হতচকিত নয়নতারা পিছন পিছন, কখনো পাশে, অন্দর পার হয়ে একতলার অলিন্দ দিয়ে হাঁটছে তখন, রাজু গলা তুলে বললো–রূপচাঁদকে বলো, হাওদা-হাতি আনবে।
নয়নতারা বলতে গেলো এভাবে কোথায়?
ততক্ষণে রাজচন্দ্র দরবারের হল পার হয়ে গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়েছে। সে বললো–তোমার কি চাদর ছাড়া খুব অসুবিধা হবে নয়ন? কাজটা আমি হয়তো ভালো করলাম না। রূপচাঁদ তোমাকে দেখে গেলো, সে টোপর-হাওদা আনবে।
তারপর সে হাসলো, বললো–চলো না নয়ন, আজ একটু বেরিয়ে আসি।
হাতি তখন গ্রামের পথ ছাড়িয়ে বনের দিকে চলে এসেছে। রাজচন্দ্র বললো–তোমার সঙ্গে কথা না বললে আমার চলছিলোনা। নয়নতারা হাত বাড়িয়ে টোপর হাওদার ছাদ থেকে ঝোলানো পর্দাটা ফেলে মাহুত থেকে নিজেদের আলাদা করে নিলো।
রাজচন্দ্র পাশের খিলান দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে ছিলোনয়নতারার থেকে মুখ আড়াল করে। হেসে বললো–একবার দ্যাখো নয়ন, হরদয়ালের কীর্তি, গাছের উপরে বাড়ি। কিন্তু নয়নতারা সেটাকে দেখলে কি না দেখলো, রাজচন্দ্র বললো, নয়ন, তোমার সঙ্গে দু-আড়াই মাস দেখা হয় না। আচ্ছা নয়ন, তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো? আমি আর রাজকুমার নেই বলে? তুমি কি দরজায় বসানো কামান দুটোর মতোই আমাকে জাল মনে করো?
নয়নতারাকে একটু ভাবতে হলো। চেষ্টা করে সে হাসি আনতে পারলো না। বললো, তোমার খোঁজ নিইনি বললে ঠিক বলা হয় না। তোমার বাজনা মাঝেমাঝেই শুনি। হৈমীদিদি তোমার সব ব্যাপার দেখছে তো। সে তাড়াতাড়ি নিজের কথা থেকে সরে আসতে বললো, এই হৈমীদিদি, সেই ছ-আনির কুমার, এদের কথা বেশ আশ্চর্য না?
খানিকটা দূরে গিয়ে রাজচন্দ্র বললো, হাতিটা ছেড়ে দিই। কাছে থাকো। চলো আমরা হাঁটি। এই বনে ছোটো একটা নদী আছে। তার উপরে লাটের জন্য ছোটো কিন্তু মজবুত সাঁকো হয়েছিলো। চলো দেখি গে।
হাতি থেকে নেমে তারা পায়ে হেঁটে চললো।
যখন অনেক কথা বলতে ইচ্ছা করে তখনই যেন কথা বলা যায় না। সাঁকো পেরিয়ে প্রায় একশো গজ হেঁটে একটা ঘাসে ঢাকা জমি দেখে রাজচন্দ্র বললো, এসো বসি। দ্যাখো পাখি ডাকছে। তুমি একবার আমার সঙ্গে শিকারে আসবে বলেছিলে,দ্যাখো আজ তা হলো।
রাজচন্দ্র বললো, ইতিমধ্যে দুএক বিকেলে তোমার বাড়িতে গিয়েছিলাম। দু বারই শুনলাম, তুমি রাজবাড়িতে। অনুমান, রানীমহলে লুকিয়ে থাকছে।
–হুকুম করলেই আসতাম।
হুকুম, নয়ন?
নয়নতারা মুখ নামিয়েছিলো, মুখ তুলে বললো–আমাকে কিছুদিনের ছুটি দিতে হবে, রাজকুমার। মামাবাড়ি যাবো।
-তোমার মামাবাড়িও কাশী?
