–যে এদের স্ত্রী আছে?
নয়নতারা অবাক হলো। সে একবার হাসিমুখে বলতে গেলে, সেই চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু তার আগেই রাজচন্দ্র বললো–আচ্ছা নয়নতারা, তুমি কি কখনোই আমার হবে না?
নয়নতারার চোখে জল এসে যাচ্ছে। সে অনুভব করলো, কথা বলতে গেলে ঠোঁট দুটোকে শাসনে রাখা যাবে না। ফুঁপিয়ে উঠবে নাকি শেষে? সে সেসবের পাশ কাটিয়ে হাসিমুখে পৌঁছালো। বললো–সেই কবে থেকেই এই দ্যাখো, সেই আংটিটা আজ আবার পরেছি।
সে যেন নিজের হাতটাকে রাজচন্দ্রর চোখের সামনে ধরবে। কিন্তু রাজকুমার হাতজোড় করেছে কি? তেমনভাবে কি কিছু বলছে? সে দেখতে পেলো না, শুনতে পেলো-স্ত্রীরা যেমনভাবে পুরুষের নিজের হয়?
নয়নতারা দুএক মিনিট দম বন্ধ করে বসে রইল। নিচের দাঁত ঠোঁটে চেপে ধরে চোখের জল ঝরে না যায় এমন করে মাথাটাকে ডাইনে বাঁয়ে দোলালো।
একসময়ে রাজচন্দ্র হেসে উঠলো। চলো নয়ন, আজ আর শিকার হবে না।
.
০৩.
তারা যখন রাজবাড়ির হাতায় ঢুকছে বেলা দুটোর ঘণ্টা পড়লো। নয়নতারা বলতে গেলো, আজ সারাদিন স্নানাহার হলোনা। তখন কাছারি আবার বসেছে। কাছারির চত্বরে তো মানুষ জনের ভিড়ই। হাতিটা চলছে, তা সত্ত্বেও সেই ভিড়ের দুএকজন যেন হাতিটার দিকে এগোলো। হাতি বসলে রাজকুমার তাদের একজনকে চরণদাস বলে চিনতে পারলো। কাছারির একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে বললো, এরা সকাল থেকে হুজুরের সঙ্গে দেখা করতে এসে বসে আছে। এখন কি তাই বলে দেখা হয়?
রাজচন্দ্র বললো–এদের দরবারে বসাও।
তারা চলে গেলে নয়নতারাকে নামতে সাহায্য করলো রাজচন্দ্র। বললো–দেখেছো, এদেরও খাওয়া-দাওয়া হয়নি আজ। তুমি কি এখন বাড়িতে ফিরবে? যদি পারো থাকো না হয়, বিকেলে কথা বলবো।
নয়নতারাকে বাড়িতে যেতে হলেও তো রানীকে বলে যেতে হয়। অন্দরে যেতেই হবে। সকালের সেই দৃশ্যটার কথা কি এতক্ষণে সর্বত্র ছড়ায়নি? একরকম লজ্জায় নয়নতারার পা দুখানা যেন পড়তে চাইছে না। কিন্তু রাজচন্দ্র বললো, শোনো নয়ন, এক কাজ করো না হয়। কাউকে বলে দাও এদের কিছু খেতে দেবে।
চরণ তো রাজকুমারের পরিচিতই। তাদের বিপন্নতার কথা সে বরং তাদের চাইতেও বেশি জানে। তারা হয়তো এখনো সেই মামলার কথা শোনেনি যা রাজ বাড়ির চরেরা সংগ্রহ করেছে ইতিমধ্যে। দরবারের আসনে বসেই রাজচন্দ্র সেজন্য বললো, তোমরা কী ভেরে এসেছো? আমি তোমাদের জন্য কী করতে পারি? তোমরা কি মরেলগঞ্জের জমি ছেড়ে চলে আসতে চাইছো?
