষয় নয়, এ থেকে আমরা কানে আঙুল দিয়ে দূরে থাকতে পারতাম, কিন্তু একটি কুমারী কন্যার সর্বনাশকে তো আর নিশব্দে উপেক্ষা করা যায় না।