–মহাভারত পড়তে গিয়ে দেখি এখনো অনেক জায়গা স্পষ্ট বুঝি না।
–গত তিন-চার বছরেও হলো না? সেবার আমি পশ্চিমে গেলে তুমিও তো কোথায় চলে গিয়েছিলে! এই তো আমি এবার কলকাতা যাওয়ার আগে থেকেই আড়াই মাস হবে দূরে দূরে ছিলে।
নয়নতারা যেন সময়টাকে আঙুলে গুনবে।
রাজচন্দ্র বললো–আমার অনুমতি দিতে ইচ্ছা নেই।
এটাই তো নয়নতারার ভয়। তবু সে সাহস করে বললো–অবুঝ হতে নেই।
রাজচন্দ্র বললো, রানীমা তোমাকে নিজের কাছে রেখে নিজের বস্ত্রালঙ্কারে সাজিয়ে-তোমরা ভালো জানো, হয়তো মেয়েদের ছেলে থাকার মতো একটি মেয়ে থাকাও দরকার মনে হয়, কিন্তু তোমাকে সকলের অপ্ৰাপণীয় করে তুলেছেন।
নয়নতারা জোড়াসনে বসে ছিলো। তার নিজের পায়ের সোনার কামদার মোটা মলজোড়ায় চোখ পড়লো।
সেই কবে পুরনো সিন্দুক সাফ করতে গিয়ে এটা বেরিয়েছিলো। নয়নতারা কৌতূহল দেখিয়েছিলো। রানী তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, পরো তুমি। ক্ষতি কী? কিন্তু সোনা যে! নয়নতারার এই দ্বিধায় রানী হেসে বলেছিলেন, আমি পরতাম, তাতে দোষ কেটে গিয়েছে।
নয়নতারা লজ্জায় পুড়ে গেলো যেন। রানী পরতে বলেছিলেন, পরে ছিলো। রানী ছাড়া কাউকে কি মানায়? কেউ যেন বললো, খুলে ফেলোনি কেন?
সে বললো, রাজকুমার, আমার স্পর্ধা, হয়েছে, আমাকে মাপ করো।
রাজচন্দ্র বললো–দ্যাখো নয়ন, তুমি কী নির্দয়! আমার কথার ভুলকে ক্ষমা করো না। আমি কি তাই বলেছি? সে হেসে বললো, আচ্ছা নয়ন, তোমার সেই বাইচে নামে একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে?
-তুমি গল্প করেছিলে বটে। সেই পিয়ানোর গায়ে নাম তো? যার তেরো চৌদ্দ বয়সের সুঘ্রাণ ছিলো? সে বলেই ভাবলো, রাজকুমার কি কলকাতার কনে সম্বন্ধে কিছু বলতে চায়? তার সম্বন্ধে কোনো অনুভূতি বা সুঘ্রাণের কিংবা তার অভাবের? তা কি বলতে দেওয়া উচিত?
কিন্তু রাজচন্দ্র বললো–জানো, চরণদাস, গ্রামের পোস্টমাস্টার, ওদের খুব দুঃসময়। খুব বিপদে পড়েছে। কাল বিকেলে তার বাড়ির চারিদিকে ঘোড়া নিয়ে ঘুরতে ইচ্ছা হলো! চরণ আমাকে দেখেনি। আমি কিন্তু দেখলাম, বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে তার ভারি মুখটা উজ্জ্বল হলো।
নয়নতারা গলাটাকে চেপে ধরার চেষ্টায় বললো–দুঃসময়ের কথা বলছিলে।
রাজচন্দ্র বললো–একই গল্প। কাল সন্ধ্যায় দাবা খেলতে খেলতে বাগচী হা হা করে হাসছিলেন। তিনি যাদের জন্য দরখাস্ত লিখে দিয়েছিলেন তারা অনেকেই তাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করেছে। হাসি দেখে আমার বলতে কষ্ট হলো, ডানকান আরো এগিয়ে গিয়েছে, তাদের নামে মিথ্যা দলিল তৈরী করার মামলা আনছে। আচ্ছা নয়ন, তা সত্ত্বেও এদের মুখে হাসি দেখে কি মনে হয় না?
-কি রাজকুমার?