তারা কী বা বলতে পারে? তাদের সমস্যার কি কোনো সমাধান আছে কোথাও? চরণ দুএকবার কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলো। রাজচন্দ্র ভাবলো, এই সময়ে মরেলগঞ্জের বাড়ি জমি ছেড়ে আসতেই বা এদের কীরকম লাগবে? তার মনে পড়লো, নয়নতারা একদিন জমি সম্বন্ধে কীসব বলেছিলো। সে তাদের চুপ করে থাকতে দেখে বললো, আচ্ছা, এ কি সত্যি সেই জমি যার জন্য তোমাদের কষ্ট, অপমান, তা ছেড়ে আসতে কী তোমাদের খুব কষ্ট হয়? এ কি সত্যি যে সেই জমি তোমাদের আত্মীয়স্বজনের মতো আপন হয়ে যায়?
চরণ বললো–সে জমি যদি আমরা ছেড়ে দিয়ে আসি, তাতে কিন্তু ডানকানেরই সুবিধা। যে কিনবে সে তো তার কথাতেই সেই নীল চাষই করবে।
রাজচন্দ্র ভাবলো, ওটা হয়তোনয়নতারার ভাবুকতা যে জমিকে অনেক স্মৃতিতে জড়ানো জননীর মতো মনে হয়। চরণ বললো–রাজকুমার, বাপ-পিতামোর কথা মনে এসে যায়। তাদের কষ্টের, আদরের, যত্নে বাড়িয়ে তোলা জমিকে ডানকানের লোভ থেকে বাঁচাতে ইচ্ছা করে। সে জমি যদি বিক্রি করতে হয়, ইচ্ছা হয় যে তা এমন কেউ নিক যে ডানকানকে ছুঁতে দেবে না।
রাজচন্দ্র বললো–চরণ, তোমাকে একটু কষ্ট দিই, নায়েবমশায় এসে থাকবেন, তাকে এখানে একটু আসতে বলল।
চরণ নায়েবকে ডাকতে গেলে রাজচন্দ্র পরিচয় নিয়ে জানলো বাকি দুজন অমর্ত্য আর কৃষ্ণানন্দ। তাদের দুজনের এবং চরণের জমি পাশাপাশি। যোগ করলে একশো বিঘায় দাঁড়াবে। জমিগুলো সবই মরেলগঞ্জ রাজনগরের সীমা ঘেঁষে।
সে বললো, নায়েবমশায় খোঁজখবর করে বিলমহলে তোমাদের জমি দিতে পারবেন। হয়তো পাশাপাশি হবেনা, কাছাকাছি হবে, এমন করা যাবে। কিন্তু ওটা কি হয়, যে তোমাদের মরেলগঞ্জের জমি নেবে সে ডানকানকে জমি ছুঁতে দেবে না? এমন তো করা যায় না। তোমাদের মরেলগঞ্জের জমি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। এ তো সত্যি মা নয় যে বুড়িকে মাথায় নিয়ে পালাবে? রাজকুমার হাসলো।
নায়েব এলে রাজচন্দ্র তাদের সমস্যার কথা বলে বললো–এদের একটা ব্যবস্থা করুন, তাই বলে ডানকানকে ধরে এনে পিটিয়ে দেওয়ার কথা ভাববেন না।
নায়েব হেসে বললো, খুব কড়কে দেওয়া যায়, বছরখানেক মুখ নিচু করে চলবে। তাতে কিন্তু রানীমার মত নিতে হবে। এদের না হয় জমি দেওয়া গেলো, কিন্তু মরেলগঞ্জের মায়া তো ছাড়তেই হবে। ছেলেমানুষি কি চলে? সে জমি যে কিনবে তাকে তো ডানকানকে মানতেই হবে। নীলের ফসল ভোলা চাই।
রাজচন্দ্র বলতে গেলে, দেখলে চরণ, দেখলে অমর্ত! কিন্তু সে কিছু ভাবলো। তার মুখের হাসিটার অর্থ ধরা যায় না, কিন্তু বোঝা যায়, চিন্তাটা বিচিত্র খাতে চলেছে। সে বললো, নায়েবমশায়, এরা চাইছে জমিটা এমনভাবে বিক্রি হোক যাতে বরং পতিত থাকবে কিন্তু ডানকানের জোর খাটবে না। তোক না ওটা রাজবাড়ির নামে কিংবা আমার নামে কেনা!
