নায়েব এদিকে ফিরলো। বললো– সে-ঝকমারি করেছে, এ কি নগদীর কাজ রে বাপু! গাড়িই থামাক, তামুক খাবো যে।
নগদী সঙ্গে সঙ্গে ছিলো। দৌড়ে এলো। গাড়োয়ানের কাছে জানলো তামাক চেয়েছেন। তামাক সেজে আনতে আর কতক্ষণ, নইলে কীসের নগদী। নায়েব উঠে বসে তামাকে মন দিলো। গাড়ি ছাড়লো। তেমন লোকের কাছে ডাবায় ভোমরার শব্দ ওঠে। তা উঠলে নায়েব বললো, ঠোঁট থেকে ডাবা সরিয়ে–গোপন আর কী, গ্রামের সবাই অল্পবিস্তর জানেও এখন।
ডাবাটা গাড়োয়ানের হাতে দিলো নায়েব, গাড়োয়ান গোরুর পিঠের উপর দিয়ে তা নগদীকে পৌঁছে দিলো। নায়েব যেন আবার গির্দায় কাত হবে। কিন্তু সে বসেই রইলো। বরং গির্দা টেনে নিলো। একটু বা চিন্তাকুল দেখালো তাকে।
হঠাৎ সে বেশ আগ্রহ নিয়ে বললো, দ্যাখো, গিন্নি, সেই আট বছরের এয়েছিলে। শাড়ি নিয়ে বলতে পরিয়ে দাও। তারপর চল্লিশ বছর কাটলো সুখেদুখে। এখন তো আর ছোট্টটি নও, কেমন কিনা? নির্যাস কথা বলি শোনো। নদীর কাছে এলে কারো মাছের কথা মনে হয়, কেউ ভাবে তপ্পন করি। যাদৃশী ভাবনা যস্য। কিন্তু ভাবনা তো আগেই ছিলো,নদী দেখেই না মনে আসে? তা তোমার তো এখানে এসে মনে পড়ছে গোবরার কথা সব নতুন করে। কারণ তুমি আর আমি এই প্রথম এলেম সেখানে, যেখানে গোবরা সেপাই-টেরনিং নিতো। আরে, বাবা, আমার কাছে গোপন! এখন সুড়সুড় করে সবই বেরিয়ে আসছে। বুজরুক ছিলো গোঁয়ার। তা সাহস ছিলো বৈকি। রাবণরাজার কি সাহস ছিলো না? আসল মন্ত্রের নারদমুনি কিন্তু বুড়ো পিয়েত্রো। আর এসবই তোমার মনে হয়েছে। কিন্তু ভস্মীভূতস্য পুনরাগমনংকৃতঃ। ফেরেনা। ফিরলে এই তিন বছরে? আর, দ্যাখো, শোকও ভোলার কথা। নিজের ছেলের শোক ভোলে না? এ তো পরের ছেলে, ভাগনা। তুমি তাকে মানুষ করেছিলে বলেই কি বেশিদিন শোক করবে? আঁ? আমার মতো শক্ত হতে পারো না? আর তাছাড়া গ্রামের সব লোক জানে সে তো রাজদ্রোহ। নায়েব থামলো। বক্তৃতা সামলাতেই যেন বুক ওঠানামা করছে তার। নায়েবগিন্নি বলদ দুটোর মাথার উপর দিয়ে তাকালো পথের দিকে। চওড়া কিন্তু মাটির পথ। এখানে ওখানে বাতাস লেগে ধুলো উড়ছে। নায়েব বুকের তলায় গির্দা টেনে নিলো। নায়েবগিন্নি ভাবলো ব্যাপারটা নায়েব ঠিকই ধরেছে। খুব সহজ করেই তো বলা যায়। তাদের ভাগনা গোবর্ধন বুজরুকের সঙ্গে সিপাহীদের যুদ্ধে গিয়েছিলো, আর ফিরবে না। আর আজ সে কথা আবার মনে হয়েছে নতুন করে পেত্রোর হাওয়াঘরে। কিন্তু শক্ত হওয়া? তোমার মতো দশাসই পুরুষটা যে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে হাঁটছো সে কীসের বোঝার চাপে? সে আঙুলের ডগায় চোখ মুছলো।
কাঁচা পথ। পথের ধারে কোথাও আকন্দর ঝোপ, একটা-দুটো বাবলা গাছ, কোথাও বা প্রকাণ্ড সেগুনা সংখ্যায় বটগুলোই কম, কিন্তু তার তলায় পালকি নামায়, গোরুগাড়ি থামিয়ে বলদকেও জিরিয়ে নেওয়া হয়।
পথটা ফরাসডাঙা থেকে মরেলগঞ্জের ধার ঘেঁষে রাজার গ্রামের দিকে গিয়েছে। চওড়া যার ফলে রাষ্ট্রবাদ দিয়ে চলা যায়। ঝাঁকুনি কম। সেজন্যই এ পথে আসা। নায়েবগিন্নি দেখতে পেলো, গাড়ির রাস্তার উপরে ডানদিক থেকে একটা ছোটোপথ এসে মিশেছে। পথটা কি অপেক্ষাকৃত নতুন? কারণ সেটার এক জায়গায় যেন মাটিকাটার কাজ হচ্ছে এখনো, হয়তো পথটাকে আরো উঁচু আরো চওড়া করার চেষ্টা। গাড়িটা আর একটু এগোলে আর একটু ঝুঁকে দেখলো নায়েবগিন্নি। যেখানে মাটি কাটা হচ্ছে সেটা ধানের খেত। আধপাকা ধান আছে। তার এত কাছে মাটি পড়ছে যে মনে হবে পাকা ধানও চাপা দেবে মাটি। কৌতুকের ব্যাপার তো! আরো ভিতর দিকে, যেখানে মাটি পড়ছে তারও ওদিকে রাস্তাটাকে সুরকির মনে হয়। বেশ লাল, চারিদিকের সবুজ কালচে-মেটের মধ্যে বেশ রঙিন। ভাবলো সে : তুষের আগুনের কাছে দু মিনিট হাত রেখেছো, সেই ছাইচাপার কী তেজ? আর তার এক হাঁড়ি যদি বুকের মধ্যে জ্বলে? বলার উপায় নেই, কাদার উপায় নেই। আমার তবু তো পোষ্য আর এই পুরুষটার তো রক্তের সম্বন্ধ, ভাগনা। সে তাড়াতাড়ি ভাবলো, না, এ নয়, অন্য কথা ভালো। লুকিয়ে চোখ মোছা তার অভ্যাসেই আছে। কর্তার গায়ে আঙুল দিয়ে সে বললো–ওটা কোন পাকা সড়ক গো, সদরের বুঝি? দ্যাখো, দ্যাখো।
নায়েব না দেখেই বললো–সদর? সদর কোথায় এখানে? সে তো আগে যাকে বৈরামপুর দিয়ারা বলতো কায়েতবাড়ি ছআনীদের সেখানে। সদর ছিলো বটে এটাই, তা সে কি আজকের কথা? তখন খাঁয়েরাই ছিলো নায়েব-নাজিম। আর গড়ের জঙ্গলে ছিলো তাদের কিল্লা।
-তা বলছি না। এ পথে কি সদরে যাওয়া যায়? লাল সুরকির।
সব পথই সদরে যায়। নরেশ ওভারসিয়ারের কাজ হবে, রাজবাড়ির হাত থেকে শুরু দ্যাখো কী?
নায়েবগিন্নি হেসে ধাক্কা দিলোনায়েবের গায়ে। স্বপ্ন দেখছো নাকি, স্বপ্নেকথা কইছো? দ্যাখো না, ওই যে পথটা। এখানে রাজবাড়ি কোথায়?
তাকিয়া থেকে মাথা তুলতে হলো নায়েবের এবার। -ওটা, তা ওটা তো সকালেই দেখেছো। মরেলগঞ্জের সাহেবরা করছে। আবার তাকিয়ার মাথা রাখলো নায়েব। বললো–: তা এখানেই সদর থাকলে খুব সুবিধার দিন ছিলো না বোধ হয়। শুনেছি, শুধু খায়েরা না, তাদের অনেক আমলাও কোমরে কিরিচ বেঁধে তবে রাস্তায় নামতো। রিসালা ছাড়া মেয়েরা স্নানে যেতো না।
